Ajker Patrika

আদালতে মামলা: ঋণ শোধে কিডনি বিক্রি, পেলেন ৫০ হাজার টাকা

  • ভুক্তভোগী গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার দিনমজুর মন্টু মিয়া।
  • কিডনির বিনিময়ে ১০ লাখ টাকা পাওয়ার কথা। নেওয়া হয়েছিল নেপালে।
  • নেপালে কিডনি নেওয়ার পর দেশে ফিরে পাল্টে যায় দালালদের সুর।
  • মন্টু মিয়ার কিডনি গেছে, শারীরিক সক্ষমতাও গেছে, কমেনি ঋণ।
মো. আতাউর রহমান, জয়পুরহাট 
আদালতে মামলা: ঋণ শোধে কিডনি বিক্রি, পেলেন ৫০ হাজার টাকা
প্রতীকী ছবি

ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পেরে কিডনি বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার দিনমজুর মন্টু মিয়া। কিডনির দাম ঠিক হয়েছিল ১০ লাখ টাকা। তাঁর কাছ থেকে কিডনি নেওয়া হয়েছে। তবে বিনিময়ে পেয়েছেন ৫০ হাজার টাকা। মন্টু মিয়া বললেন, ‘দালালেরা মোটে ৫০ হাজার টাকা হাতে দিয়ে আমার শরীরের অঙ্গ কেটে নিয়ে নেপাল থেকে দেশে ফিরিয়ে এনে কেটে পড়ল। এখন আমি না পারি খাটতে, না পারি পরিবারটাকে খাওয়াতে। আমার শরীরের অঙ্গও গেল, অভাবও মিটল না; আমি এখন পঙ্গু হয়ে বেঁচে আছি।’

জয়পুরহাট আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন এই নিঃস্ব ভুক্তভোগী। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, সংসারের অনটন মেটাতে স্থানীয় একাধিক এনজিও এবং মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। দিন এনে দিন খাওয়া দিনমজুর মন্টু মিয়ার পক্ষে সময়মতো কিস্তির টাকা শোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ঋণের পাওনাদারদের চাপ এবং চরম আর্থিক সংকটে যখন তিনি দিশেহারা, ঠিক তখনই তাঁর ওপর নজর পড়ে স্থানীয় একটি সংঘবদ্ধ অঙ্গ পাচারকারী দালাল চক্রের। মন্টু মিয়াকে জানানো হয়, ঢাকার এক ধনাঢ্য নারী কিডনি জটিলতায় ভুগছেন। একটি কিডনি দিলেই আসবে নগদ ১০ লাখ টাকা। ঋণের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে বাধ্য হয়ে দালালদের প্রস্তাবে রাজি হন মন্টু মিয়া।

এরপর দ্রুততম সময়ে মন্টু মিয়ার পাসপোর্ট তৈরি করা হয়। গত জানুয়ারি মাসের শুরুতে অগ্রিম বাবদ ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয় তাঁর হাতে। এরপর তাঁকে প্রথমে ভারতে এবং পরবর্তীকালে নেপালে নিয়ে যাওয়া হয়। নেপালের একটি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর শরীর থেকে একটি কিডনি নেওয়া হয়।

অস্ত্রোপচারের পর মন্টু মিয়াকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তবে দেশে ফেরার পর প্রতিশ্রুত বাকি ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা চাইতে গেলেই বদলে যায় দালাল চক্রের চেহারা। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের কাছে ধরনা দিয়েও কোনো লাভ হয়নি; অভিযুক্ত ব্যক্তিরা উল্টো টাকা লেনদেনের পুরো বিষয়টিই অস্বীকার করেন এবং তাঁকে নানাভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন।

একটি কিডনি হারানোর পর মন্টু মিয়া এখন মারাত্মক শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। সামান্য পরিশ্রমের কাজ করতে গেলেই তিনি হাঁপিয়ে ওঠেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি এখন কর্মক্ষমতা হারিয়ে বিছানায় পড়ে থাকায় পুরো পরিবার চরম অনিশ্চয়তায়।

এই প্রতারণার পর ১৩ জুন জয়পুরহাটের আমলি আদালত-৫-এ মন্টু মিয়া বাদী হয়ে ৬ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৩-৪ জনকে আসামি করে একটি সিআর মামলা করেন। পরবর্তীকালে আদালতের নির্দেশে পরদিন ১৪ জুন কালাই থানায় মামলাটি এফআইআর (মামলা নং-১৪) হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। মামলার আসামিরা হলেন বগুড়া সদর উপজেলার নিশিন্দারা (খাঁপাড়া) গ্রামের সাব্বির আহমেদ, শিবগঞ্জ উপজেলার কিচক মল্লিকপাড়া গ্রামের সুমন আলী, জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার উদয়পুর ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রামের আব্দুল মান্নান ও সাইদুর রহমান, উদয়পুর ইউনিয়নের লওনা (বহুতি) গ্রামের আব্দুস ছাত্তার এবং নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার ছোট হোসেনপুর রাজাগঞ্জ এলাকার তারেক আজম ওরফে বাবলু চৌধুরী।

কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আদালতের নির্দেশে মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইনের আওতায় মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়েছে। এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুতর অপরাধ। অপরাধীদের চিহ্নিত করতে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহে পুলিশ আন্তরিকভাবে কাজ করছে।’

জয়পুরহাট জেলা জজ আদালতের আইনজীবী মো. উজ্জ্বল হোসেন বলেন, ‘মানুষের অসহায়ত্ব ও দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে অঙ্গ পাচার জঘন্য অপরাধের শামিল। অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে এমন মানবিক বিপর্যয় ঠেকানো কঠিন হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত