Ajker Patrika

দশ মাস ধরে নিখোঁজ ১০

  • গত বছরের জানুয়ারিতে বাড়ি ছাড়েন মাদারীপুরের ১০ যুবক।
  • ১০ মাস ধরে পরিবারের সঙ্গে তাঁদের কোনো যোগাযোগ নেই।
  • ইতালি নেওয়ার জন্য জনপ্রতি ১৫ লাখ টাকা করে চুক্তি হয়।
মাদারীপুর প্রতিনিধি
দশ মাস ধরে নিখোঁজ ১০
সম্প্রতি ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা পেয়ারা বেগমের বাড়ির সামনে অবস্থান নেন। ছবি: সংগৃহীত

অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশে বাড়ি ছেড়ে নিখোঁজ হয়েছেন মাদারীপুরের ১০ যুবক। তাঁরা কেমন আছেন, বেঁচে আছেন কি না, তাঁদের পরিবার জানে না। ১০ মাস ধরে পরিবারের সঙ্গে তাঁদের কোনো যোগাযোগ নেই বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা। কোনো সন্ধান না পাওয়ায় পরিবারগুলো দিশেহারা হয়ে পড়েছে।

নিখোঁজ যুবকেরা হলেন মাদারীপুর সদর উপজেলার পেয়ারপুর ইউনিয়নের মাছকান্দি গ্রামের মোহাম্মদ আলী (২২), মোস্তফাপুর ইউনিয়নের গাছবাড়িয়া এলাকাবার জুলহাস চোকদারের ছেলে ওয়ালিদ হাসান অভি (১৯), কেন্দুয়া ইউনিয়নের নয়াকান্দি এলাকার আনোয়ার ব্যাপারীর ছেলে লিমন ব্যাপারী (১৯), হেমায়েত মাতুব্বরের ছেলে রবিউল মাতুব্বর (২২), দত্তেরহাট এলাকার টিটু মাতুব্বরের ছেলে মো. জয় মাতুব্বর (২০), নয়াকান্দি এলাকার মোক্তার হাওলাদারের ছেলে জিদান হোসেন হাওলাদার (১৮), নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকার মো. মাহাবুব (২১), রাজৈর উপজেলার বাজিতপুর ইউনিয়নের মাচ্চর এলাকার আবুল বাশার মাতুব্বরের ছেলে শরিফুল ইসলাম (২৭), পাখুল্লা এলাকার হাশেম খাঁর ছেলে আজমুল খাঁ (৩০) ও মোল্লাকান্দি এলাকার কালু মজুমদারের ছেলে তুহিন মজুমদার (২৩)।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দালালের মাধ্যমে ইতালি যেতে গিয়ে এ ঘটনা ঘটেছে। পেয়ারা বেগম নামের এক নারী ওই ১০ যুবককে ইতালি পাঠানোর কথা বলে জনপ্রতি ১৫ লাখ টাকায় চুক্তি করেন। পেয়ারা বেগম মাদারীপুর সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের গাজীরচর এলাকার জাহাঙ্গীর ঢালীর স্ত্রী। চুক্তি অনুযারী প্রত্যেকে ১৫ লাখ টাকা করে দেওয়ার পর গত বছরের জানুয়ারি মাসে বাড়ি ছাড়েন ওই ১০ যুবক। পরে তাঁদের কয়েকটি দেশ ঘুরিয়ে লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁদের সাবইকে আটকে রাখা হয়। মুক্তিপণের জন্য শুরু হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। এরপর নির্যাতনের ভিডিও, ছবি ও ভয়েস পাঠিয়ে প্রত্যেকের পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণের লাখ লাখ টাকা আদায় করে দালাল চক্র। সবশেষে গত বছরের এপ্রিলে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় লিবিয়া হয়ে ইতালির উদ্দেশে যাত্রা করেন যুবকেরা। এরপর থেকে আর কোনো সন্ধান পায়নি তাঁদের পরিবার।

নিখোঁজের ব্যাপারটি নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা দেখা দিলে সম্প্রতি অভিযুক্ত পেয়ারা বেগম বাড়িঘরে তালা দিয়ে পরিবার নিয়ে গা ঢাকা দেন। সম্প্রতি ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা পেয়ারা বেগমের বাড়ির সামনে অবস্থান নেন; কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দেখা মেলেনি।

স্থানীয়রা জানান, পেয়ারা বেগম সম্প্রতি নিজের টিনশেড ঘরের বিপরীতে একটি সুন্দর ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণ করেছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, মানব পাচারের টাকা দিয়েই তিনি এই বাড়ি নির্মাণ করেছেন। পেয়ারা বেগমের বড় ছেলে ফারদিন ঢালী ইতালি থাকেন। তাঁর সহযোগিতায় পেয়ারা বেগম এই মানব পাচারের কাজ করেন। তাঁর ছোট ছেলে সৌরভ যুবকদের পরিবারের কাছে থেকে টাকা আদায়ের কাজ করেন।

নাম না প্রকাশের শর্তে স্থানীয় কয়েকজন বলেন, পেয়ারা বেগম হঠাৎ করে অনেক টাকার মালিক হয়েছেন। যেন আঙুল ফুলে কলাগাছের মতো অবস্থা। তাই তাঁর ব্যাপারে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

অভিযুক্ত পেয়ারা বেগমসহ তাঁর পরিবার গা ঢাকা দেওয়ার তাঁদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

নিখোঁজ লিমনের বাবা আনোয়ার বলেন, ‘দালাল পেয়ারা বেগমের প্রলোভনে পড়ে আমার ছেলে ইতালি যাওয়ার জন্য পাগল হয়ে যায়। পরে বাধ্য হয়ে তাঁর কাছে পাসপোর্ট ও টাকা জমা দেই। ১৫ লাখ টাকায় চুক্তি করা হয়। পরবর্তী সময়ে লিবিয়ায় আটকে রেখে আরও টাকা দেওয়া হয়েছে। সর্বমোট আমরা ২৮ লাখ টাকা দিয়েছি। তবুও আমার ছেলের কোনো খোঁজ নেই। ছেলে কেমন আছে, বেঁচে আছে কি না, তাও জানি না।’

জয় মাতুব্বরের বাবা টিটু মাতুব্বর বলেন, ‘পেয়ারা বেগমের বাড়িতে আমার ছেলের যাতায়াত ছিল। অনেক সময় তাঁদের বাড়ির অনেক কাজ করে দিত। সেখান থেকেই লোভ দেখায়। পরে লিবিয়া নিয়ে একবার মাফিয়াদের কাছে ধরা পড়েছিল। পরে ১২ লাখ টাকা দিলে মুক্তি হয়। এরপর গত বছরের এপ্রিল মাস থেকে আর কোনো খবর পাচ্ছি না। মোবাইলেও কোনো যোগাযোগ হয় না। একমাত্র পেয়ারা বেগমই জানেন আমার ছেলে কোথায় আছে। পেয়ারা বেগমের পেছনে ঘুরে আমরা দিশেহারা হয়ে পড়েছি। পেয়ারা বেগম ঠিকমতো কথা বলতে চায় না। শুধু আমাদের ঘুরায়। সম্প্রতি সে গা ঢাকা দিয়েছে। আমরা পেয়ারা বেগমের শাস্তি দাবি করছি।’

নিখোঁজ শরিফুলের মা রাজিয়া বেগম বলেন, ‘পেয়ারা বেগম ও তার লোকজনের খপ্পরে পড়ে আমার ছেলে এখন নিখোঁজ আছে। পেয়ারা বেগম বলেছিল, আমার ছেলেকে সরাসরি ইতালি নিয়ে যাবে; কিন্তু তা করেনি। লিবিয়া নিয়ে বন্দী করে রেখেছিল। গত বছরের ১২ এপ্রিলের পর আমার ছেলের সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে দেয়নি। আমার ছেলে বেঁচে আছে, নাকি মরে গেছে, তাও জানি না। আমি আমার ছেলের সন্ধান চাই। আর পেয়ারাসহ এই দালাল চক্রের সবার বিচার চাই।’

মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, নিখোঁজ ১০ যুবকের পরিবারের মধ্যে একজনের পরিবার একটি মামলা করেছে। সেই মামলায় তিনজন গ্রেপ্তার। এ ছাড়া বাকি নিখোঁজদের পরিবার থেকে লিখিত অভিযোগ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত