Ajker Patrika

ফমেক হাসপাতাল: টাকা ছাড়া মেলে না ট্রলি

  • গত সোমবার ট্রলি না পেয়ে এক শিশুকে নিয়ে স্বজনদের ছোটাছুটির ভিডিও ভাইরাল।
  • ঢাকায় নেওয়ার পথে শিশুটির মৃত্যু হয়।
  • চিকিৎসায়ও অবহেলার অভিযোগ পরিবারের।
  • ট্রলি বহনে ২০০-৩০০ টাকা দাবির অভিযোগ অন্য রোগীর স্বজনদের।
ফরিদপুর প্রতিনিধি
ফমেক হাসপাতাল: টাকা ছাড়া মেলে না ট্রলি
ট্রলি না পেয়ে মুমূর্ষু শিশুকে কোলে ও অক্সিজেন সিলিন্ডার হাতে নিয়ে ট্রমা সেন্টার থেকে সার্জারি বিভাগে যাচ্ছেন স্বজনেরা। গত সোমবার ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ছবি: আজকের পত্রিকা

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ (ফমেক) হাসপাতালে ট্রলি পেতে টাকা দাবির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। স্বজনদের অভিযোগ, টাকা না দিলে মুমূর্ষু রোগীকেও ট্রলি দেওয়া হয় না। এমন অভিযোগের মধ্যেই মুমূর্ষু তিন বছরের শিশু সাফা মারওয়াকে ট্রলি না দিয়ে কোলে করে হাসপাতালের এক ভবন থেকে অন্য ভবনে নেওয়ার ৩২ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, শিশুটির শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় কোলে করে নেওয়াই উপযুক্ত ছিল এবং ট্রলি না দেওয়ার পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল না।

স্বজনেরা জানান, গত সোমবার দুপুরে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয় ফরিদপুর সদর উপজেলার কানাইপুর ইউনিয়নের হোগলাকান্দি গ্রামের রবিন শেখের মেয়ে সাফা মারওয়া। শিশুটিকে মুমূর্ষু অবস্থায় ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন পরিবারের সদস্যরা। পরে ট্রমা বিভাগ থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে পাঠানো হয় প্রায় ২০০ মিটার দূরে নতুন ভবনের পঞ্চম তলার সার্জারি বিভাগে। এ সময় ট্রলি চেয়েও পাননি তাঁরা। ওই সময়কার ৩২ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

এতে দেখা যায়, অক্সিজেন মাস্ক ও স্যালাইন দেওয়া অবস্থায় শিশুটিকে কোলে করে দৌড়াচ্ছেন এক ব্যক্তি (শিশুটির চাচা)। তাঁর পেছনে আরেক ব্যক্তি (শিশুটির বাবা) অক্সিজেন সিলিন্ডার উঁচু করে দৌড়াচ্ছেন এবং এক নারী স্যালাইনের ব্যাগ হাত দিয়ে উঁচু করে সঙ্গে সঙ্গে দৌড়াচ্ছেন। কিছুক্ষণ পরপর তাঁরা সামান্য সময় বিশ্রামও নিচ্ছেন। এমন দৃশ্য আরজু মিয়া নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়িয়ে পড়ে এবং মুহূর্তে তা ভাইরাল হয়। দাবি করা হয়, টাকা ছাড়া ট্রলি না দেওয়ায় শিশুটিকে স্বজনেরা কোলে করে নিয়ে যাচ্ছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাসপাতালে ভর্তির পরে শিশুটিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে নেওয়ার পথে সোমবার বিকেল ৪টার দিকে তার মৃত্যু হয়। পরে স্বজনেরা বাড়িতে নিয়ে আসেন এবং রাত ১১টার দিকে দাফন সম্পন্ন করেন।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে শিশুটির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তিন মেয়ের মধ্যে মেজ মেয়েকে হারিয়ে মা জুঁই বেগম নির্বাক হয়ে বসে আছেন। মাঝেমধ্যে চিৎকার দিয়ে উঠছেন। জুঁই বেগম জানান, গত সোমবার দুপুর ১২টার দিকে বাড়িসংলগ্ন সড়কের পাশে খেলছিল সাফা। এ সময় রাস্তার এক পাশ থেকে অন্য পাশে যাওয়ার সময় একটি ব্যাটারিচালিত অটো ভ্যান তাকে চাপা দেয়। গুরুতর অবস্থায় ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান তাঁরা। এ ঘটনায় সাফার একটি হাত ভেঙে যায় এবং মাথায় গুরুতর আঘাত পায়।

শিশুটির বাবা রবিন শেখ অভিযোগ করে বলেন, ‘ট্রমা বিভাগ থেকে ব্যান্ডেজ শেষে সার্জারিতে পাঠানো হয়। তখন অক্সিজেন লাগানো ছিল। এ সময় একটি ট্রলি চেয়েছিলাম, কিন্তু থাকতেও আমাকে দেওয়া হয়নি। পরে বাধ্য হয়ে আমার বড় ভাই বাচ্চাটারে কোলে নেয় এবং আমি অক্সিজেন উঁচু করে দৌড়ায় গিয়েছিলাম। কোলে করে নিতে গিয়ে ক্যানুলা খুলে যায় এবং আরও অসুস্থ হয়ে যায়। সার্জারি বিভাগে যাওয়ার পর নার্সদের ডাকলেও আসেননি, আধা ঘণ্টা পরে একজন এসে ক্যানুলা লাগিয়ে দেয়; ততক্ষণে স্যালাইন বন্ধ ছিল। এরপর একজন ডাক্তার এসে দ্রুত ঢাকায় নিয়ে যেতে বলেন।’

গতকাল দুপুরেও হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় ট্রলি-বাণিজ্যের নৈরাজ্য। একাধিক রোগীর স্বজনের অভিযোগ, ট্রলিতে রোগী ওঠানো-নামানোর পরেই ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়। টাকা না দিতে চাইলে দুর্ব্যবহার করে আদায় করা হয়, এমনকি ট্রলিও দেওয়া হয় না।

ফরহাদ হোসেন নামের এক রোগীর স্বজন বলেন, ‘আমার রোগীকে ইসিজি করার জন্য বাইরে নেওয়া হয়। রোগীকে নামিয়েই এক ব্যক্তি ২০০ টাকা দাবি করেন। আমার কাছে টাকা কম থাকায় পরে দিতে চাইলে আমার সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করা হয়।’

এ বিষয়ে হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘হাসপাতালে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ করা কর্মচারীরা রোগীদের ট্রলি বহনের দায়িত্বে থাকেন। রোগী বহনের পর এক টাকাও নেওয়ার নিয়ম নেই। কারণ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাঁদের বেতন দিয়ে থাকেন। যাঁরা টাকা দাবি করছেন, তাঁদের নামে অভিযোগ দিলে আমরা ঊর্ধ্বতনকে জানাব।’

মুমূর্ষু শিশুর সঙ্গে হাসপাতাল থেকে কোনো অবহেলা করা হয়নি বলে দাবি করেন হাসপাতালটির উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত পরিচালক) মানষ কৃষ্ণ কুন্ডু। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ভিডিওটি দেখার সঙ্গে সঙ্গে খোঁজ নিয়েছি এবং কর্তব্যরতদের ডেকেছিলাম। মূলত শিশুটির শারীরিক অবস্থা ভালো না থাকায় ট্রলি দেওয়া হয়নি।’ ওই মুহূর্তে তাকে কোলে করে নেওয়া উত্তমই ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন। এ ছাড়া হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত ট্রলি আছে বলে দাবি করেন এবং টাকা দাবির বিষয়ে অবগত নন বলেও জানান।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত