মানিকগঞ্জ ও সাভার: ডাকঘর আছে, পোস্টমাস্টার নেই
• মানিকগঞ্জের ছয় উপজেলা পোস্টমাস্টারের পদ শূন্য।
• ডাক বিভাগের দুই উপবিভাগের ৬৫টি পদে জনবল নেই।
• অন্য পদের কর্মীদের দিয়ে জোড়াতালিতে চলছে পোস্টমাস্টারের কাজ।
• ডাকে চিঠি পাঠাতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার সেবাপ্রত্যাশীরা।

ডাক বিভাগের মানিকগঞ্জ ও ঢাকা জেলার সাভার–এই দুই উপবিভাগে সহকারী পরিদর্শকসহ মোট ৬৫টি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে মানিকগঞ্জের সাতটি উপজেলার ছয়টিতেই উপজেলা পোস্টমাস্টারের পদ ফাঁকা। ফলে এসব ডাকঘরে পোস্টমাস্টারের দায়িত্ব পালন করছেন অন্য পদের কর্মীরা। পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ের জনবল সংকটে ভুগছে সাভার ও ধামরাই অঞ্চলের ডাকঘরগুলো।
ডাক বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ডাকঘরগুলোতে চিঠি আদান-প্রদানের পাশাপাশি পার্সেল গ্রহণ, বিতরণ, দাপ্তরিক যোগাযোগ এবং বিভিন্ন ধরনের আর্থিক লেনদেনের কাজও হয়। ফলে প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় এসব সেবা পরিচালনা বিঘ্ন হচ্ছে।
সম্প্রতি মানিকগঞ্জ, সাভার ও ধামরাইয়ের বিভিন্ন ডাকঘরে জনবল সংকটের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ডাকঘরগুলো থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য না পাওয়ায় তথ্য অধিকার আইনে ঢাকার ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেলের (ডিপিএমজি) কার্যালয়ে আবেদন করা হয়। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে ডাকঘরগুলোর জনবল সংকটের চিত্র পাওয়া গেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় অবস্থিত জেলার প্রধান ডাকঘরসহ জেলার ছয়টি উপজেলা এবং ঢাকার সাভার ও ধামরাইয়ের দুটি মিলে মোট আটটি উপজেলা ডাকঘর রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে ১০টি উপডাকঘর, ৫৪টি শাখা ডাকঘর, চারটি অবিভাগীয় উপডাকঘর (ইউডিএসও) এবং ৮২টি অবিভাগীয় শাখা ডাকঘর (ইডিবিও)।
ডাক বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, মানিকগঞ্জ উপবিভাগের অধীনে সাটুরিয়া, ঘিওর, দৌলতপুর, শিবালয় ও হরিরামপুর উপজেলা ডাকঘরে উপজেলা পোস্টমাস্টারের পদ শূন্য। এ ছাড়া এসব উপজেলায় তিনটি সাব-পোস্টমাস্টার, পাঁচটি পোস্টাল অপারেটর, ছয়টি পোস্টম্যান, চারটি প্যাকার (প্যাকেট প্রস্তুতকারী), চারটি রানার (চিঠি বিতরণকারী) ও ১১টি ইডিএর (খণ্ডকালীন এজেন্ট) পদ শূন্য রয়েছে। সব মিলিয়ে ৩৮টি পদ শূন্য রয়েছে।
অন্যদিকে সাভার উপবিভাগের অধীন সাভার, ধামরাই ও সিংগাইর (মানিকগঞ্জ) অঞ্চলের ডাকঘরগুলোতেও ২৭টি পদ শূন্য আছে। এর মধ্যে সিংগাইর উপজেলা ডাকঘরের উপজেলা পোস্টমাস্টারের পদও শূন্য। এ ছাড়া এ উপবিভাগে একজন সহকারী পরিদর্শক, সাতজন সাব-পোস্টমাস্টার, তিনজন পোস্টাল অপারেটর, চারজন পোস্টম্যান, চারজন প্যাকার, দুজন রানার ও পাঁচজন ইডিএর পদ শূন্য রয়েছে। এই হিসাব অনুযায়ী দুই উপবিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের ডাকঘরে উপজেলা ও সাব-পোস্টমাস্টার থেকে শুরু করে চিঠি বিলি ও পরিবহনের কাজে যুক্ত কর্মীদের ৬৫টি পদে শূন্যতা আছে।
এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সাটুরিয়া উপজেলা ডাকঘরের পোস্টমাস্টারের দায়িত্ব পালন করছেন পোস্টাল অপারেটর মুস্তাকুর রহমান। পদটি শূন্য থাকায় তাঁকে এই দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। মুস্তাকুর রহমান বলেন, ‘পোস্টাল অপারেটর হয়েও আমাকে উপজেলা পোস্টমাস্টারের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এ জন্য আমাকে বাড়তি কোনো আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয় না।’
সাভার উপজেলা ডাকঘরের পোস্টমাস্টার মনোয়ারা বেগম বলেন, দেশে কুরিয়ার সার্ভিসের প্রচলন হওয়ার পর ডাকঘরমুখী মানুষের সংখ্যা অনেকটা কমে গিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডাকঘরের মাধ্যমে চিঠি ও পার্সেল পাঠানোর প্রবণতা বেড়েছে। বিদেশ ও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন কয়েক শ চিঠি ও পার্সেল সাভার ডাকঘরে আসে, যা প্রাপকের কাছে পৌঁছে দিতে হয়। একইভাবে দেশের বাইরে ও দেশের ভেতরে পাঠানোর জন্য প্রতিদিন কয়েক শ চিঠি ও পার্সেল এই ডাকঘরে জমা হয়, যা প্রতিদিনই নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হয়।
মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘শুধু চিঠি ও পার্সেল আদান-প্রদান নয়, ডাকঘরে দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি আর্থিক লেনদেনের কাজও করতে হয় আমাদের। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় দৈনন্দিন কাজ সামলাতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।’
জনবল সংকটের কথা তুলে ধরে মনোয়ারা বেগম বলেন, সাভার উপজেলা ডাকঘরে একজন সহকারী পরিদর্শকের পদ থাকলেও ওই পদে কোনো জনবল নেই। তিনটি পোস্টাল অপারেটর পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন একজন। তিনটি পোস্টম্যান পদের বিপরীতে আছেন দুজন। এ ছাড়া একজন প্যাকার থাকার কথা থাকলেও পদটিতে কোনো কর্মী নেই। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোর পরও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপডাকঘরেও জনবলের সংকট রয়েছে। ডাকঘরটির সাব-পোস্টমাস্টারের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। সেখানে একজন পোস্টাল অপারেটরকে দিয়ে সাব-পোস্টমাস্টারের দায়িত্ব পালন করানো হচ্ছে।
ডাকঘরটির দায়িত্বে থাকা পোস্টাল অপারেটর কল্যাণী রানী সাহা বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমি সাব-পোস্টমাস্টারের দায়িত্ব পালন করছি। এভাবে আর কত দিন চলবে, তা আমার জানা নেই।’
ডাকঘরের জনবল সংকটের প্রভাব কেবল কর্মীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এর প্রভাব পড়ছে নিয়মিত চিঠি ও পার্সেল পাঠানো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপরেও। বিশেষ করে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চিঠি, চাকরির আবেদন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র, গুরুত্বপূর্ণ নথি ও ব্যবসায়িক পার্সেল পাঠানোর ক্ষেত্রে যাঁরা ডাকসেবা গ্রহণ করে থাকেন তাঁদের ওপর।
মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার ধল্লা এলাকার অ্যাসপায়ার গার্মেন্টস লিমিটেডের মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা রুবেল হোসেনকে প্রতিষ্ঠানের চিঠি রেজিস্ট্রি করতে প্রায়ই সাভার ডাকঘরে আসতে হয়। রুবেল বলেন, ‘জনবল সংকটে ডাকঘর থেকে
শুধু খামে ডাকটিকিট লাগিয়ে অনলাইনে নিবন্ধনের কাজ করা হয়। আর বাকি কাজ নিজেকেই করতে হয়। কিছুদিন আগেও প্রায় ৩০০টি চিঠির রেজিস্ট্রির প্রাথমিক কাজ আমাকেই করে দিতে হয়েছে।’
সাভার ডাকঘরের পোস্টম্যান আকমল হোসেন বলেন, ‘আমার কাজ চিঠি ও পার্সেল বিলি করা। কিন্তু চিঠি ও পার্সেল বিলির পাশাপাশি দাপ্তরিক কাজসহ ব্যাংকের কাজও আমাকেই করতে হয়।’
সাভার উপবিভাগের ডাকঘর পরিদর্শক মো. মিজানুর রহমান বলেন, জনবল সংকটের কারণে ডাকঘরগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। যে জনবল আছে তাঁদের দিয়ে সব কাজ চালাতে হয়। শিগগির শূন্য পদগুলো পূরণ করা হবে কি না, তা বলা যাচ্ছে না।
জনবল সংকটের বিষয়ে জানতে গতকাল মঙ্গলবার ডাক বিভাগের মানিকগঞ্জ উপবিভাগের পরিদর্শক মো. নাঈমকে মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলে তিনি সাড়া দেননি।








