Ajker Patrika

চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি ইজারা: সংকট কাটছে না বন্দরের

  • বন্দরের ইতিহাসে এবারই প্রথম জাহাজ চলাচলও পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
  • নৌপরিবহন উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর শ্রমিক আন্দোলন দুই দিনের জন্য স্থগিত।
  • আগামীকালের মধ্যে দাবি পুরোপুরি না মানলে রোববার থেকে আবার কর্মবিরতি।
  • শ্রমিকদের কর্মবিরতিতে ৫৪ হাজারের বেশি পণ্যবাহী কনটেইনার আটকে পড়েছে।
 আবু বকর ছিদ্দিক, চট্টগ্রামওমর ফারুক, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি ইজারা: সংকট কাটছে না বন্দরের
বিদেশি সংস্থাকে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার ঘটনার প্রতিবাদে কর্মবিরতিতে ছিলেন শ্রমিকেরা। তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন সেখানে গেলে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। গতকাল চট্টগ্রাম বন্দরে। ছবি: হেলাল শিকদার

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি সংস্থা ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দেওয়ার সরকারি উদ্যোগকে কেন্দ্র করে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর কয়েক সপ্তাহ ধরে গভীর সংকটে পড়েছে। আইনি জটিলতা, শ্রমিক আন্দোলন এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপের ক্ষোভে বন্দরের কার্যক্রম অচল হয়ে পড়ায় ব্যবসায়ীরা কোটি কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

শ্রমিকদের লাগাতার কর্মবিরতি ও জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে শীর্ষ ১০টি বাণিজ্য সংগঠনের নেতারা গতকাল বৃহস্পতিবার অচলাবস্থা নিরসনে দ্রুত সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ চান। একই সঙ্গে শ্রমিকদের কর্মসূচি থেকেও সরে আসার আহ্বান জানান তাঁরা। গতকাল বৈঠকের পর যৌথ বিবৃতি দেন এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন, বিসিআই, এমসিসিআই, ডিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ, বিটিটিএলএমইএ, বিজিএপিএমইএ এবং বিজিবিএর সভাপতিরা।

ব্যবসায়ীদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে এবারই প্রথম জাহাজ চলাচল পর্যন্ত পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে ৫৪ হাজারের বেশি পণ্যবাহী কনটেইনার আটকে পড়েছে।

এর মধ্যে গতকাল বিকেলে নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে শ্রমিকদের ১৪ সদস্যের প্রতিনিধিদলের বৈঠক হয়। আলোচনার পর উপদেষ্টার আশ্বাসে শ্রমিক আন্দোলন আজ শুক্র ও আগামীকাল শনিবার দুই দিনের জন্য স্থগিত করা হয়; কিন্তু সংকটের স্থায়ী সমাধান হয়নি। কাল শনিবারের মধ্যে দাবি পুরোপুরি না মানলে রোববার থেকে আবার কর্মবিরতিতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি রয়েছে শ্রমিকদের।

দিনভর উত্তেজনা: গতকাল সকালে চট্টগ্রাম বন্দর ভবনে নৌপরিবহন উপদেষ্টা বন্দর ব্যবহারকারী বিভিন্ন সংগঠনের নেতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তবে ওই বৈঠকে আন্দোলনকারী শ্রমিকনেতাদের রাখা হয়নি। পরে উপদেষ্টা পতেঙ্গার বোট ক্লাবে শ্রমিকদের সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তাব দিলে তা প্রত্যাখ্যান করেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের বক্তব্য ছিল, বন্দরসংক্রান্ত বিষয়ে বৈঠক বন্দর ভবনেই হতে হবে। শেষ পর্যন্ত বিকেলে বন্দর ভবনে বৈঠকের আয়োজন করা হয়।

বন্দর সূত্রে জানা গেছে, নৌপরিবহন উপদেষ্টা বন্দরে আসবেন—এমন খবরে সকাল থেকেই আন্দোলনরত শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শত শত শ্রমিক বন্দর ভবনের অদূরে ৪ নম্বর জেটি গেট থেকে কাস্টমস মোড়সহ আশপাশের এলাকায় অবস্থান নেন। পুলিশ, অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বন্দরের নিরাপত্তাকর্মীরা বাড়তি সতর্ক অবস্থান নেয়।

বৈঠকে যোগ দিতে বন্দর ভবনে প্রবেশের সময় শ্রমিক-কর্মচারীদের বাধার মুখে পড়ে প্রায় ১৫ মিনিট অবরুদ্ধ থাকেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা। পরে পুলিশ নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি করে তাঁর গাড়িবহর ভবনের ভেতরে প্রবেশ করায়।

এ সময় শতাধিক শ্রমিক স্লোগান দিতে দিতে ভেতরে ঢুকে পড়েন। পরে অবশ্য বৈঠক হয়।

উপদেষ্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, শুক্রবার থেকে বন্দর সচল রাখা হবে। কেউ বাধা দিলে সরকার হার্ডলাইনে যাবে।

তবে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. ইব্রাহিম খোকন জানান, শনিবারের মধ্যে এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া থেকে সরে আসার বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া না এলে রোববার থেকে আবার লাগাতার কর্মবিরতি শুরু হবে।

এদিকে কর্মবিরতি দুই দিনের জন্য স্থগিতের পর বন্দরে কাজ শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) সেক্রেটারি জেনারেল রুহুল আমিন সিকদার বলেন, গতকাল বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে বন্দরের কার্যক্রম আবার স্বাভাবিক হয়েছে। ডিপো থেকে কনটেইনারবাহী গাড়ি বন্দরে প্রবেশ করছে এবং বন্দর থেকে কনটেইনারবাহী গাড়ি বের হচ্ছে।

কর্মবিরতি শুরু ও বন্দরের অচলাবস্থা

ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত করার চেষ্টা শুরু হওয়ামাত্রই শ্রমিক-কর্মচারীরা প্রতিবাদ শুরু করেন। গত ৩১ জানুয়ারি থেকে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে টানা কর্মবিরতি শুরু হয়। প্রথম তিন দিন ৮ ঘণ্টার নির্দিষ্ট কর্মবিরতি, তবে ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে তা অনির্দিষ্টকালের লাগাতার আন্দোলনে রূপ নেয়।

এ সময় বন্দরের কার্যক্রম প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল, সিসিটি এবং জেনারেল কার্গো বার্থে কনটেইনার ও পণ্য ওঠানো-নামানো বন্ধ থাকে। ৪ ফেব্রুয়ারি আন্দোলনের চতুর্থ দিনে জাহাজ আনা-নেওয়ার কার্যক্রমও বন্ধ হয়। ডক অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ায় পাইলট ও টাগবোট পরিচালনা বন্ধ, ফলে বন্দরে জাহাজজট সৃষ্টি হয়।

চলমান আন্দোলনের মধ্যে বন্দরের প্রশাসন আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে শুরু করে। ১ ফেব্রুয়ারি আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অভিযোগে সাত কর্মচারীকে ঢাকার কেরানীগঞ্জের পানগাঁও নৌ টার্মিনাল ও কমলাপুর কনটেইনার ডিপোতে বদলি করা হয়। এর আগের দিনসহ দুই দিনে মোট ১১ কর্মচারীকে বদলি করা হয়।

বন্দর কর্তৃপক্ষ বলেছে, বদলির সিদ্ধান্ত জরুরি দাপ্তরিক ও অপারেশনাল প্রয়োজনের কারণে নেওয়া হয়েছে। তবে শ্রমিকনেতারা একে আন্দোলন দমন ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের কৌশল হিসেবে দেখছেন। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আন্দোলন করার কারণে একের পর এক কর্মচারীকে বদলি করা হচ্ছে। এটি পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করছে।’

বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে প্রভাব

শ্রমিক আন্দোলনের কারণে প্রতিদিন গড়ে ৫ হাজার পণ্যভর্তি কনটেইনার খালাস হওয়া বন্ধ হয়ে যায়। জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানামা বন্ধ ছিল, নতুন কোনো জাহাজ নোঙর করতে পারেনি। বন্দর জেটিতে জাহাজ দাঁড়িয়ে থাকলেও পাইলট ও টাগবোট পরিচালনা বন্ধ থাকায় চলাচল পুরোপুরি স্থবির ছিল। এতে শুধু পণ্য সরবরাহই ব্যাহত হয়নি, ব্যবসায়ীদের কয়েক হাজার কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

বন্দরের তথ্যমতে, ডিপোতে রপ্তানি কনটেইনারের সংখ্যা গত দুই দিনে বেড়ে ১১ হাজার ৫০, বন্দর জেটিতে কনটেইনার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৯০০টিতে। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৮০০ রপ্তানি কনটেইনার বন্দরে যায় এবং ১২০০ আমদানি আসে। কর্মবিরতিতে তা ছিল যথাক্রমে মাত্র ২০৫ এবং ৭০, অর্থাৎ কমেছে ৯০ শতাংশের বেশি।

বন্দর সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দর ২০২৫ সালে ৫ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা আয় করেছে, অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১৫ কোটি টাকা। পাঁচ দিন ধরে চলমান ধর্মঘটের কারণে বন্দর রাজস্ব ৭০ শতাংশ কমে গেছে। বিদেশি বায়ারের কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালনকারী ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার ও ডিপোর কার্যক্রমও যথাক্রমে ৭০-৯০ শতাংশ কমেছে। শিপিং এজেন্টদেরও সার্বিক কার্যক্রম কমেছে ৮০ শতাংশ। বন্দর ব্যবহারকারী ২০টির বেশি প্রতিষ্ঠান অচলাবস্থার কারণে অপূরণীয় ক্ষতির মুখে।

চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার ওঠানো-নামানোর কাজে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে একরাম চৌধুরী বলেন, গত ১৯ বছরে বন্দর এক দিনের জন্যও বন্ধ হয়নি। নির্বাচন ও রমজানের আগে এমন ধর্মঘট নজিরবিহীন।

বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি এম এ সালাম বলেন, ফেব্রুয়ারিতে পোশাক খাতে কাজের দিন মাত্র ১৮। রমজানে পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হলে অপূরণীয় ক্ষতি হবে।

চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানান, চুক্তির প্রক্রিয়া সরকারের পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) নির্দেশিকা অনুযায়ী চলছে। এখন পর্যন্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। তিনি বলেন, চুক্তি সই হওয়ার আগে কর্মবিরতি শুরু করা অনাকাঙ্ক্ষিত এবং বন্দরের কার্যক্রমে এর প্রভাব ফেলছে।

আইনি পদক্ষেপ

এদিকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরামের পক্ষ থেকে রিট আবেদন করা হয়। সেই রিট খারিজের পর স্থিতাবস্থা চেয়ে আবেদন এবং পরে সুপ্রিম কোর্টে লিভ টু আপিল পর্যন্ত গড়ায়। মামলাটি ৯ ফেব্রুয়ারি প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে ফুল বেঞ্চে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। এ বিষয়ে আইনজীবী ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন বলেন, ফুল বেঞ্চের শুনানি না হওয়া পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করা সম্ভব নয়।

নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ২০০৭ সালে নির্মিত হয়। বন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের প্রায় ৯৭ শতাংশ এই টার্মিনাল, চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) এবং জেনারেল কার্গো বার্থের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বর্তমানে নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড (সিডিএল) টার্মিনাল পরিচালনা করছে। তবে আগের সরকারের আমলে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের আওতায় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ১৫ বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়, যা অন্তর্বর্তী সরকার এগিয়ে নিচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক নিয়ে যা বলল সেনাবাহিনী

আগুন দিয়েছে মামুন, কাঠ দিয়েছে জুয়েল: মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক এসআই মালেক

কোরিয়ান ড্রামা না বাবার দুই কোটির ঋণ, তিন বোনের মৃত্যুর নেপথ্যে কী

আশুলিয়ায় ছয় লাশ পোড়ানো ও হত্যা মামলা: সাবেক এমপি সাইফুলসহ ৬ জনের মৃত্যুদণ্ড

মিরপুরে বাসা থেকে দুই সন্তানসহ বাবা-মায়ের মরদেহ উদ্ধার

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত