Ajker Patrika

বাংলালিংক ও দুই প্রতিষ্ঠান: তিন মাসের নিয়োগে এক যুগ অস্থায়ী

• আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে তিন মাসের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়।

• তিন মাস পরপর চুক্তি নবায়ন করে অস্থায়ী কর্মী করে রাখা হয়েছে।

• চাকরি স্থায়ী না হওয়ায় অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

আমানুর রহমান রনি, ঢাকা
বাংলালিংক ও দুই প্রতিষ্ঠান: তিন মাসের নিয়োগে এক যুগ অস্থায়ী
প্রতীকী

তিন মাসের চুক্তিতে নিয়োগ দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে বছরের পর বছর। কিন্তু এখনো তাঁদের স্থায়ী কর্মী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। দেশের অন্যতম শীর্ষ মোবাইল অপারেটর বাংলালিংক ডিজিটাল কমিউনিকেশনস লিমিটেডের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ প্রতিষ্ঠানটির ৯৯ জন কর্মীর।

ভুক্তভোগী প্রকৌশলী ও কর্মীদের ভাষ্য, তাঁদের কেউ ৭ বছর, কেউ ৯ বছর, আবার কেউ কেউ এক যুগ ধরে প্রতিষ্ঠানটির নেটওয়ার্ক পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট কাজে নিয়োজিত। তিন মাস পরপর চুক্তি নবায়ন করে তাঁদের অস্থায়ী কর্মী হিসেবেই রাখা হয়েছে। এতে নিয়মিত কর্মীদের মতো সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি, অর্জিত ছুটির মজুরি এবং অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন তাঁরা।

ভুক্তভোগী কর্মীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বাংলালিংকের স্থায়ী প্রকৃতির পদে কাজ করলেও তাঁদের স্থায়ী কর্মী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি; বরং আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়োগ দিয়ে তিন মাস পরপর চুক্তি নবায়ন করা হয়েছে। একপর্যায়ে গত বছরের ২ ফেব্রুয়ারি ই-মেইলে তাঁদের চাকরিচ্যুতির নোটিশ দেওয়া হয়। শ্রম অধিদপ্তরে অভিযোগের পর সেই নোটিশ প্রত্যাহার করা হলেও মূল সমস্যার সমাধান হয়নি। শেষ পর্যন্ত চাকরি স্থায়ীকরণ, বকেয়া পাওনা আদায় এবং শ্রম আইনে নির্ধারিত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবিতে বাংলালিংক ও তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুটি আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান ফ্রন্ট ডেস্ক বাংলাদেশ লিমিটেড এবং সার্চলাইট কমিউনিকেশনস লিমিটেডের বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলা করেছেন ৯৯ জন প্রকৌশলী ও কর্মী।

সার্চলাইট কমিউনিকেশনসের মাধ্যমে ২০১৭ সাল থেকে টানা ৯ বছর বাংলালিংকে বিএসএস অফিসার হিসেবে কাজ করছেন মো. রফিকুল ইসলাম। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, তাঁর কাজ প্রতিষ্ঠানের মূল ব্যবসায়িক কার্যক্রমের অংশ এবং স্থায়ী প্রকৃতির হলেও তাঁকে এখনো আউটসোর্স কর্মী হিসেবে রাখা হয়েছে। একই ধরনের দায়িত্ব পালন করেও স্থায়ী কর্মীদের তুলনায় সুযোগ-সুবিধায় বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন তিনি। এ কারণে তাঁরা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।

আরেক ভুক্তভোগী প্রকৌশলী মো. মানিক উদ্দিন বলেন, ‘৯টি বছর ধরে আমরা স্থায়ী চাকরি করেও খাতা-কলমে অস্থায়ী হিসেবে রয়েছি। তিন মাসের কথা বলে ৯ বছর পার করেছে; তা-ও স্থায়ী নয়। এটা খুবই মানসিক চাপ। বাংলালিংক শ্রম আইনের অপব্যবহার করে আমাদের আউটসোর্স বানিয়ে রেখেছে, যা সম্পূর্ণ অবৈধ।’

কর্মীদের অভিযোগ, অস্থায়ী নিয়োগের এই কাঠামোর কারণে তাঁরা নিয়মিত বেতন বৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্ট, অর্জিত ছুটির আর্থিক সুবিধা এবং অতিরিক্ত কাজের জন্য প্রাপ্য ওভারটাইমের মজুরি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। একই প্রতিষ্ঠানের জন্য বছরের পর বছর একই ধরনের কাজ করলেও নিয়োগের ধরন অস্থায়ী রেখে তাঁদের শ্রমিক অধিকার সীমিত করা হয়েছে বলে দাবি তাঁদের।

চাকরিচ্যুতির নোটিশ পাওয়ার পর কর্মীরা একত্র হয়ে প্রতিকারের দাবিতে গত বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন। সেখানে শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে আটটি সুনির্দিষ্ট প্রতিকার দাবি করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি ই-মেইলের মাধ্যমে আগের ছাঁটাইয়ের নোটিশ প্রত্যাহার করে নেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে কর্মীদের চাকরি বহাল রাখার কথা জানানো হয়। এতে সাময়িক স্বস্তি ফিরলেও মূল বিরোধের নিষ্পত্তি হয়নি বলে দাবি কর্মীদের।

বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নেয় শ্রম ও কলকারখানা অধিদপ্তর। গত বছরের ১০ এপ্রিল উভয় পক্ষকে বৈঠকে ডাকা হলেও কর্মীদের অভিযোগ, এতে বাংলালিংকের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। শ্রম অধিদপ্তরে অভিযোগ করেও প্রত্যাশিত প্রতিকার না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন তাঁরা। গত বছরের ২৫ জুন ৯৯ জন কর্মী বাদী হয়ে শ্রম আদালতে মামলা করেন। মামলায় বিবাদী করা হয়েছে বাংলালিংক ডিজিটাল কমিউনিকেশনস লিমিটেড, ফ্রন্ট ডেস্ক বাংলাদেশ লিমিটেড ও সার্চলাইট কমিউনিকেশনস লিমিটেডকে।

মামলায় কর্মীদের পক্ষ থেকে চাকরি স্থায়ী করার পাশাপাশি বকেয়া ছুটির মজুরি, ওভারটাইমের পাওনা এবং শ্রম আইন অনুযায়ী অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। দীর্ঘদিন অস্থায়ী ভিত্তিতে স্থায়ী প্রকৃতির কাজ করিয়ে নেওয়ার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।

ভুক্তভোগী প্রকৌশলী ও কর্মীদের আইনজীবী শাহ আলম আজকের পত্রিকাকে বলেন, নেটওয়ার্ক অপারেশন স্পেশালিস্ট ইঞ্জিনিয়ার, রিজিওনাল অপারেশনস স্পেশালিস্ট ইঞ্জিনিয়ার, বিএসএস স্পেশালিস্ট ইঞ্জিনিয়ার, বিএসএস অফিসার ও বিএসএস রিগার পদে এসব অস্থায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মামলা হওয়ার পর কর্মীদের পদবিও পরিবর্তন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন এই আইনজীবী।

তবে ফ্রন্ট ডেস্ক বাংলাদেশ লিমিটেডের মানবসম্পদ বিভাগের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ তান্মি ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, কর্মীদের নিয়োগের সময়ই অস্থায়ী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বাংলালিংক প্রতি তিন মাস পর কাজের অর্ডার দেয়। সেই অনুযায়ী তাঁদের প্রতিষ্ঠান আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগ দিয়ে কাজ করায়। এভাবেই অনেকে সাত-আট বছর ধরে কাজ করছেন।

তবে কর্মীদের অভিযোগ, নিয়োগের সময় অস্থায়ী হিসেবে উল্লেখ করলেই বছরের পর বছর স্থায়ী প্রকৃতির কাজ করানোর বৈধতা তৈরি হয় না। তাঁদের মতে, নিয়োগের ধরন ও কাজের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টি বিচার করা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে সার্চলাইট কমিউনিকেশনস লিমিটেডের কি-এক্সিকিউটিভ অফিসার শফিকুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘অভিযোগকারীদের অভিযোগ পুরোপুরি সত্য বা পুরোপুরি মিথ্যা নয়। তাঁরা অনেকে অনেক দিন ধরে আছেন, তবে তাঁদের আমরা এভাবেই তিন মাস ও ছয় মাসের জন্য নিয়োগ দিই। কেউ যদি চাকরি করতে না চান, তাহলে চলে যেতে পারেন।’

জানতে চাইলে বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, বাংলালিংক কিছু মামলার নোটিশ পেয়েছে, যা বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন। বাংলালিংক সংশ্লিষ্ট আদালতে নিজের অবস্থান যথাযথভাবে তুলে ধরেছে এবং আদালতের যেকোনো সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা মেনে চলবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত