Ajker Patrika

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি: একের পর এক দখলবাজি

  • রাজধানীতে তিন দিনের ব্যবধানে চারটি হামলা ও দখলের ঘটনা।
  • জড়িত থাকার অভিযোগ উঠছে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে।
  • বিব্রতকর মানলেও ঘটনাগুলো রভিসন্ধিমূলক হিসেবে দেখছে বিএনপি।
  • দখলদারি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সরব হয়েছে সরকারের বিরোধীরা।
আমানুর রহমান রনি, ঢাকা  ও রেজা করিম
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি: একের পর এক দখলবাজি
গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনাটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ছবি: সংগৃহীত

খোদ রাজধানীতে দু-তিন দিনের ব্যবধানে ঘটে গেছে কয়েকটি দখলবাজি ও দখলচেষ্টার ঘটনা। এসব ঘটনায় ঘুরে-ফিরে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নেতা- কর্মীদের নাম আসছে। এতে ক্ষমতায় আসার সাত মাসের মাথায় বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে দলটিকে।

এই পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের বিরুদ্ধে দখলদারি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে সরব হয়েছে তাদের রাজনৈতিক বিরোধীরা। সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘কর্তৃত্বশালীরা নিজেদের চাঁদাবাজদের কি সামলাবেন? একের পর এক ঘটনা ঘটেই চলেছে।’

আরেক বিরোধী দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, খোদ রাজধানীর বুকে চর দখলের মতো একটি হাসপাতাল গুঁড়িয়ে দিয়ে দখল করে নেওয়ার ঘটনায় দেশে আদৌ কোনো সরকারের অস্তিত্ব আছে কি না, তা নিয়েই জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বলে মনে করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেছেন, ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের একাংশের এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগ ও সদিচ্ছাকে ম্লান করছে।

তবে এসব ঘটনা বিব্রতকর মানলেও বিষয়টিকে দুরভিসন্ধি হিসেবে দেখছে বিএনপি। দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বিএনপিকে জড়িয়ে মিথ্যা প্রচারের অভিযোগ তুলে বলেছেন, ‘দুটি ঘটনাতেই (মিরপুরে স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা) বিএনপি ক্ষুব্ধ ও বিব্রত। তবে এসব ঘটনার সঙ্গে বিএনপি জড়িত নয়। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণের আগে বিএনপিকে দায়ী করা দুরভিসন্ধিমূলক।’

রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে। হামলা-কারীরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের একটি পাকা ভবন ও তিনটি আধা পাকা স্থাপনা ভাঙচুর করে। মেডিকেল সরঞ্জাম, এসি, ফ্যান, দরজা-জানালাসহ বিভিন্ন সামগ্রী খুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

এ ঘটনায় শাহ আলী থানায় মামলা করেছেন স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন। মামলায় ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য মো. হানিফ মিয়াকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাতনামা ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

স্থানীয় বিএনপি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, হামলায় জড়িত অন্য ব্যক্তিরাও হানিফ মিয়ার অনুসারী। স্থানীয়দের ভাষ্য, ঘটনার রাতে হানিফ মিয়ার নেতৃত্বে ভাঙচুর চালানো হয় এবং তাঁর লোকজন সেখানে অবস্থান করছিলেন। আশপাশে পাহারা দেওয়ার কাজে শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক এ কে আজাদ লেলিন, ঢাকা উত্তর মহানগর যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তফা জগলুল পাশা পাভেলের অনুসারী এবং দারুস সালাম থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক ইকবাল হোসেন দিপু, শাহ আলী থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাব্বির হোসেন সজীবসহ আরও কয়েকজন ছিলেন বলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এসব নেতার কেউ কেউ সাবেক এক এমপি প্রার্থীর সঙ্গে বিভিন্ন কর্মসূচিতেও অংশ নিতেন বলে জানা গেছে।

এ ঘটনায় হানিফ মিয়ার সঙ্গে ঢাকা উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির জড়িত থাকার অভিযোগও পাওয়া গেছে। স্থানীয় সূত্র বলছে, হানিফ তাঁর স্বামীর মামাতো ভাই। তবে ফেরদৌসী আহমেদ বলেন, ‘তিনি আমার মামাশ্বশুরের ছেলে। আমার নাম ব্যবহার করে এলাকায় প্রভাব খাটান কি না, জানি না।’

আর নিজের জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে ফেরদৌসী আহমেদ বলেছেন, হামলার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। তবে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জায়গাটি লিজ নেওয়ার জন্য তিনি আবেদন করেছিলেন।

মিরপুরের ঘটনার দুই দিন মধ্যে গত শনিবার সকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান হাউজিংয়ে জমি দখলের উদ্দেশ্যে ২০০-৩০০ লোকের একটি দল হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এই হামলায় নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মোহাম্মদপুর থানার ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক নুরুল ইসলাম, যুগ্ম সম্পাদক নান্নু এবং তাঁদের কর্মী নুর নবী দেওয়ান ও জামাল হোসেনের বিরুদ্ধে।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নুরুল ইসলাম। তাঁর দাবি, হামলা ও ভাঙচুরের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের নামধারী কিছু লোক এ ঘটনায় জড়িত থাকতে পারেন।

শনিবার সকালে মোহাম্মদপুরের ঘটনার পর ওই দিনই রাত সাড়ে ১০টার দিকে ক্যান্টনমেন্ট থানার ইসিবি চত্বরের দক্ষিণ মানিকদীর নিউগিনি প্রপার্টিজে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ’ স্টুডিওসহ আবাসন প্রকল্পের অফিস ও আশপাশের স্থাপনায় হামলা চালানো হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, ৩৫ কাঠা একটি জমির দখল-বেদখল নিয়ে মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও নিউগিনি প্রপার্টিজের মালিক নাজিম উদ্দিনের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। সেই বিরোধের জেরেই মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীর পক্ষের লোকজন নিউগিনি প্রপার্টিজে ঢুকে বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর চালায়। নাজিম উদ্দিন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ থাকলেও তিনি তা অস্বীকার করেছেন।

ঘটনার পর ফেসবুকে দুটি লাইভে সালমান মুক্তাদির বিএনপির লোকজনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তোলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের উদ্দেশে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘এই ভিডিওটা শুধু বানানো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের জন্য। প্লিজ, আপনি কোনো টেনশন নেবেন না। বাংলাদেশে এটি খুব স্বাভাবিক ঘটনা।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপির লোকজন যারা করছে, এটা তোমাদের চাঁদাবাজি। কেন তোমরা আমার স্বপ্নটা নষ্ট করছ?’ যদিও বিএনপির বিরুদ্ধে সালমান মুক্তাদিরের চাঁদাবাজির অভিযোগকে ‘ঢালাও’ বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

পুলিশের ভাষ্য, ঘটনার পেছনে মূলত জমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। এ ঘটনায় নিউগিনি প্রপার্টিজের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া ক্যান্টনমেন্ট থানায় ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছেন।

সর্বশেষ গতকাল রোববার সকালে মোহাম্মদপুরের আদাবরে শ্যামলী হাউজিংয়ের একটি আটতলা বাড়িতে ১৫-২০ জনের একটি দল হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেছেন বাড়ির বাসিন্দারা।

তাঁদের অভিযোগ, হামলাকারীরা মূল ফটক খুলে সবাইকে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। এ সময় তাঁরা টাকা দাবি করেন। পরে চাপাতি ও রামদা দিয়ে বাড়ির গেটে কোপানো এবং সিসিটিভি ক্যামেরা ও জানালার কাচ ভাঙচুর করা হয়।

বাড়িটির মালিক ব্যবসায়ী আমিনুর রহমান। তাঁর ভাতিজা মনির হোসেন জানান, এর আগে ২০২৪ সালের এক ব্যক্তি বাড়িটি দখল করেছিলেন। মামলা-মোকদ্দমার পর গত মার্চ মাসে তাঁরা বাড়িটির দখল ফিরে পান।

ঘটনাগুলো সরকারের জন্য অশনিসংকেত হিসেবে উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান গতকাল এক বিবৃতিতে প্রতিটি ঘটনা যথাযথ তদন্ত করে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে এর ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে। এখনই কার্যকর আত্মশুদ্ধিমূলক পদক্ষেপ ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত