Ajker Patrika

চট্টগ্রামে ফ্লাইওভারে ঝুলন্ত মরদেহ: তথ্যে গরমিল

সোহেল মারমা, চট্টগ্রাম 
চট্টগ্রামে ফ্লাইওভারে ঝুলন্ত মরদেহ: তথ্যে গরমিল
নিহত কাউসার আহমেদ। ছবি: সংগৃহীত

মঙ্গলবার ভোরের আলো না ফুটতেই চট্টগ্রাম মহানগরীর সাগরিকার ফ্লাইওভার থেকে গলায় ফাঁস লাগানো কাউছার আহমেদ (২৮) নামের এক যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সারা দিনের আলো পেরিয়ে ফের রাত নামলেও সেই মরদেহের খবর ছিল প্রায় অজানা। কিন্তু বুধবার দিবাগত মধ্যরাতে হঠাৎ একের পর এক ফেসবুক পোস্টে ভাসতে থাকে সেই যুবক ও তাঁর মরদেহের ছবি। সিসিটিভি ফুটেজের বরাত দিয়ে পরে পুলিশ জানিয়েছে, একটি কোম্পানির স্ক্যাপ মালামালের ডিপোতে পাহারাদার হিসেবে কর্মরত থাকা ওই যুবক আত্মহত্যা করেছেন। এ সময় পুলিশ তাঁর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চিত না করলেও ঘটনার পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা নিজেদের লোক বলে ফেসবুকে এই ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানান।

স্থানীয়দের কাছে খবর পেয়ে মঙ্গলবার ভোর ৪টার দিকে কাউছার আহমেদের মরদেহ উদ্ধার করে পাহাড়তলী থানা-পুলিশ। নিহত কাউছার পার্শ্ববর্তী থানা আকবর শাহ পশ্চিম ফিরোজ শাহ কলোনির বাসিন্দা। তাঁর নিজ বাড়ি চট্টগ্রামের রাউজান থানার ১২ নম্বর উরকিরচর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে। তিনি ওই এলাকার মৃত আবুল কাশেম বাদলের ছেলে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে কাউছারের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য আনা হয়। ময়নাতদন্ত শেষে সন্ধ্যার দিকে তাঁর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

আত্মহত্যার দাবি পুলিশের

পাহাড়তলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরুল আবছার বুধবার বিকেলে আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সাগরিকা ফ্লাইওভারের যে অংশে কাউছারের

মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, সেখানকার একটি সিসিটিভি ফুটেজে তাঁকে একাই হেঁটে আসতে দেখা গেছে। তার আশপাশে কেউ ছিল না। এরপর সেখানে কয়েক মিনিট থাকার পর নিজেই গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। ফ্লাইওভার থেকে ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের পর ওই যুবকের মা, ভাই ও বোন ঘটনাস্থলে এসে কাউছারের লাশ শনাক্ত করেন। সুরতহাল প্রতিবেদনে নিহতের শরীরে গলায় ফাঁসের চিহ্ন ছাড়া অন্য কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। সব মিলিয়ে আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি ওই যুবক আত্মহত্যা করেছেন।’

ওসি বলেন, ‘প্রথমে তার পরিবার ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ নিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু আমরা তদন্তের স্বার্থে ও আইনগত প্রক্রিয়ার কারণে মরদেহ পোস্টমর্টেমের জন্য চমেক হাসপাতাল মর্গে পাঠাই। নিহতের পরিবার মামলায় যেতে না চাওয়ায় পরে আমরা একটি অপমৃত্যু মামলা নিয়ে সন্ধ্যায় লাশ তাদের বুঝিয়ে দিই।’

এদিকে মৃত যুবকের নাম আবু কাউছার জানিয়ে ওসি বলেন, তিনি আত্মহত্যার ঘটনাস্থলের পাশে বিএসআরএম ফ্যাক্টরির স্ক্যাপ মালামাল রাখার ডিপোতে অস্থায়ীভিত্তিতে পাহারাদার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ঘটনার পর পুলিশ একটি সিসিটিভি ফুটেজ সরবরাহ করেছে।

সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিএসআরএম ফ্যাক্টরির ইয়ার্ড থেকে ধারণকৃত বলে জানান নগর পুলিশের উপকমিশনার (পশ্চিম) মো. আলমগীর হোসেন। বুধবার রাত ৮টায় তিনি মোবাইল ফোনে আজকের পত্রিকাকে বলেন, বিএসআরএম ফ্যাক্টরির ইয়ার্ডে স্থাপিত একটি সিসিটিভি ক্যামেরায় যুবকের আত্মহত্যা করার বিষয়টি ধরা পড়ে।

তবে ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে বাংলাদেশের বৃহত্তম ইস্পাত নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএমের পক্ষ থেকে। প্রতিষ্ঠানটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেন গুপ্ত বলেন, ‘পাহাড়তলী থানা কিংবা সাগরিকা এলাকায় যে জায়গার কথা বলছেন, সেখানে কিংবা আশপাশে আমাদের কোনো ওয়্যার হাউস (গুদাম বা ইয়ার্ড) নেই। কোনো ওয়্যার হাউর না থাকায় সেখানে কর্মচারীও থাকার প্রশ্ন ওঠে না। আর আমাদের এই ধরনের কোন কর্মচারী সুইসাইড করার তথ্যও নেই। এটা আপনাদের ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে।’

পরিচয়েও গরমিল

মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশের নথিতে ওই যুবকের বাবা-মায়ের নাম ঠিক থাকলেও তাঁর মূল নাম আবু কাউছার (২৮) বলে উল্লেখ করা হয়। ঘটনার পর পাহাড়তলী থানায় যে অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে, সেখানেও এই নাম নথিভুক্ত হয়। চমেক হাসপাতাল মর্গে রেজিষ্ট্রারে বইয়ে খোঁজ নিয়ে মৃত কাউছারের একই নাম উল্লেখ থাকতে দেখা গেছে।

কিন্তু ২০১৯ সালে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কেন্দ্রঘোষিত চট্টগ্রাম মহানগর আকবর শাহ থানা কমিটিতে মৃত যুবকের নাম রয়েছে কাউছার আহমেদ। তিনি ওই কমিটির মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা সম্পাদক পদে ছিলেন। এ ছাড়া স্থানীয় রাজনীতিতে তাঁকে সবাই কাউছার আহমেদ বলে চিনে থাকে।

রাজনৈতিক পরিচয়ের বিষয়ে ওসি বলেন, ‘রাজনৈতিক পরিচয় আমাদের কাছে মুখ্য নয়। আমরা ওই যুবকের মরদেহ পেয়েছি—সেটাই আমাদের কাছে মুখ্য। এরপর নিয়মানুযায়ী ঘটনাটির তদন্ত হবে। ময়নাতদন্ত হবে। ময়নাতদন্ত রিপোর্টে বিস্তারিত জানা যাবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরের আকবর শাহ থানাধীন পশ্চিম ফিরোজশাহ কলোনির ২৭/২৮ নম্বর বাসায় থাকতেন কাউছার পরিবারের সদস্যরা। সেখানে কাউছারের মা, ভাই ও বোন থাকতেন। আরেক ভাই থাকেন রাউজানের গ্রামের বাড়িতে। ঘটনার পর চট্টগ্রাম নগরীতে তাঁর পরিবারের সদস্যদের খোঁজ করে কাউকে পাওয়া যায়নি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত