Ajker Patrika

অধস্তন আদালত: মামলা বাড়লেও বাড়েনি বিচারক

  • দেশের জনসংখ্যার তুলনায় লাখ মানুষের জন্য বিচারক মাত্র একজন।
  • বর্তমানে বিচারক ২ হাজার ২৩৭ জন, বিচারকাজে থাকেন ১ হাজার ৮৩৭ জন।
  • বিচারকের সংখ্যা ১০ হাজার করার পক্ষে মত আইনজীবী-বিচারকদের।
  • ১১ বছরেও বাস্তবায়িত হয়নি সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা।
এস এম নূর মোহাম্মদ, ঢাকা  
আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০৩: ৩৪
অধস্তন আদালত: মামলা বাড়লেও বাড়েনি বিচারক

সারা দেশের অধস্তন আদালতে বর্তমানে বিচারক আছেন ২ হাজার ২৩৭ জন। তাঁদের মধ্যে প্রেষণ, মন্ত্রণালয়ে সংযুক্তি, শিক্ষা ছুটি, মাতৃত্বকালীন ছুটিসহ নানা কারণে চার শতাধিক বিচারককে আদালতের বিচারকাজ থেকে দূরে থাকতে হয় সারা বছর। তাতে আদালতের বিচারকাজ করছেন ১ হাজার ৮৩৭ বিচারক। সে হিসাবে দেশের জনসংখ্যার তুলনায় গড়ে এক লাখের বেশি মানুষের জন্য বিচারক মাত্র একজন।

সুপ্রিম কোর্টে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত প্রায় ৪৮ লাখ মামলা বিচারাধীন। এগুলোর মধ্যে সারা দেশের জেলা আদালতে বিচারাধীন ৪০ লাখ ৭৮ হাজার মামলা। ২০০৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অধস্তন আদালতে বিচারাধীন ছিল ১৪ লাখ ৮৯ হাজার ১২১টি মামলা। দেড় যুগে মামলা বেড়েছে প্রায় ২৬ লাখ। তবে জনসংখ্যা ও মামলার সংখ্যা পাল্লা দিয়ে বাড়লেও সেই তুলনায় বাড়েনি বিচারকের সংখ্যা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল আজকের পত্রিকাকে বলেন, মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বিচারকের সংখ্যা বাড়ানোই একমাত্র সমাধান নয়। তবে বর্তমান সংখ্যাও অপ্রতুল। অবশ্যই দক্ষ বিচারকের সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে।

আইন কমিশন এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ২০১৫ সালে করা সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অধস্তন আদালতের জন্য বিচারকের সংখ্যা ৫ হাজারে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছিল; তবে তা বাস্তবায়িত হয়নি ১১ বছরেও। যদিও অন্যান্য দেশের তুলনায় এই সংখ্যাও অপ্রতুল। তাই মামলাজটের কথা বিবেচনায় নিয়ে অধস্তন আদালতে বিচারকের সংখ্যা অন্তত ১০ হাজার হওয়া উচিত বলে মনে করেন আইনজীবী ও বিচারকেরা।

জানতে চাইলে অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহজাহান সাজু আজকের পত্রিকাকে বলেন, বর্তমানে মামলার যে জট, তা নিষ্পত্তি করতে অধস্তন আদালতে অন্তত ১০ হাজার বিচারক প্রয়োজন। সেই সঙ্গে প্রয়োজন সহায়ক জনবল, প্রয়োজনীয় অফিস সরঞ্জাম এবং এজলাস। এ ছাড়া বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির দিকেও জোর দিতে হবে। তাহলেই মামলাজট কমবে বলে মনে করেন তিনি।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিচার বিভাগের নানা সংস্কার নিয়ে প্রস্তাব দিয়েছিল বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। ২০২৪ সালে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনকে দেওয়া ওই প্রস্তাবে বলা হয়, জনসংখ্যার হিসাবে প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে বিচারক একজন। ডেনমার্কে ১৫ হাজারের বিপরীতে ১ জন, জাপানে ৫৭ হাজারের জন্য ১ জন, পাকিস্তানে ৫০ হাজারের জন্য ১ জন এবং ভারতে ৪৭ হাজারের বিপরীতে ১ জন বিচারক থাকার কথা উল্লেখ করা হয়।

জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, প্রায় ৪০০ বিচারককে নানা কারণে বিচারকাজের বাইরে থাকতে হয়। আর একজন বিচারকের বিপরীতে ৫০০ মামলা থাকলে সহজে নিষ্পত্তি করা যায়। বর্তমানে গড়ে ৩ হাজারের বেশি মামলা। এ কারণে ঠিকভাবে মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না।

মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, বিচারকের সংখ্যা ১০ হাজার হওয়া উচিত। শুধু বিচারক বাড়ালেই মামলাজট শিগগির কমবে না; এর সঙ্গে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির দিকে জোর দিতে হবে। প্রয়োজনে মামলার আগে প্রি-মেডিয়েশন করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

বিচারক সংকটের কারণে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও একজনকে অনেক মামলার বিচার নিষ্পত্তি করতে হয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারকেরা সিভিল আপিল, সিভিল রিভিশন, ক্রিমিনাল আপিল, ক্রিমিনাল রিভিশন, ক্রিমিনাল মিস, দুদক, আরবিট্রেশন, মাদক, বিশেষ ক্ষমতা আইন, অস্ত্র মামলা, হত্যা মামলা, সাধারণ দায়রা মামলা, মোবাইল কোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৫ ধারার অধীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেওয়া কার্যধারার বিরুদ্ধে রিভিশন আবেদনের নিষ্পত্তি করেন। অতিরিক্ত জেলা জজের পৃথক কোনো ক্ষমতা নেই। তাঁরা জেলা জজ পদমর্যাদার বিচারকের সমান ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। তবে তাঁদের দায়িত্ব জেলা জজ নির্ধারণ করে দেন।

যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারকেরা ২৫ লাখ টাকার ঊর্ধ্বে সব ধরনের দেওয়ানি মামলা, সিভিল আপিল, মাদক, ১০ বছর পর্যন্ত সাজার সব মামলা, বিশেষ আদালতে ১০ বছরের বেশি সাজার মামলা, এনআই অ্যাক্ট, অর্থঋণ, বিশেষ ক্ষমতা আইনসহ আরও কিছু মামলার শুনানি করেন। আর সিনিয়র সহকারী জজ ও সহকারী জজ আদালতের বিচারকেরা প্রায় ২৫ ধরনের মামলার শুনানি করেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সুপ্রিম কোর্টের স্পেশাল অফিসার মো. মাজহারুল হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, বর্তমানে অধস্তন আদালতে বিচারকের সংখ্যা দেশের জনসংখ্যা ও মামলার অনুপাতে অপর্যাপ্ত। এ কারণে একজন বিচারককে প্রতিদিন অনেক বেশি মামলা পরিচালনা ও নিষ্পত্তি করতে হয়। ফলে গুণগত মানসম্পন্ন বিচার নিশ্চিত করা প্রায়শই কঠিন হয়ে পড়ে।

মাজহারুল হক বলেন, সেই সঙ্গে বিচারসংশ্লিষ্ট কার্যাদি সম্পন্ন করার জন্য পর্যাপ্ত দক্ষ সহায়ক জনবল ও সরঞ্জামাদির প্রয়োজন রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী বিচারক, দক্ষ সহায়ক জনবল ও সরঞ্জামাদির সরবরাহ বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলে মামলা নিষ্পত্তির পরিমাণ আরও বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত