Ajker Patrika

‘নয়ন ভরা জল’ গেয়ে ভাইরাল লাইলী খালা জানালেন জীবনের অজানা গল্প

ফরিদপুর প্রতিনিধি
আপডেট : ২৬ মে ২০২৬, ২০: ৩৯
‘নয়ন ভরা জল’ গেয়ে ভাইরাল লাইলী খালা জানালেন জীবনের অজানা গল্প
এমপির অনুষ্ঠানে গান গেয়ে ভাইরাল লাইলী খালা। ছবি: সংগৃহীত

কাঁধে একটি থলে ঝুলিয়ে জীর্ণশীর্ণ শরীরে দিনরাত পথে প্রান্তরেই থাকেন ভবঘুরে লাইলী বেগম (৬৫)। আর এই জীবনই তাঁকে হঠাৎ আলোচনায় এনে দিয়েছে।

শুধু ফরিদপুর নয় সারা দেশেই আলোচিত নাম হয়ে উঠেছেন লাইলী খালা। কেউ কেউ আবার তাঁকে লাইলী পাগলি বলেও সম্বোধন করে থাকেন। যে মানুষটি গানের সুরে আর আধ্যাত্মিক টানে হয়েছেন সংসারবিরাগী। কখনো লোকগান, কখনো কাওয়ালি, বাওয়ালি, লালনগীতি আর নজরুলগীতি গেয়ে মানুষের মন জয় করে থাকেন।

তবে এবার বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তীতে ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের আয়োজনে আলোচনা সভায় ‘নয়ন ভরা জল’ গান গেয়ে আলোড়ন তৈরি করেছেন। তাঁর সুর-তাল-লয়ে মুগ্ধ হয়েছেন সকলে। যে গানটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নেটিজেনদের নজর কাড়ে।

‘লাইলী খালা’ নামেই ফরিদপুরের শিল্প-সাহিত্যাঙ্গনে বেশ পরিচিত। গানের টানে ভবঘুরে হয়েছেন এই নারী। গত ২৪ মে ফরিদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য চৌধুরী নায়াব ইউসুফ আহমেদের বাড়িতে আয়োজিত নজরুল জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠানে গান গেয়ে আলোচনা আসেন তিনি।    

লাইলী বেগম ফরিদপুর শহরের হাড়োকান্দি এলাকার মৃত শেখ ইসলামের প্রথম স্ত্রী। ২০১৫ সালের দিকে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় তাঁর স্বামী। তাঁর দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। তাঁদের মধ্যে বড় ছেলে আপুত মনা পেশায় রং মিস্ত্রি এবং ছোট ছেলে টুটুল শেখ মাংস ব্যবসায়ী। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন।

আলোচিত সংসারবিরাগী লাইলী খালা। ছবি: আজকের পত্রিকা
আলোচিত সংসারবিরাগী লাইলী খালা। ছবি: আজকের পত্রিকা

পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়ের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘ ১৩ থেকে ১৫ বছর আগেই ছেড়েছেন স্বামীর বাড়ি, হয়েছেন সংসারবিরাগী। এরপর থেকে কখনো স্থায়ীভাবে বাড়িতে থাকেননি। দিনরাত থাকেন পথে প্রান্তরে, কখনো থাকেন মাজারে আবার কখনো ছুটে যান পল্লি কবি জসিমউদ্দিনের বাড়িতে। এ ছাড়া কোনো গানের আসর বা মঞ্চ দেখলেই ছুটে যান সেখানে এবং চেষ্টা করেন গান গাইতে।

আজ মঙ্গলবার তাঁর সন্ধানে বাড়িতে গেলে পাওয়া যায়নি। চোখে পড়ে দুটি ঝুপড়ি ঘর। কখনো বাড়িতে এলে এর একটিতে কোনোরকম রাত কাটান লাইলী বেগম। ঘরগুলো জরাজীর্ণ। সেখানেই তাঁর দুই ছেলে বসবাস করেন। আরেকটি আধপাকা ঘরে এক মেয়ে স্বামী ও ছেলে-মেয়ে নিয়ে বসবাস করছেন। পরিবারের সদস্যরা জানান, তাঁকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর!

লাইলী খালার জরাজীর্ণ ঘর। ছবি: আজকের পত্রিকা
লাইলী খালার জরাজীর্ণ ঘর। ছবি: আজকের পত্রিকা

দীর্ঘক্ষণ বাড়িটিতে অবস্থান করে একপর্যায়ে দেখা মেলে লাইলী খালার। কাঁধে থলে ঝুলিয়ে প্রবেশ করেন বাড়িতে। এলোমেলোভাবে গায়ে জড়ানো একটি লাল রঙের কাপড়। দেখে মনে হয় যেন পাগল। কথা হয় তাঁর সঙ্গে, জানান তাঁর সংসারবিরাগী হওয়ার অজানা তথ্য। মন জুড়ানো কাওয়ালি, বাউল গান ও নজরুলগীতি গেয়েও শোনান।

লাইলী বেগম জানান, ছোট বেলা মায়ের হাত ধরেই গান শেখা। হারমোনিয়ামও কিনে দিয়েছিলেন মা। তিনি নাচেও পারদর্শী ছিলেন। খুব অল্প বয়সেই বিয়ে হয়। বিয়ের পরও গান গেয়ে যান, তবে কিছুটা বাধাও ছিল। স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করলে অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে যান। সেখান থেকেই সংসার বিরাগি হন। তবে ২০১৫ সালে স্বামী মারা গেলে ওই দিনই বাড়িতে ছুটে এসেছিলেন। এরপর থেকে বিভিন্ন গানের আসরে ছুটে গিয়ে গান গেয়ে আয় রোজগারও করেন। পুরোদস্তুর একজন গাতক হয়ে ওঠেন। তবে কখনো মূল্যায়ন পাননি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এমনকি গান গাওয়ায় ছেলেদের কথাও শুনতে হয় তাঁকে।

কেঁদে কেঁদে লাইলী বেগম বলেন, আমাদের কেউ মূল্যায়ন করে না, আমাদের পরিস্থিতি খুবই খারাপ। আমি মূল্য কারও কাছে পেতে চাই না, পাওয়া লাগবেও না। আল্লাহ যদি মূল্য দেয় কিংবা আমার গুরু কৃপাবল হয়। আমি লালনের বড় স্টেজে গান গেয়েছি। আমি কখনো ভাবি না যে, আমি খুব পারদর্শী একজন গায়ক। শুধু আমি একজন আধ্যাত্মিক মানুষ। গানই আমার জীবন, কেউ কষ্ট দিলে গান ধরে আমি চলে যাই। গান ছাড়া আমি বাঁচতে পারি না। কারণ, গানই মানুষের আত্মার খোরাক। গান গাইলে নিজেরও ভালো লাগে, অন্যেরও ভালোবাসা পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, আমি কী, কী ছিলাম, কেউ বুঝবে না; কেউ বুঝবে না আমার দুঃখ, আমার আর্তনাদ। আমি যখন এই পৃথিবীতে থাকব না, এই পৃথিবী ছেড়ে আমি চলে যাব; তখন আমার পোলাপান বুঝতে পারবে যে, কতটুকু একটা জিনিস ছিল, কতটুকু একটি কাচের টুকরো ছিল এই বাড়িতে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আধ্যাত্মিক টানে কোনো ভিসা-পাসপোর্ট ছাড়াই তিনি হেঁটে আজমির শরিফ পর্যন্ত চলে গিয়েছিলেন। লোকসংগীতের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি শিল্পীদের গানও গাইতে পারেন তিনি।

ফরিদপুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক হাসানউজ্জামান বলেন, ‘প্রায় ২০ বছর ধরে তাঁকে শহরে দেখছি। খুবই ভালো মনের মানুষ। শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ান, গান করেন, কখনো কারও কোনো ক্ষতি করেননি। অনুষ্ঠানে হঠাৎ করেই তাঁকে গান গাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাঁর গান এভাবে ভাইরাল হবে, তা ভাবিনি।’

ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মফিজ ইমাম মিলন বলেন, ‘অনেক বছর আগে থেকেই লাইলীর গান শুনে মুগ্ধ আমি। শিল্পকলা একাডেমিতে গানের চর্চা চলার সময় চুপচাপ বসে থাকতে দেখতাম তাঁকে। একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন এভাবে ঘুরে বেড়ান? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, আমি মানুষ দেখি। দুনিয়াতে কত রকমের মানুষ, কারও সঙ্গে কারও মিল নাই। মানুষ দেখতে আমার ভাল্লাগে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত