Ajker Patrika

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট: আশ্রয়ণ ঘেঁষে বালু উত্তোলন ঝুঁকিতে ১৬০ পরিবার

সহিবুর রহমান, হবিগঞ্জ 
আপডেট : ২১ জুলাই ২০২৬, ০৮: ৩৭
হবিগঞ্জের চুনারুঘাট: আশ্রয়ণ ঘেঁষে বালু উত্তোলন ঝুঁকিতে ১৬০ পরিবার
হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার বনগাঁও আশ্রয়ণ প্রকল্পসংলগ্ন খোয়াই নদ থেকে অবাধে উত্তোলন করা হচ্ছে বালু। সম্প্রতি তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার বনগাঁও সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্প ঘেঁষে অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। এতে নদীভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে প্রকল্পে বসবাসরত ১৬০টি ভূমিহীন পরিবারের বসতভিটা। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নাকের ডগায় দুই মাস ধরে এই কার্যক্রম চললেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বনগাঁও আশ্রয়ণ প্রকল্প ঘেঁষে সরকারি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে ড্রেজারের মাধ্যমে অবাধে বালু উত্তোলন করছেন ইজারাদার এবং বিএনপি-জামায়াত ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা। এতে নদীভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাসরত পরিবারের বসতভিটা। পাশাপাশি হুমকির মুখে রয়েছে আশপাশের কৃষিজমি, নদীতীর ও পরিবেশ।

সরেজমিনে দেখা যায়, খোয়াই নদের বনগাঁও আশ্রয়ণ প্রকল্পসংলগ্ন এলাকায় ২০-২৫টির বেশি ড্রেজার দিয়ে দিনরাত বালু উত্তোলন চলছে। রাজার বাজার বালুমহালের ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের সম্মতিতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অবাধে বালু তোলায় নদীতীর দুর্বল হয়ে পড়েছে। এতে ভাঙন-আতঙ্কে রয়েছেন আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা। এদিকে বালুমহালের সীমানা নির্ধারণ করে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাইনবোর্ড স্থাপনের কথা থাকলেও তা লক্ষ করা যায়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি ১৪৩৩ সনের জন্য প্রায় ২৭ কোটি টাকায় রাজার বাজার বালুমহালের ইজারা পায় রাহী ট্রেডার্স, যেটি পরিচালনা করছেন ইজারাদারের স্বামী সেলিম মিয়া। তিনি ইজারার শর্ত ভঙ্গ করে বালু উত্তোলন করছেন।

আইন অনুযায়ী আশ্রয়ণ প্রকল্প, সেতু, কালভার্ট, বাঁধ, সড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা এবং আবাসিক এলাকার কমপক্ষে ১ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে বালু উত্তোলন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তবে সেই বিধান অমান্য করে প্রকল্পের একেবারে পাশ থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কৃষিজমি ও জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়েছে।

আশ্রয়ণ প্রকল্পের সরদার আব্দুল জলিলের অভিযোগ, শুধু নদী থেকে নয়, প্রকল্পসংলগ্ন ১৩টি পরিবারের মালিকানাধীন জমিও জোর করে দখলের পর সেখানে বালুর ডিপো গড়ে তোলা হয়েছে। একাধিকবার প্রতিবাদ করেও কোনো প্রতিকার পাননি।

জানা গেছে, স্থানীয় আহম্মদাবাদ ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি বাবরু মিয়া, জামায়াতের সভাপতি মোস্তফা হোসেন মস্তু, আওয়ামী লীগ নেতা আল আমিনসহ বেশ কয়েকজন বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত।

তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেন জামায়াত নেতা মোস্তফা মস্তু। তিনি বলেন, ‘সরকারনির্ধারিত সীমানার মধ্যেই বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। যদি তীরবর্তী বসতবাড়ির কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়, তাহলে আমরা ক্ষতিপূরণ দেব।’

বিএনপি নেতা বাবরু মিয়া বলেন, ‘এসি ল্যান্ড জায়গা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। নির্ধারিত জায়গায়ই আমরা বালু উত্তোলন করতেছি।’

আওয়ামী লীগ নেতা আল আমিনও দাবি করেন, তিনি বৈধ জায়গা থেকে বালু উত্তোলন করছেন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন হবিগঞ্জের ভাইস প্রেসিডেন্ট তোফাজ্জল সুহেল বলেন, ‘ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের ফলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রশাসন যদি ব্যবস্থা না নেয়, তবে আশ্রয়ণের ওই পরিবারগুলো মাথা গোঁজার ঠাঁই হারাবে।’

চুনারুঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গালিব চৌধুরী বলেন, ‘এই বালুর বিষয়ে এসি ল্যান্ড দেখবে। সব দায়দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়েছে।’ এসি ল্যান্ড তৌফিক আনোয়ার বলেন, শিগগির ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আবুল হাসেম বলেন, ‘অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। অনিয়মের প্রমাণ মিললে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জেলা প্রশাসক ড. জি এম সরফরাজ বলেন, ‘আমি কিছুদিন আগে বনগাঁও এলাকা পরিদর্শন করেছিলাম, তখন সব ঠিকঠাক ছিল। বর্তমানে যদি আশ্রয়ণ প্রকল্প ঘেঁষে বালু উত্তোলন করেন ইজারাদার, তাহলে কঠোর ব্যবস্থা নেব।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত