Ajker Patrika

৩ বছরের অপেক্ষার অবসান: আসছে ৮ ডিজিটাল ব্যাংক

  • ২য় দফায় ১২ আবেদনের মধ্যে ৮টি বাছাই।
  • আগামী পর্ষদ সভায় লাইসেন্স অনুমোদন।
  • শাখা-উপশাখা ছাড়াই মিলবে ব্যাংকিং সেবা।
  • ৩০০ কোটি টাকা মূলধন বাধ্যতামূলক।
  • প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তায় বাড়তি জোর।

মৃত্তিকা সাহা, ঢাকা
৩ বছরের অপেক্ষার অবসান: আসছে ৮ ডিজিটাল ব্যাংক
প্রতীকী ছবি

তিন বছরের বেশি অপেক্ষার পর দেশে ডিজিটাল ব্যাংক চালুর পথ খুলছে। দ্বিতীয় দফায় আবেদন করা ১২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮টিকে চূড়ান্তভাবে বাছাই করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী পর্ষদ সভায় এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

প্রচলিত ব্যাংকের মতো এসব ডিজিটাল ব্যাংকের কোনো শাখা, উপশাখা বা নিজস্ব এটিএম থাকবে না। অ্যাপ ও মোবাইল ফোনেই হিসাব খোলা, টাকা জমা, লেনদেন ও ঋণের আবেদন করা যাবে। থাকবে ভার্চুয়াল কার্ড, কিউআর কোডসহ নানা প্রযুক্তিনির্ভর সেবা। কম খরচে দ্রুত ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলের মানুষ, তরুণ উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকে সেবার আওতায় আনাই এর লক্ষ্য।

ডিজিটাল ব্যাংক চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ২০২৩ সালে। দীর্ঘ যাচাই-বাছাই, নীতিমালা পরিবর্তন ও লাইসেন্স নিয়ে নানা জটিলতার পর এবার দ্বিতীয় দফার আবেদন থেকে আটটি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের মূলধন, উদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, সাইবার নিরাপত্তা এবং নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণের বিষয়গুলো যাচাই করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান আজকের পত্রিকাকে বলেন, দ্বিতীয় দফায় জমা পড়া আবেদনগুলোর মধ্যে ৮টি প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আগামী পর্ষদ সভায় বিষয়টি উঠবে এবং চূড়ান্ত লাইসেন্সের অনুমোদন দেওয়া হবে।

তিন বছরে বদলেছে নীতিমালা

২০২৩ সালের ১৪ জুন ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনের নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন একটি ডিজিটাল ব্যাংকের ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ছিল ১২৫ কোটি টাকা। প্রথম দফায় ৫২টি আবেদন জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে ৯টি প্রস্তাব পর্ষদে উপস্থাপন করা হয় এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে আগ্রহপত্র দেওয়া হয়।

এর মধ্যে নগদ ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসিকে ২০২৪ সালের জুনে চূড়ান্ত লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নগদকে ঘিরে আর্থিক অনিয়ম ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ ওঠে। পরে সেই লাইসেন্স স্থগিত করা হয়। এতে প্রথম দফার উদ্যোগ কার্যত থেমে যায়।

পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট নীতিমালায় বড় পরিবর্তন আনে বাংলাদেশ ব্যাংক। ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ১২৫ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হয় ৩০০ কোটি টাকা। ২৬ আগস্ট দ্বিতীয় দফায় নতুন করে আবেদন আহ্বান করা হলে ১২টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করে।

এ পর্যায়ে বিকাশকে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। বিএনপি সরকার নির্বাচিত হওয়ার পর নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের এক দিন আগে সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর জরুরি পর্ষদ সভা ডাকার উদ্যোগ নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সভা স্থগিতের দাবি জানিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের নেতারা।

নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর ডিজিটাল ব্যাংকের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার কথা জানান। এরপর দ্বিতীয় দফার আবেদনগুলোর মূল্যায়ন শেষ করার কাজ এগিয়ে নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

কারা আসতে চায়

এই নতুন ব্যাংকিং ব্যবস্থায় শুধু দেশের প্রচলিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী নয়, মোবাইল আর্থিক সেবা, টেলিকম, ক্ষুদ্রঋণ ও প্রযুক্তি খাতের দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারাও অংশ নিতে চাইছেন। এ লক্ষ্যে দ্বিতীয় দফার আবেদনকারীদের মধ্যে রয়েছে রবি আজিয়াটার ‘বুস্ট’, বাংলালিংক ও স্কয়ারের যৌথ উদ্যোগ ‘নোভা ডিজিটাল ব্যাংক’, আকিজ রিসোর্সের ‘মুনাফা ইসলামী ডিজিটাল ব্যাংক’, আশার ‘মৈত্রী ডিজিটাল ব্যাংক’, ‘আমার ডিজিটাল ব্যাংক-২২’, ‘৩৬ ডিজিটাল ব্যাংক’, ব্রিটিশ-বাংলা ডিজিটাল ব্যাংক, ভুটানের ডিকে ব্যাংকের ডিজিটাল ব্যাংকিং অব ভুটান, অ্যাপ ব্যাংক, জাপান বাংলা ডিজিটাল ব্যাংক, উপকারী ডিজিটাল ব্যাংক ও বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোন আটটিকে বাছাই করে চূড়ান্ত লাইসেন্সের জন্য আগামী পর্ষদ সভায় তোলা হচ্ছে, তা জানাতে রাজি হননি সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কোনো সূত্র।

অভিজ্ঞ ব্যাংকার ও ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরফান আলী বলেন, ডিজিটাল ব্যাংক চালু হলে কম খরচে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তরুণ প্রজন্মকে আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি আর্থিক অন্তর্ভুক্তিও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে নতুন প্রতিযোগিতার কারণে প্রচলিত ব্যাংকগুলো প্রযুক্তি গ্রহণ ও ব্যবসায়িক মডেল আধুনিক করতে উৎসাহিত হবে।

তবে তাঁর মতে, এই ব্যাংকগুলোর সামনে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তায় বড় বিনিয়োগ দরকার হবে। তরুণ গ্রাহকদের বড় আমানত না থাকায় শুরুতে তহবিল সংগ্রহ কঠিন হতে পারে। তথ্য নিরাপত্তা, গ্রাহকের সচেতনতার ঘাটতি এবং দেশের অপরিণত ডিজিটাল অবকাঠামোও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত