Ajker Patrika

এক্সপ্রেসওয়েতে দুর্ঘটনায় নিহত ৪

মা হারানো শিশু হোসাইনের চিকিৎসা আটকে আছে অর্থাভাবে

জয়নাল আবেদীন, ঢাকা
মা হারানো শিশু হোসাইনের চিকিৎসা আটকে আছে অর্থাভাবে
হাসপাতালের মেঝেতে চিকিৎসাধীন হোসাইন। ছবি: আজকের পত্রিকা

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বারান্দায় উৎকণ্ঠা নিয়ে বসে আছেন আব্দুল হক। হাসপাতালের মেঝেতে সংজ্ঞাহীন তাঁর সাত বছর বয়সী নাতি হোসাইন। ফরিদপুরের ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় হোসাইন হারিয়েছে তার মা, নানি ও দুই মামাকে। নিজেও গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। শোকাহত পরিবারটি এখন চিকিৎসা ব্যয়ের ভার বহন করতে হিমশিম খাচ্ছে।

স্বজনেরা জানান, দুর্ঘটনার পর থেকে হোসাইন প্রায় অচেতন অবস্থায় রয়েছে। মাঝে মাঝে চেতন ফিরলেও অসহ্য যন্ত্রণায় চিৎকার করে ওঠে। এখনো সে জানে না, তার মা আয়েশা খাতুন, নানি নূর জাহান বেগম এবং দুই মামা মো. আরিফ ইসলাম ও রাকিবুল ইসলাম আর বেঁচে নেই।

গত সোমবার রাতে মালয়েশিয়া থেকে ১১ বছর পর দেশে ফেরেন আরিফ ইসলাম। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যশোরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর ফরিদপুরের ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে তাঁদের বহনকারী প্রাইভেট কারটি সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রাকের পেছনে ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই একই পরিবারের চারজন নিহত হন। আহত হয় দুই শিশু—হোসাইন ও তার ছোট বোন তাসনিয়া। তাঁদের বাড়ি যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া ইউনিয়নের বালিয়াডাঙ্গা গ্রামে।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, তিন বছর বয়সী তাসনিয়া এখন শঙ্কামুক্ত থাকলেও হোসাইনের অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। মাথায় গুরুতর আঘাতের পাশাপাশি তার একটি পা ভেঙে গেছে এবং ডান চোখেও সমস্যা দেখা গেছে।

হোসাইনের দাদা আব্দুল হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমার নাতির অবস্থা খুব খারাপ। আমরা গরিব মানুষ। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে, কিন্তু আরও উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন। বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার সামর্থ্য আমাদের নেই। ছেলেটাকে বাঁচানোর জন্য সবার সহযোগিতা চাই।’

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, দুর্ঘটনার পর প্রথমে হোসাইনকে যশোরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে যশোর সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে ঢাকায় পাঠানোর কথা বলে। গত বুধবার রাতে তাকে ঢামেক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

শিশুটির বাবা ইলিয়াস বলেন, ‘আমি কৃষক ও দিনমজুর। একদিকে স্ত্রীকে হারিয়েছি, অন্যদিকে ছেলেকে বাঁচানোর লড়াই করছি। মেয়েটা শঙ্কামুক্ত হলেও ছেলের মাথায় গুরুতর আঘাত, পা ভেঙে গেছে এবং চোখের অবস্থাও ভালো নয়। টাকার অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতে পারছি না।’

ইলিয়াস আরও বলেন, ‘হাসপাতালে বেডও পাইনি। ভালো চিকিৎসা পেলে হয়তো আমার ছেলে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে পারত। এখন বিত্তবান ও সহৃদয় মানুষের সহযোগিতা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই।’

হাসপাতালে হোসাইনের পাশে রয়েছেন তার বড় চাচা আলতাফ হোসেন, আরেক চাচা আলমগীর হোসেন, দাদা ও কয়েকজন স্বজন। চিকিৎসা ও থাকা-খাওয়ার খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে শিশুর বড় চাচা আলতাফ হোসেন বলেন, ‘ও বেঁচে আছে, কিন্তু চোখ খুলছে না। প্রতিদিন শুধু ওর দিকে তাকিয়ে থাকি। আল্লাহ যেন আমাদের সন্তানটাকে ফিরিয়ে দেন। আমরা শ্রমিক মানুষ, চাষাবাদ করে সংসার চালাই। এখন সাহায্য ছাড়া কোনো উপায় নেই।’

শিশুটির আরেক চাচা আলমগীর হোসেন জানান, দুর্ঘটনার পর থেকে হোসাইন পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। তার ডান চোখের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। সময়মতো উন্নত চিকিৎসা না পেলে চোখটি নষ্ট হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবারের সদস্যরা।

একই দুর্ঘটনায় পরিবারের চার সদস্যকে হারানোর শোক এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি পরিবারটি। সেই শোকের মধ্যেই জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা হোসাইনকে ঘিরে এখন তাঁদের সব আশা-ভরসা। হোসাইনের চিকিৎসায় সমাজের বিত্তবান মানুষের সহায়তা কামনা করেছে তার পরিবার।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত