Ajker Patrika

চার দশক ধরে ভাঙছে মধুমতী, বদলে যাচ্ছে মহম্মদপুরের মানচিত্র

মোহাম্মদ উজ্জ্বল, মহম্মদপুর (মাগুরা) প্রতিনিধি
আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৭: ০৯
চার দশক ধরে ভাঙছে মধুমতী, বদলে যাচ্ছে মহম্মদপুরের মানচিত্র
ক্রমাগত ভাঙছে মধুমতি, তীরে নিঃস্ব মানুষের আর্তি। ছবি: আজকের পত্রিকা

নতুন একটি ঘর বাঁধার স্বপ্ন ছিল শাহিদুল ও হালিমা দম্পতির। তিন সন্তান নিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই করতে নিজেদের জমানো মূলধনে ইটের গাঁথুনিও শেষ করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু মধুমতী নদীর ভাঙনে চোখের সামনে বিলীন হয়ে গেছে সেই স্বপ্নের ভিটা।

জাঙ্গালীয়া গ্রামের শাহিদুলের দুই ভাই সরোয়ার মোল্লা ও শফিকুল ইসলামের অবস্থাও একই। নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত তিনটি পরিবারের নতুন করে ঘর তোলার মতো জায়গা-জমি আর অবশিষ্ট নেই।

শফিকুলের স্ত্রী সুরমা খাতুন ও শাহিদুলের স্ত্রী হালিমা খাতুন বলেন, ‘মধুমতী আমাদের সবকিছু কেড়ে নিয়ে নিঃস্ব করে দিয়েছে। এখন খোলা মাঠে বা গাছতলায় থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই আমাদের।’

মধুমতীর পাড়ের অসংখ্য পরিবারের দুর্দশা, হতাশা ও অনিশ্চয়তার গল্প প্রায় একই। কয়েকবার ঘরবাড়ি সরিয়ে অনেক পরিবার এখন নিঃস্ব।

ক্রমাগত ভাঙছে মধুমতী, তীরে নিঃস্ব মানুষের আর্তি। ছবি: আজকের পত্রিকা
ক্রমাগত ভাঙছে মধুমতী, তীরে নিঃস্ব মানুষের আর্তি। ছবি: আজকের পত্রিকা

সম্প্রতি মাগুরার মহম্মদপুরে মধুমতী নদীর ভাঙনে চরপুকুরিয়া থেকে চরগয়েশপুর পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার এলাকায় ১৫ থেকে ২০টি পরিবারের বসতভিটা ও ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। চার দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই ভাঙনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, দোকানপাট ও রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আগের সেই মহম্মদপুরের সঙ্গে এখনকার মহম্মদপুরের কোনো মিলই আর পাওয়া যায় না।

কথা হয় স্বামীহারা নেহার বেগমের (৬৫) সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বাপের দেওয়া একটু জমি ছিল, সেটাও তো নদী খাইয়া গ্যাল... এহন ছাওয়াল-মায়ে কই যাব রে বাবা?’ এক ছেলে ও এক মেয়ের এই জননীর মাথা গোঁজার শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নিয়েছে মধুমতীর ভাঙন।

দীর্ঘ ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে মধুমতীর অব্যাহত ভাঙনে বদলে যাচ্ছে মহম্মদপুর উপজেলার মানচিত্র। এ বছর চুড়ারগাতি তালতলা বাজারসংলগ্ন এলাকা, চরগয়েশপুর, বসুরধুলজুড়ী, ভোলানাথপুর, জাঙ্গালীয়া, হরেকৃষ্ণপুর, ঝামা ও দেউলী এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা বেশি দেখা দিয়েছে। বসতবাড়ি ছাড়াও এসব এলাকার শত শত একর ফসলি জমি, গাছপালা, দোকানপাট ও রাস্তাঘাট বিলীন হয়েছে। ভাঙনের মুখে রয়েছে স্থানীয় স্কুল, মসজিদ, মন্দির ও গোরস্তান।

স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা জিয়াউর রহমান (৭০) বলেন, ‘আমার এ দীর্ঘ জীবনে চুড়ারগাতিতে নদী রক্ষায় সরকার বা পানি উন্নয়ন বোর্ডকে কোনো দিন জিও ব্যাগ ফেলা বা অন্য কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখিনি। অথচ প্রতিবছর একরের পর একর জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে।’

মাগুরা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার উত্তর প্রান্তের বাবুখালী ইউনিয়নের চরসেলামতপুর গ্রাম থেকে দক্ষিণ প্রান্তের পলাশবাড়িয়া ইউনিয়নের কালীশংকরপুর গ্রাম পর্যন্ত মহম্মদপুর অংশে মধুমতী নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ২৮ কিলোমিটার। দীর্ঘ চার যুগের বেশি সময় ধরে ভাঙনে বদলে যাচ্ছে মহম্মদপুরের ভূচিত্র।

মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বেদবতী মিস্ত্রী বলেন, ভাঙনকবলিত ঝুঁকিপূর্ণ কিছু এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় ও নদীভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিস্তারিত অবহিত করা হয়েছে।

মাগুরা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) সন্তোষ কর্মকার বলেন, ‘ইউএনওর মাধ্যমে ভাঙনকবলিত চুড়ারগাতি ও চরগয়েশপুর এলাকার বিষয়ে অবগত হয়েছি। ঝামা ও হরেকৃষ্ণপুর এলাকায় জিও ব্যাগের মাধ্যমে প্রাথমিক অবস্থায় ভাঙন রোধের চেষ্টা করছি। জনগণের এই দুর্ভোগের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানানো হয়েছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত