Ajker Patrika

ফরিদপুরে পরীক্ষা ছাড়াই অস্ত্রোপচারে কলেজছাত্রীর মৃত্যুর অভিযোগ

হাসান মাতুব্বর (শ্রাবণ), ফরিদপুর
ফরিদপুরে পরীক্ষা ছাড়াই অস্ত্রোপচারে কলেজছাত্রীর মৃত্যুর অভিযোগ
নিহত কলেজছাত্রী আয়েশা আফরিন। ছবি: সংগৃহীত

‘আমার মাইয়্যাডারে ওরা মাইর‍্যা ফেলায়ছে, কত সুন্দর মাইয়্যা আমার, সুস্থভাবে আনছিলাম, ওরা মাইর‍্যা ফেলছে।’—এভাবেই ফরিদপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে বসে আহাজারি করতে দেখা গেছে আলেয়া বেগম নামের এক নারীকে। তাঁর ভাষ্য, অ্যাপেন্ডিসাইটিসের অস্ত্রোপচার করাতে মেয়েকে নিয়েছিলেন হাসপাতালটিতে। কিন্তু সার্জারি চিকিৎসক আতঙ্ক সৃষ্টি করে ও তড়িঘড়ি করে আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষা ছাড়াই অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যান। পরে অস্বাভাবিকভাবে পেট কেটে ফেলায় তাঁর মেয়ের মৃত্যু হয়।

আলেয়া বেগম ফরিদপুর জেলার সদরপুর উপজেলার আকোটেরচর ইউনিয়নের কালিখোলা গ্রামের সৌদিপ্রবাসী লিটু মাতুব্বরের স্ত্রী। তাঁদের দুই মেয়েসন্তান। এর মধ্যে বড় মেয়ে আয়েশা আফরিন (১৭) ফরিদপুর জেলা শহরের সরকারি ইয়াছিন কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়াশোনা করত।

জানা যায়, গত শুক্রবার রাতে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রধান ফটকের বিপরীত পাশে অবস্থিত আলজারা স্পেশালাইজড হসপিটাল নামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে অ্যাপেন্ডিসাইটিসের অস্ত্রোপচার হয় ওই কলেজের ছাত্রী আয়েশা আফরিনের। পরদিন গতকাল শনিবার সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরেকটি বেসরকারি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।

মৃত্যুর পরে সার্জারি চিকিৎসক ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক আতিকুল আহসান ও হাসপাতালে কর্মরত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ তোলেন নিহত আয়েশার পরিবার।

আলেয়া বেগমের ভাষ্য, গত বৃহস্পতিবার আয়েশা আফরিনের পেটব্যথা শুরু হলে শহরের ল্যাব এইড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে গেলে চিকিৎসকের মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে অ্যাপেন্ডিসাইটিস শনাক্ত হয়। পরে অস্ত্রোপচারের জন্য পরিচিত এক ব্যক্তির মাধ্যমে আলজারা স্পেশালাইজড হসপিটালে যান। সেখানে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আতিকুল আহসান আসেন।

আলেয়া বেগম বলেন, ‘ল্যাব এইডে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফলের পর সেখানকার চিকিৎসক জানান—আমার মেয়ের ছোট আকারের অ্যাপেন্ডিসাইটিস হয়েছে, চাইলে অস্ত্রোপচার করাতে পারি। তারপর আমরা অপারেশন করার জন্য সরাসরি আলজারা হাসপাতালে চলে গিয়েছিলাম।’

আলেয়া বেগম অভিযোগ করে বলেন, ‘আতিকুল আহসান এসেই বলেন—‘‘আপনার মেয়ের পেটের ভেতরে অ্যাপেন্ডিসাইটিস ছড়িয়ে পড়েছে।’’ তখন হাসপাতাল থেকে নতুন করে আল্ট্রা করার কথা জানানো হয়। এরপর হাসপাতালে আল্ট্রা করতে গেলে এক লোক বলে—সে আল্ট্রা করতে পারবে না, আরেকজন করবে। তাকে ফোন দেওয়া হলে সে-ও আসে না। পরে ডাক্তারকে গিয়ে বললে উত্তেজিত হয়ে বলেন—‘‘আমি চলে যাব, আপনারা করলে করেন, না করলে না করেন। আমার একটা রোগী না, অনেক রোগী আছে।’’’

আলেয়া বেগম আরও অভিযোগ করে বলেন, ‘অ্যাপেন্ডিসাইটিস ফেটে যাওয়ার কথা শোনার পর আমরা ভয় পেয়ে যাই। এরপর ডাক্তার চলে যেতে চাইলে আরও ভয় পেয়ে অপারেশন করাতে বলি। অপারেশনের একপর্যায়ে ডাক্তার এসে বলেন—‘‘আপনার মেয়ের পেটের মধ্যে নাড়িভুঁড়ি জড়িয়ে গেছে।’’ অপারেশন করার পর আমরা গিয়ে দেখি—নাভি থেকে বুক পর্যন্ত কেটে সেলাই দেওয়া হয়েছে, মেয়েটার জ্ঞানও নেই। পরে অবস্থার অবনতি হলে শহরের রেজোয়ান মোল্যা হাসপাতালে নিয়ে যাই এবং সেখানে সকালে মারা যায়।’

পরে মৃত্যুর ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে চাপ সৃষ্টি করা হয় পরিবারটিকে। বিষয়টি গতকাল রাত ১০টা থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং সমালোচনা শুরু হয়। তবে আজ বিকেল পর্যন্ত সিভিল সার্জনের কাছে পরিবারটি অভিযোগ করেনি।

এদিকে মেয়ের মৃত্যুর খবরে গতকাল রাত ১১টায় সৌদি আরব থেকে দেশে পৌঁছেছেন বাবা লিটু মাতুব্বর। বিষয়টি নিশ্চিত করেন প্রবাসীর ফুফাতো ভাই মামুন হোসেন।

মামুন হোসেন বলেন, ‘মেয়েটির দাফন শেষে আমরা সকলে বসে সিদ্ধান্ত নেব এবং অবশ্যই অভিযোগ দায়ের করব। যাতে এভাবে করে আর কোনো মানুষের মৃত্যু না হয়। আমরা ওই ডাক্তারের শাস্তির দাবি জানাই।’

এ বিষয়ে হাসপাতালটির চেয়ারম্যান শামীম আশরাফ বলেন, ওই রোগীর নাড়ির ভেতরে ছিদ্র ছিল এবং ওই ছিদ্র দিয়ে পায়খানা ছড়িয়ে পচে যায়। যার কারণে পেট ওপেন করে পরিষ্কার করা হয়। বিষয়টি আগেই পরিবারকে জানানো হয়েছিল এবং মা, ফুফাসহ তিনজন স্বজন অস্ত্রোপচারের সম্মতি দেন।

চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘এরপর অস্ত্রোপচার করা হলে রোগী শকে চলে যাওয়ায় আইসিইউয়ের প্রয়োজন হয়। পরে অন্য হাসপাতালে আইসিইউতে পাঠানো হয়েছিল। এখন মারা যাওয়ার পর বিভিন্ন মহলের মাধ্যমে ফুসলিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া হচ্ছে।’

একই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আরও মৃত্যুর অভিযোগ

চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল একই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অস্ত্রোপচারের পর মিম (১৪) নামের এক কিশোরীর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছিল। পরিবারের অভিযোগ ছিল—অপারেশনের সময় অসাবধানতাবশত মিমের গলার একটি গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি কেটে যায়। এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে সে মারা যায়।

এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ বা সংশ্লিষ্টদের। যদিও জেলা সিভিল সার্জন মাহামুদুল হাসানের দাবি—অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

নতুন করে তদন্ত কমিটি

কলেজছাত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানান সিভিল সার্জন মাহামুদুল হাসান। কমিটিতে ডেপুটি সিভিল সার্জন বদরুদ্দোজা টিটুকে প্রধান করা হয়েছে।

এ বিষয়ে সিভিল সার্জন মাহামুদুল হাসান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘কলেজছাত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় কোনো অভিযোগ পাইনি। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে জেনেই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া ওই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আগের একাধিক অভিযোগ রয়েছে বলে আমি জেনেছি। তাই আমরা গুরুত্বসহকারে বিষয়টিকে দেখব।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত