পান চাষে খাসিয়াদের দুর্দিন
• খাসিয়াদের জীবিকা নির্বাহের প্রধান মাধ্যম হলো পান চাষ
• উৎপাদন হ্রাস এবং পানের আকার ছোট হওয়ায় বিক্রি কমেছে, বাড়ছে ঋণের বোঝা
• সরকারের পক্ষ থেকে সহজ শর্তে ঋণ ও পৃষ্ঠপোষকতা চান পানচাষিরা

মৌলভীবাজারের খাসিয়াপুঞ্জিগুলোতে পান চাষে দুর্দিন চলছে। চলতি বছর পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় কমেছে পান উৎপাদন। এ ছাড়া বিরূপ আবহাওয়ায় ছোট হয়ে আসছে পানপাতার আকার। এতে কমেছে দামও। অন্যদিকে বেড়েছে শ্রমিকের মজুরি ও উৎপাদন উপকরণের দাম। সব মিলিয়ে লাভের মুখ দেখছেন না পানচাষিরা। পান বিক্রির আয়ে এখন তাদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। সংসার আর পান চাষের খরচ মেটাতে গিয়ে তাদের কাঁধে বাড়ছে ঋণের বোঝা।
খাসিয়াদের জীবিকা নির্বাহের প্রধান মাধ্যম হলো পান চাষ। মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা ও রাজনগর উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চলে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৬৫টি খাসিয়াপুঞ্জি রয়েছে বলে জানা গেছে। এসব পুঞ্জিতে ঐতিহ্যগত ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে প্রাকৃতিকভাবে টিলার ছায়াঘেরা বনে পান চাষ করা হয়। খাসিয়াপুঞ্জির পুরুষেরা জুম বা বরজে গিয়ে গাছের পরিচর্যা এবং পানপাতা সংগ্রহ করেন। নারীরা দলবদ্ধভাবে বসে অত্যন্ত নিপুণ হাতে পান সাজিয়ে বাজারজাতকরণের উপযোগী ‘গুছি’ তৈরি করেন।
খাসিয়া পানচাষিরা বলছেন, বর্ষাকাল পানের ভরা মৌসুম হলেও চলতি বছর প্রকৃতির খামখেয়ালিপনায় চিত্র বদলে গেছে। গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় পানের উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। আগে যেখানে দেড় মাস পরপর গাছ থেকে পরিপক্ব পান সংগ্রহ করা যেত, সেখানে এখন দুই থেকে আড়াই মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। শুধু উৎপাদন কমে যাওয়াই নয়, বিরূপ আবহাওয়ার কারণে পানের পাতার আকারও ছোট হয়ে গেছে। বাজারে ছোট পানের কদর ও দাম—দুটোই কম থাকায় কাঙ্ক্ষিত মুনাফা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন চাষিরা। অন্যদিকে শ্রমিকের মজুরি, সার, কীটনাশকসহ সব উপকরণের দাম বহুগুণ বেড়ে গেছে। মৌসুমভেদে প্রতি কুড়ি পান ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। সাধারণত পানের ভরা মৌসুমে প্রতি সপ্তাহে ১০-১২ হাজার টাকার বিক্রি হয়। তবে এ বছর বৃষ্টি কম হওয়ায় প্রতি সপ্তাহে ৫-৬ হাজার টাকার পান বিক্রি হচ্ছে। এতে পানচাষিদের লোকসান হচ্ছে। এ ছাড়া ঢাকার পান ব্যবসায়ীরা বড় বড় পান সংগ্রহ করে বিদেশে রপ্তানি করতেন। তবে এ বছর পানের আকার ছোট থাকায় এবং রং কিছুটা মলিন থাকায় রপ্তানি হচ্ছে কম।
শ্রীমঙ্গলের নাহার পুঞ্জির বাসিন্দা ডিবারমিন পতাম বলেন, চলতি বছর মৌসুমের শুরুতে কিছুটা আশা জাগলেও গত জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দীর্ঘ সময় অত্যন্ত কম দামে পান বিক্রি করতে হয়েছে। এখন শীতের আগমনে পানের মৌসুম শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে। অনেক জুমে পান প্রায় শূন্যের কোঠায়। ফলে পুঞ্জির পরিবারগুলো চরম আর্থিক সংকটে পড়ছে। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে পানের উপযুক্ত দাম না পাওয়ায় চাষিরা আজ দিশেহারা। অনেকে মহাজন বা বিভিন্ন মাধ্যম থেকে ঋণ নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন।
লাউয়াছড়া খাসিয়াপুঞ্জির হেডম্যান (সমাজপ্রধান) ফিলা পতমী বলেন, ‘পানের নানা রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ মোকাবিলা করে এ বছর যেটুকু উৎপাদিত হয়েছে, তারও ন্যায্যমূল্য মেলেনি। চারদিকে সবকিছুর দাম বাড়ছে, অথচ আমাদের আয়ের একমাত্র উৎস এই পানের দাম দিন দিন কমছে। সরকারি আর্থিক সহায়তা এবং পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে আজ আমাদের এই দুর্দিন দেখতে হতো না।’
কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নের হীরামতিছড়া খাসিয়াপুঞ্জির হেডম্যান বিওয়ানলী সুঙ বলেন, ‘আগের মতো পাইকারেরা দাম দিয়ে পান কেনেন না। পরিবার-পরিজন নিয়ে তীব্র আর্থিক অনটনে পড়তে হচ্ছে। তবু শত বছরের বাপ-দাদার ঐতিহ্য ও জীবিকার টানে আমরা পান চাষ ধরে রেখেছি।’
খাসিয়াদের সংগঠন খাসি সোশ্যাল কাউন্সিলের প্রচার সম্পাদক সাজু মারছিয়াং বলেন, খাসিয়াদের অর্থনীতি সম্পূর্ণই পানকেন্দ্রিক। জুমে পান কমে যাওয়ায় এবং ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় তরুণ প্রজন্মসহ সবাই হতাশ। খাসিয়া পান বিদেশে রপ্তানি হয়ে দেশের সুনাম বাড়ালেও উৎপাদকেরা আজও অবহেলিত। সরকারের পক্ষ থেকে সহজ শর্তে ঋণ ও সঠিক বিপণন ব্যবস্থা না করলে এই ঐতিহ্য রক্ষা করা কঠিন হবে।
এ বিষয়ে মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, চাষিদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কৃষি বিভাগ থেকে নিয়মিত পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। পান চাষে কোনো নতুন সমস্যা দেখা দিলে তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।







