Ajker Patrika

ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ক্ষোভেই মাকে হত্যা: আদালতে রাফির স্বীকারোক্তি

ফেনী প্রতিনিধি
ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ক্ষোভেই মাকে হত্যা: আদালতে রাফির স্বীকারোক্তি
অভিযুক্ত ছেলেকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ছবি: আজকের পত্রিকা

ফেনীর দাগনভূঞায় লাকি বেগম নামের এক নারীকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার তাঁরই ছেলে মোশারফ হোসেন রাফি (২২) আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, পরিবারের ভালোবাসা ও স্বাভাবিক আচরণ থেকে বঞ্চিত হওয়ার ক্ষোভ থেকেই তিনি মাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন।

সোমবার (১১ মে) দুপুরে দাগনভূঞা আমলি আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শহীদুল ইসলামের আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে রাফি এসব কথা জানান।

আদালত সূত্র জানা যায়, জবানবন্দিতে রাফি দাবি করেন, তিনি সিগারেট ছাড়া অন্য কোনো মাদক গ্রহণ করতেন না। তবে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে মাদকাসক্ত ও বখাটে বলে অবজ্ঞা করতেন। এতে তিনি মানসিকভাবে ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন। তাঁর ভাষ্যমতে, মা লাকি বেগম (৪০) তাঁর সঙ্গে আপন সন্তানের মতো আচরণ করতেন না এবং রোববার রাতে কথা বলতে গেলে তাঁকে দূরে সরিয়ে দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে প্রথমে মাকে ছুরি দিয়ে আঘাত করেন। পরে চিৎকার শুনে এগিয়ে এলে বাবা মোস্তফা ভূঞা (৫০) ও বোন মিথিলা মোস্তফা সাহারাকেও (১৮) এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করেন।

জবানবন্দিতে রাফি আরও জানান, পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি দেখানোর পরিকল্পনা থেকেই তিনি অনলাইনে দুটি ছুরি অর্ডার করেছিলেন। শনিবার ছুরি দুটি হাতে পাওয়ার পর রোববার রাতে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন। একপর্যায়ে গুরুতর আহত মা মাটিতে লুটিয়ে পড়লে মরদেহ খাটের নিচে লুকানোর চেষ্টা করেন তিনি। এ সময় বোন দেখে ফেললে তাঁকেও আঘাত করা হয়।

রোববার (১০ মে) রাত ৯টার দিকে উপজেলার সিন্দুরপুর ইউনিয়নের দিলপুর গ্রামের মকবুল আহমদ সুপারিনটেনডেন্টের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয়রা আহত তিনজনকে উদ্ধার করে দাগনভূঞা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে পরে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে পাঠানোর পথে লাকি বেগম মারা যান। আহত বাবা ও মেয়ে বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বলে জানা গেছে।

তবে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে রাফি মাদকাসক্ত ও বখাটে জীবন যাপন করছিলেন। এ কারণে মা-বাবা তাঁকে প্রায়ই শাসন করতেন এবং ভালো পথে ফেরার পরামর্শ দিতেন। এতে পরিবারের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব ও ক্ষোভ তৈরি হয়।

বাড়ির বয়োবৃদ্ধ সোলেমান মিয়া বলেন, ‘তিন-চার বছর পূর্ব থেকে রাফি মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। ঠিকভাবে লেখাপড়াও করত না। এসব নিয়ে প্রায়ই তার মায়ের সঙ্গে তার ঝগড়া হতো। গতকাল আমি হঠাৎ তাদের বাড়ি থেকে শোর (চিৎকার) শুনে গিয়ে দেখি তাদের ঘরের মেঝেতে লাকি ও মোস্তফা পড়ে আছে। মিথিলাকে বাথরুমে আটকে রেখেছে। মাদকাসক্ত ছেলে একটা পরিবারকে শেষ করে দিল।’ 

আহত মোস্তফার ভাতিজা আবদুল হক বলেন, ‘খবর পেয়ে গিয়ে দেখি তখনো রাফি উগ্র আচরণ করছিল। কাউকে কাছে ভিড়তে দিচ্ছিল না। কোনো রকম বুঝিয়ে-শুনিয়ে ঘরে প্রবেশ করে দেখি চাচির নিথর দেহ মেঝেতে। চাচা ও মিথিলাকে গুরুতর আহত অবস্থায় দেখে তাৎক্ষণিক তাদের হাসপাতালে পাঠাই।’ তিনি বলেন, ‘রাফি মূলত মানসিক অবসাদগ্রস্ত ছিল। কারও সঙ্গে মিশত না।’ 

এ ঘটনায় সোমবার রাফিকে একমাত্র আসামি করে দাগনভূঞা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন তাঁর ফুফু শরীফা বেগম। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দুটি ছুরি পুলিশ আলামত হিসেবে জব্দ করেছে।

দাগনভূঞা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুহাম্মদ ফয়জুল আজীম নোমান জানান, গ্রেপ্তার রাফি ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন এবং আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। পরে আদালতের নির্দেশে তাঁকে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত