Ajker Patrika

মায়ের নিথর দেহ জড়িয়ে শিশু

ঘুম যে আর ভাঙবে না, জানে না শিশু রিজান

পটিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
ঘুম যে আর ভাঙবে না, জানে না শিশু রিজান
নিথর দেহ জড়িয়ে মায়ের ঘুম ভাঙানোর চেষ্টায় ছোট্ট রিজান। ছবি: সংগৃহীত

ছয় বছরের ছোট্ট রিজান বড়ুয়া এখনো বিশ্বাস করে—তার মা ঘুমিয়ে আছেন। সবার মুখে সে শুনেছে—‘মা ঘুমাচ্ছেন’। তাই মায়ের নিথর দেহের পাশে দাঁড়িয়ে সে বারবার তাকিয়ে থাকে, যেন একটু পরেই মা জেগে উঠে তাকে বুকে জড়িয়ে নেবেন। কিন্তু এই ঘুম যে আর কোনো দিন ভাঙবে না, তা বোঝার মতো বয়স এখনো তার হয়নি।

মায়ের নিথর দেহের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রিজানের সেই নিষ্পাপ দৃষ্টির একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তেই অসংখ্য মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায় ছবিটি। শুধু মাকেই নয়, রিজান হারিয়েছে তার অনাগত ভাই বা বোনকেও। এক মাস পর যার পৃথিবীর আলো দেখার কথা ছিল। হৃদয়বিদারক এ ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের তেকোটা বড়ুয়াপাড়া গ্রামে।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর করপোরাল জনি বড়ুয়ার আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী রিমা বড়ুয়া নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে গত শুক্রবার স্বামীর সঙ্গে পটিয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে যান। সেখানে হঠাৎ খিঁচুনি শুরু হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। চিকিৎসকেরা তাঁর গর্ভের সন্তানকেও বাঁচাতে পারেননি। পরদিন শনিবার নিজ গ্রামে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী মা ও অনাগত সন্তানকে একসঙ্গে শেষবিদায় জানানো হয়।

সরেজমিনে জনি বড়ুয়ার বাড়িতে দেখা যায়, কয়েক দিন আগেও যে বাড়িতে নতুন অতিথিকে ঘিরে ছিল আনন্দ, স্বপ্ন আর প্রস্তুতি, সেখানে এখন শুধু নীরবতা আর শোকের ছায়া। পরিবারের সদস্যদের কারও মুখেই কোনো কথা নেই।

জনি বড়ুয়ার ছোট ভাই ফায়ার সার্ভিসের কর্মী অয়ন বড়ুয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, ২০১৮ সালে জনি ও রিমার বিয়ে হয়। এক বছর পর রিমার গর্ভে জন্ম নেয় রিজান। ২০২৩ সালে আরও এক সন্তান জন্মের আগেই মারা যায়। সেই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই এবার রিমা ও তাঁর গর্ভের সন্তানকে হারিয়ে পুরো পরিবার ভেঙে পড়েছে।

অয়ন বড়ুয়া বলেন, ‘ভাবি শুধু একজন গৃহিণী ছিলেন না, তিনি আমাদের পুরো পরিবারের অভিভাবক ছিলেন। সবাইকে আগলে রাখতেন। এখন ঘরের প্রতিটি কোণেই তাঁর শূন্যতা।’

বর্তমানে স্থানীয় একটি কিন্ডারগার্টেনের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী রিজান। মায়ের মৃত্যু কী, সে এখনো বুঝে উঠতে পারেনি। বারবার মায়ের খোঁজ করছে। পরিবারের সদস্যরা তাকে শুধু বলছেন—‘মা ঘুমিয়ে আছেন’।

রিজানের বাবা জনি বড়ুয়া বলেন, ‘হঠাৎ করেই সবকিছু শেষ হয়ে গেল। কীভাবে এই শোক সামলাব, জানি না। এখন শুধু ছেলেকে নিয়েই সময় কাটানোর চেষ্টা করছি।’

রিজানের মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অসংখ্য মানুষ শোক প্রকাশ করেছেন। অনেকেই শিশুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। একটি ছবিই যেন তুলে ধরেছে এক শিশুর সরল অপেক্ষা, এক বাবার অসহনীয় শোক ও একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতির গল্প।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত