Ajker Patrika

কুমিল্লার হোমনা: বিদেশেও কদর শ্রীমদ্দি গ্রামের বাঁশের বাঁশির

দেলোয়ার হোসাইন আকাইদ, কুমিল্লা 
আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৮: ০৫
কুমিল্লার হোমনা: বিদেশেও কদর শ্রীমদ্দি গ্রামের বাঁশের বাঁশির
হোমনায় বাঁশির গ্রাম হিসেবে পরিচিত শ্রীমদ্দিতে বৈশাখ ঘিরে কর্মব্যস্ত কারিগরেরা। ছবিটি সম্প্রতি তোলা। আজকের পত্রিকা

বাংলা নববর্ষের উৎসব মানেই গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর প্রাণের টান। বৈশাখ এলেই মেলা, পান্তা-ইলিশ, নকশিকাঁথা আর লোকজ নানা উপাদানে মুখর হয়ে ওঠে দেশ। তবে এসবের ভিড়ে যে জিনিসটি আজও বাংলার লোকসংস্কৃতির চিরচেনা সুর হয়ে মানুষের হৃদয়ে বাজে, তা হলো বাঁশের বাঁশি। আর এই বাঁশি তৈরির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র কুমিল্লার হোমনা উপজেলার মেঘনা তীরঘেঁষা ছোট্ট গ্রাম শ্রীমদ্দি—যা স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘বাঁশির গ্রাম’ নামে।

বৈশাখকে সামনে রেখে এই গ্রামে এখন ব্যস্ততার শেষ নেই। পুরো শ্রীমদ্দিই যেন পরিণত হয়েছে এক জীবন্ত কারুশিল্পশালায়, যেখানে বাঁশ কাটার শব্দ, গরম লোহার টোকা আর রং-তুলির আঁচড়ে তৈরি হচ্ছে সুরের নানা রূপ। তবে শুধু বৈশাখ এলেই কদর বাড়ে গ্রামটির বাঁশির কারিগরদের। বছরের অন্য সময়ে চাহিদা কম থাকায় তাঁদের ফিরতে হয় নানা কাজে। এ নিয়ে আক্ষেপের কথা জানান কারিগরেরা। যদিও ঐতিহ্যবাহী এসব বাঁশি বর্তমানে ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে যাচ্ছে বলে জানান কারিগর ও বিসিক কর্মকর্তারা।

সম্প্রতি শ্রীমদ্দি গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ে এক অনন্য চিত্র। কোনো বাড়ির আঙিনায় বাঁশ শুকানো হচ্ছে, কোথাও গরম লোহা দিয়ে বাঁশে ছিদ্র করা হচ্ছে, আবার কোথাও নিপুণ হাতে বাঁশে রং-নকশা ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে। নারী-পুরুষ, তরুণ-প্রবীণ—সবাই মিলে গড়ে তুলেছেন এক পারিবারিক শিল্পের পরিবেশ।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় শতাধিক পরিবার এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে নানা সংকট ও প্রতিকূলতায় সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৫০-৭০টি পরিবারে।

শ্রীমদ্দির বাঁশি শিল্পের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম আবুল কাশেম।

মাত্র ৯ বছর বয়সে তিনি পরিবারের সঙ্গে বাঁশি তৈরির কাজে যুক্ত হন। সেই থেকে অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে তিনি এই শিল্পের সঙ্গে জীবন বেঁধে রেখেছেন।

আবুল কাশেম বলেন, ‘বাঁশিই আমাদের জীবন, আমাদের পরিচয়। এই কাজ না থাকলে আমরা হারিয়ে যেতাম। তাঁর তৈরি বাঁশি এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও পৌঁছে যাচ্ছে।’ মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে এই বাঁশির কদর রয়েছে বলে জানান তিনি।

কারিগর যতীন্দ্র চন্দ্র বিশ্বাস জানান, ‘বৈশাখের আগে থেকে অর্ডার আসতে শুরু করে। এ সময় দিন-রাত এক করে কাজ করতে হয়। এটি আমাদের প্রধান আয়ের সময়।’

শ্রীমদ্দিতে সাধারণত ১৪ থেকে ১৬ ধরনের বাঁশি তৈরি করা হয়। এর মধ্যে মোহন বাঁশি, নাগিনী বাঁশি, মুখ বাঁশি ও আড় বাঁশি বেশি পরিচিত।

প্রবীণ কারিগর সিরাজুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পুঁজির অভাবে অনেকে এ পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন। ফলে ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে দক্ষ কারিগরের সংখ্যা, যা ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

কুমিল্লার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মীর মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘কুমিল্লার শ্রীমদ্দির বাঁশি কেবল একটি পণ্য নয়—এটি গ্রামীণ ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার প্রতিচ্ছবি।’

হোমনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘শ্রীমদ্দির বাঁশিশিল্প সম্পর্কে আমরা অবগত। এই ঐতিহ্য সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বৈশাখী মেলায় কারিগরদের জন্য স্টল বরাদ্দসহ সহায়তার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।’

কুমিল্লা বিসিক শিল্পনগরীর উপমহাব্যবস্থাপক মো. মুনতাসির মামুন বলেন, শ্রীমদ্দির বাঁশি বর্তমানে ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে যাচ্ছে। সরকার এই শিল্পের উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে কাজ করছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত