Ajker Patrika

শ্রীপুরের চৌক্কার খাল

জিয়ার স্মৃতিবিজড়িত খাল খননের নামে লুটপাট

  • পুনঃখননে বরাদ্দ করা হয়েছিল ৩ কোটি টাকা।
  • কোনো অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না করেই চলছে খনন।
  • এলাকাবাসীর অভিযোগ, টাকা জলে গেছে।
  • খালের বেশির ভাগ অংশ বর্জ্য ও মাটি দিয়ে ভরে গেছে।
রাতুল মণ্ডল, শ্রীপুর
জিয়ার স্মৃতিবিজড়িত খাল খননের নামে লুটপাট
দখলে-দূষণে মৃতপ্রায় চৌক্কার খাল খননের পরের দৃশ্য। সম্প্রতি গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভার ছাপিলাপাড়া এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

শহীদ রাষ্টপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে নিজে এসেছিলেন গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার চৌক্কার খালে। স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে এই খাল খনন করেছিলেন তিনি। জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত এই চৌক্কার খাল সম্প্রতি ‘খনন’ করা হয়েছে। ৬ দশমিক ৭ কিলোমিটার এই খাল পুনঃখননে বরাদ্দ করা হয়েছিল ৩ কোটি টাকা। তবে সেই টাকা জলে গেছে। কারণ, ইতিমধ্যে আগের অবস্থায় ফিরে গেছে চৌক্কার খাল।

এক মাস আগে ঢাকঢোল পিটিয়ে চৌক্কার খাল আনুষ্ঠানিকভাবে খননকাজ শুরু হয়। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এসে আনুষ্ঠানিক কাজের উদ্বোধন করেন। তবে কোনো ধরনের অবৈধ দখল উচ্ছেদ ছাড়াই এক্সকাভেটরের মাধ্যমে নামমাত্র খনন করা হয়। খননের এক সপ্তাহ পর খালটি আগের অবস্থায় ফিরে আসে। সম্প্রতি ওই এলাকা ঘুরে দেখা যায়, এই খাল যে খনন হয়েছে সেটা বোঝারই উপায় নেই। খালের বেশির ভাগ অংশ ময়লা বর্জ্য ও মাটি দিয়ে ভরে গেছে। কোনে কোনো স্থানে খননের চিহ্ন ছিটেফোঁটা পর্যন্ত নেই। শুধু কিছু কাদামাটি পাড়ে জমা করা হয়েছে। ইতিমধ্যে সেগুলোও পুনরায় খালে চলে গিয়ে খাল ভরাট হতে শুরু করেছে। আশপাশের শিল্পমালিকদের জবরদখলে থাকা অংশে খননে হাত দেওয়া হয়নি।

স্থানীয় বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম বলেন, খালটি পুনঃখননের খবরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে একটা আনন্দের বিষয় ছিল। কিন্তু নামমাত্র খননের কারণে খালের চিত্র আগের মতোই। ময়লা বর্জ্য দিয়ে ইতিমধ্যে খাল ভরাট হয়ে আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে।

খালপাড়ের বাসিন্দা সোহরাব হোসেন বলেন, ‘নামমাত্র খনন করে জনগণের টাকা লুটপাট করছে। খালপাড়ে গিয়ে মনে হয় না খনন করা হয়েছে। এক সপ্তাহ পর খালের অবস্থা একই। কিছু কাদামাটি তোলা হয়েছে তীরে। বৃষ্টিতে আবার খালে গিয়ে ভরাট হয়েছে। এখন দেখি কোদাল দিয়ে সেগুলো ওপরে ওঠানো হচ্ছে।’

জিয়াউর রহমানের আমলের চৌক্কার খাল খনন নিয়ে কথা হয় আব্দুল হেলিমের সঙ্গে। সেই সময় শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ছিলেন তিনি। বলেন, ‘এত বেশি ভালো মনে নেই। তখন আমি ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার। বৃষ্টিতে হঠাৎ করে আশপাশের ফসলি জমি, বসতবাড়ি পানিতে তলিয়ে যেত। এসব সমস্যার কথা উল্লেখ্য করে জেলা প্রশাসক বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করি। বরাদ্দ হওয়ার পর ১৯৭৮ সালের দিকে খালটি খননের জন্য সরাসরি এলাকায় এসেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনি শ্রমিকদের সঙ্গে নিজ হাতে মাটি কাটায় অংশ নেন। আমার পরিষ্কার মনে আছে, আমি মেম্বার হিসেবে খাল খনন কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলাম।’

বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে এই প্রবীণ বলেন, ‘দীর্ঘ বছরে খালটি দখল দূষণে শেষ। হঠাৎ করে জানলাম পুনঃখনন হবে। খুবই খুশি হয়েছিলাম খবরটি শুনে। কিন্তু কিসের খনন হচ্ছে। এটা তো দেখছি ডাকাতি। নামমাত্র খনন করে টাকাগুলো দুর্নীতির মাধ্যমে পকেটে ভরা। যে খাল খননের অতিরিক্ত গম সরকারের কোষাগারে জমা দিয়েছি, সেই খাল পুনঃখননে লুটপাট হচ্ছে।’

তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী নজরুল ইসলামের দাবি, ‘আমরা এখনো খননকাজ শেষ করিনি। যে জায়গায় এক্সকাভেটর দিয়ে সম্ভব হচ্ছে না সেই জায়গায় কোদাল দিয়ে খনন হচ্ছে। অনিয়মের বিষয়টি পুরোপুরি সঠিক নয়।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নদী ও প্রকৃতি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. খোরশেদ আলম বলেন, ‘চৌক্কার খালটি অপরিকল্পিত নগরায়ণের মূল্য দিচ্ছে। কৃষক ও সাধারণ মানুষ এর মূল্য দিচ্ছে। তলানি জমে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই শিল্পাঞ্চলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। তবে এখন যেটা হচ্ছে সেটা কেমন খাল খনন? ছোট্ট কোদাল হাতে দুজন শ্রমিক খালের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মাটি সরাচ্ছে। এটা হাস্যকর।’

প্রকল্প পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘খননের অনিয়মের তথ্য পেয়েছি। সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে বিস্তারিত জানাতে পারব।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক ডা. রফিকুল ইসলাম বাচ্চু বলেন, খাল খননে কোনো অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না। বর্তমান সরকার নদনদী, খাল খননে খুবই গুরুত্ব দিচ্ছে। জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত চৌক্কার খালটিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খনন হচ্ছে। এখানে একচুল পরিমাণ নয়ছয় করার সুযোগ নেই।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত