Ajker Patrika

আগুন-লোহার জীবনে ৫৫ বছর, এখনো থামেননি অরুণ কর্মকার

ইউসুফ আরফাত, ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম)
আপডেট : ২৬ মে ২০২৬, ১০: ১১
আগুন-লোহার জীবনে ৫৫ বছর, এখনো থামেননি অরুণ কর্মকার
৭০ বছর বয়সী অরুণ কর্মকার এখনো কাজ করে চলেছেন। ছবি: আজকের পত্রিকা

ভোর গড়াতেই চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির কাজিরহাট বাজার জেগে ওঠে আগুনের লাল আভায়। বাজারের এককোণে টিনশেডের ছোট্ট কামারের দোকানে তখন হাতুড়ির ছন্দময় শব্দ টাং! টাং! টাং! আগুনে লাল হয়ে ওঠা লোহাকে পিটিয়ে দা বানানো হচ্ছে, কোথাও তৈরি হচ্ছে বঁটি, আবার কোনো কোণে চলছে পুরোনো কৃষি সরঞ্জামে নতুন প্রাণ ফেরানোর চেষ্টা।

এই আগুন, ধোঁয়া আর লোহার গন্ধের মধ্যেই কেটে গেছে অরুণ কর্মকারের জীবনের ৫৫ বছর। ৭০ বছর বয়সী এই প্রবীণ কর্মকার আজও প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করেন একই উদ্যমে। তাঁর কাছে এটি শুধু পেশা নয়, উত্তরাধিকার; শুধু জীবিকা নয়, অস্তিত্বের গল্প।

প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্য বহন করা কাজিরহাট বাজারে অরুণ কর্মকার যেন এক জীবন্ত ইতিহাস। পরদাদা, দাদা ও বাবার হাত ধরে যে কামারশিল্পের শুরু, সেটিকেই আজও আঁকড়ে ধরে রেখেছেন তিনি। ১৯৭২ সালে বাবার পাশে দাঁড়িয়ে প্রথম হাতুড়ি ধরেছিলেন। তারপর সময় বদলেছে, বাজার বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে। কিন্তু বদলায়নি তাঁর কর্মশালার আগুন।

অরুণ কর্মকারের বাড়ি ফটিকছড়ির পূর্ব ভুজপুরের কর্মকারপাড়ায়। পরিবারে স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে বলরাম কর্মকার এখন বাবার সঙ্গেই দোকানে কাজ করেন। ছোট ছেলে তপু কর্মকার জীবিকার তাগিদে পাড়ি জমিয়েছেন ওমানে। মেয়ের বিয়ে হয়েছে কয়েক বছর আগেই।

জীবনের হিসাব কষতে গিয়ে অরুণ কর্মকারের কণ্ঠে আক্ষেপের চেয়ে তৃপ্তিই বেশি। এই পেশায় তিনি বড়লোক হতে পারেননি ঠিকই, তবে জীবনে শান্তি কমেনি এতটুকু। হালকা হাসি দিয়ে বললেন, ‘মানুষের ভরসা অর্জন করেছি। এখনো দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আমাদের দোকানে আসে, এটাই সবচেয়ে বড় সম্পদ।’

ঈদুল আজহা সামনে এলেই কাজিরহাট বাজার যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। তখন সবচেয়ে ব্যস্ত সময় কাটান অরুণ কর্মকারেরা। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে আগুনে লোহা গরম করা, হাতুড়ি পেটানো আর ধার তৈরির কাজ। দোকানের তিন-চারজন শ্রমিকও কাজ করেন সমানতালে।

দোকানে বসে কখনো দা-বঁটির ধার পরীক্ষা করেন অরুণ কর্মকার, কখনো কাঠের হাতলে লিখে দেন মালিকের নাম। তাঁর হাতের নিপুণতায় সাধারণ লোহার টুকরা হয়ে ওঠে কৃষকের নিত্যসঙ্গী।

আধুনিক যন্ত্রপাতির এই সময়ে অনেক কিছু বদলে গেলেও বদলায়নি গ্রামীণ কৃষকের আস্থা। বাজারের পুরোনো ক্রেতা জহুর আহমদ বলেন, ‘কারখানার তৈরি সরঞ্জামের চেয়ে অরুণ কর্মকারদের হাতে বানানো দা-বঁটি বেশি টেকসই ও ধারালো। তাই আজও ভরসা রাখি অরুণ কামারের ওপর।’ তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমেছে কামারশিল্পের মানুষ। নতুন প্রজন্মের অনেকেই এই পেশায় আসতে চান না। কঠোর পরিশ্রম, কম আয় আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তাঁদের দূরে ঠেলে দিচ্ছে। তবু অরুণ কর্মকার হাল ছাড়েননি। বড় ছেলে বলরামকে নিজের হাতেই গড়ে তুলেছেন।

অরুণ কর্মকার বলেন, ‘আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করা সহজ নয়। কিন্তু এই পেশার প্রতি আমার মায়া আছে। এটা শুধু কাজ নয়, আমাদের পরিচয়।’

দিন শেষে কাজিরহাট বাজারের দোকানগুলো ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে আসে। আগুন নিভে যায়, থেমে যায় হাতুড়ির শব্দও। কিন্তু অরুণ কর্মকারের গল্প থামে না। তাঁর ঘামে, আগুনে আর লোহার শব্দে এখনো বেঁচে আছে কাজিরহাটের পুরোনো ঐতিহ্য। লোহার গায়ে হাতুড়ির প্রতিটি আঘাত যেন বলে যায়—সময় বদলায়, মানুষ বদলায়; কিন্তু কিছু মানুষ ইতিহাস হয়ে টিকে থাকেন। অরুণ কর্মকার তেমনই একজন, কাজিরহাট বাজারের আগুনে গড়া এক জীবন্ত প্রতীক।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত