Ajker Patrika

গোপনে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রীর বাল্যবিবাহ, তিন দিন ধরে স্বামীর সংসারে

­­ জসিম উদ্দিন, নীলফামারী
আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ২২: ৪১
গোপনে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রীর বাল্যবিবাহ, তিন দিন ধরে স্বামীর সংসারে
প্রতীকী ছবি

প্রশাসনকে আগেই জানানো হয়েছিল বাল্য বিয়ের খবর। কিন্তু সেই খবর দেওয়ার পরও নীলফামারীর সৈয়দপুরে থামানো যায়নি চতুর্থ শ্রেণির এক শিশুশিক্ষার্থীর বিয়ে। মাত্র ১৩ বছর বয়সেই কাজীর মাধ্যমে কাবিন এবং দুই বাড়িতেই ঘটা করে সম্পন্ন হয়েছে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা। বিয়ের পর তিন দিন ধরে স্বামীর সংসারও করছে ওই শিশু। অথচ বাল্য বিয়ে সম্পন্ন হলেও বিদ্যালয়ের শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি কিংবা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

জানা যায়, সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়নের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াশোনা করে ওই শিশু। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার সে বিদ্যালয়ে গিয়েছিল। তার পরদিনই তাকে বিয়ে দেওয়া হয়েছে। বরের বাড়ি উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়নের একটি গ্রামে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এলাকার লোকজন এই বাল্য বিয়ে বন্ধের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। পরে সৈয়দপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাব্বির হোসেনকে খবর দেন। তিনি ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সচিব) মোখছেদুল ইসলামকে ওই বিয়ে বন্ধের নির্দেশ দেন। সচিব মোখছেদুল গ্রাম পুলিশ ও ওই ওয়ার্ডের ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যকে পাঠান শিশুটির নানির বাড়ি। কিন্তু তাঁরা সেখান থেকে ঘুরে আসার পর রাতে শিশুটিকে তার নানির বড় বোনের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানেই বিয়ের কাবিন সম্পন্ন করা হয়। বিয়ের কার্যক্রম সম্পন্ন করেন কামারপুকুর ইউনিয়নের নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার মাওলানা মোতাসিম বিল্লাহ।

ওই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজ রোববার দুপুরে আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমার প্রতিষ্ঠানের কোনো ছাত্রীর বিয়ে হয়েছে এ বিষয়ে আমার কিছুই জানা নেই।’ পরে পিয়ন ও চতুর্থ শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থীর মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে তিনি বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে আর আমাদের কিছুই করার নেই। তবে মেয়েটির অভিভাবকদের ডেকে কেন বিয়ে দিল তা জানার চেষ্টা করব এবং প্রয়োজন হলে আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাব।’ এ সময় তিনি ওই শিশুর ভর্তির তথ্য নিবন্ধন দেখে জানান, শিশুটির জন্ম ২০১৩ সালের ২২ জুলাই। সে অনুযায়ী তার বর্তমান বয়স ১৩ বছর ১ মাস ৬ দিন।

ঘটনার সত্যতা উদ্‌ঘাটনে বরের বাড়ি উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়নে গেলে বর ও কনেকে কৌশলে সরিয়ে ফেলা হয়। পরে শিশুটির বড় নানি ও বরের মা বিয়ের ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বর ও কনেকে ডাকেন। এ সময় বাল্য বিয়ের শিকার শিশুটি সংবাদকর্মীদের বলে, ‘আমার বিয়ে হয়েছে। আমি এখন স্বামীর সংসার করব। স্কুলে আর যাওয়া হবে না।’

এরপর কামারপুকুর ইউনিয়নের নিকাহ রেজিস্ট্রার কার্যালয় আয়শা হোমিও হলে কাজী মাওলানা মোতাসিম বিল্লাহর সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘মূলত ছেলে ও মেয়ের আত্মীয়স্বজনের চাপেই বিয়েটা হয়েছে। তবে এটা আমার ভুল হয়েছে। ভবিষ্যতে আর এমন কাজ করব না। তবে এ বিয়ের কাবিন আমি না করলেও অন্য কেউ করত। কেন না, অহরহ বাল্য বিয়ে হচ্ছে।’

উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মরিয়ম নেছা বলেন, ‘আমি আর কী করব। কর্তৃপক্ষকে ঝরে পড়ার রিপোর্ট জানাব। আমি আর এ ব্যাপারে কোনো খোঁজ খবর নেওয়ার প্রয়োজন মনে করছি না।’

এ বিষয়ে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নুরুন্নাহার শাহাজাদী বলেন, ‘আমরা বাল্য বিয়ে নিয়ে আমাদের মত করে কাজ করছি। স্কুলেও এ ধরনের সেমিনার করেছি। বাল্য বিয়ের খবর পেলে প্রশাসনের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। যেহেতু বিয়ে হয়েই গেছে সে ক্ষেত্রে আমাদের আর কিছুই করার নেই। তবে এ ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ দিলে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নিব।’

উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মরিয়ম নেছা বলেন, ‘বিষয়টি আমি অবগত নই। ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক আমাকে শিশুটির বাল্যবিয়ের বিষয়টি জানাননি।’

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাব্বির হোসেন বলেন, ‘এ বিষয়ে খবর পেয়ে গ্রাম পুলিশ ও ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যকে পাঠিয়েছিলাম। তাঁরা জানিয়েছিলেন সেখানে বিয়ের কোনো আয়োজন নেই, বাড়িতে তালা। কিন্তু পরে যদি বিয়ে হয়ে থাকে তাহলে আমাদের আর কী করার আছে। এখন এ ঘটনায় নিয়মিত মামলা করলে পুলিশ প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত