Ajker Patrika

দুদক আইন: কমিশনশূন্যতায়ও দুদক ‘সচল’ রাখতে আইন সংশোধন হচ্ছে

  • সংশোধনে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠির পর খসড়া।
  • কমিশন না থাকলে ক্ষমতা সচিবকে দেওয়ার প্রস্তাব।
  • চেয়ারম্যান-কমিশনারদের মেয়াদ কমানোর সুপারিশ।
  • ১২০ দিনে তদন্ত শেষের বাধ্যবাধকতা থাকছে না।
সৈয়দ ঋয়াদ, ঢাকা 
দুদক আইন: কমিশনশূন্যতায়ও দুদক ‘সচল’ রাখতে আইন সংশোধন হচ্ছে
ফাইল ছবি

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ও কমিশনাররা পদত্যাগ করলেও কমিশন সচল রাখতে দুদক আইন সংশোধন করা হচ্ছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংশোধন আইনের খসড়ায় কমিশনের মেয়াদ এক বছর কমিয়ে চার বছর করা, দুদকের ক্ষমতা ও কাজের পরিধি বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

দুদকের সূত্র বলেছে, দুদক আইনের সংশোধনীর খসড়া করা হয়েছে। এটি প্রস্তাব আকারে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হবে। সেখান থেকে আইন মন্ত্রণালয়ে যাবে। পরে মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পেলে বিল আকারে জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হবে।

কমিশনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা আজকের পত্রিকাকে বলেন, সংশোধনী আইনের খসড়ায় কমিশনের মেয়াদ ও কমিশন না থাকলে করণীয়সহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রস্তাব রয়েছে। এটি পাস হলে দুদক কমিশনহীন অবস্থায়ও সচল থাকবে এবং শক্তিশালী হবে।

বর্তমান আইনে দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের মেয়াদ পাঁচ বছর। দুদকের সূত্র জানায়, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগ দেওয়া ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন গত ৩ মার্চ পদত্যাগ করে। পুরো কমিশনের পদত্যাগের পর আড়াই মাস ধরে কমিশনশূন্যতায় দুদক কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। মামলা দায়ের, অভিযোগপত্র অনুমোদন, অভিযান—সব বন্ধ হয়ে আছে। কারণ, বর্তমান দুদক আইনে সব ক্ষমতা কমিশনের হাতে। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতেই আইন সংশোধনের খসড়া করা হয়েছে।

সূত্রটি জানায়, দুদক আইনের ১০ ধারায় আগের তিনটি উপধারার সঙ্গে নতুন একটি উপধারা সংযুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে সংশোধনীতে। প্রস্তাবিত নতুন এই উপধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, অনিবার্য কারণে কমিশনের সার্বিক শূন্যতা দেখা দিলে বিশেষ প্রয়োজনে কমিশনের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার স্বার্থে কমিশনের সচিব স্বীয় বিবেচনায় মহাপরিচালকদের সঙ্গে সভায় আলোচনাক্রমে যথোপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবেন। তবে কমিশন গঠনের অব্যবহিত পরে কমিশনের সচিব গৃহীত কার্যক্রম কমিশনকে অবহিত করবেন। এই উপধারার অধীনে কমিশনের সচিবের গৃহীত সিদ্ধান্ত কমিশনের সিদ্ধান্ত বলে গণ্য হবে।

দুদকের সূত্র জানায়, সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে দুদক আইন সংশোধনকল্পে একটি চিঠি পাঠানো হয়। ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ৭ মে দুদকের সচিব মোহাম্মদ খালেদ রহীম, দুদকের মহাপরিচালক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি সভা হয়। দুদকের সমন্বিত এই কমিটি আইন সংশোধনের সুপারিশ করতে একটি খসড়া তৈরি করে। পরে সংশোধিত আইনের চূড়ান্ত সুপারিশ প্রস্তাব আকারে প্রস্তুত করা হয়; যা শিগগির মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হবে।

খসড়ায় কমিশনের মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে চার বছর করার এবং দুদকের ক্ষমতা ও কাজের পরিধি বাড়ানোরও প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশেষ করে মানি লন্ডারিং-সংক্রান্ত ক্ষমতা বাড়াতে প্রস্তাব করা হয়েছে। দুদক আইনের ১৭(ঘ) ধারায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর (২০১২ সালের ৫ নং আইন) অধীন ‘ঘুষ’ ও ‘দুর্নীতি’র অপরাধ দুদকের কাছে ন্যস্ত রয়েছে। সংশোধনীর খসড়ায় এর পাশাপাশি সরকারি সম্পদ ও জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট অথবা পাবলিক সার্ভেন্ট কর্তৃক দায়িত্ব পালনকালে সংঘটিত প্রতারণা, জালিয়াতি, দলিল-দস্তাবেজ জালকরণ, দেশি ও বিদেশি মুদ্রা পাচার, শুল্ক-সংক্রান্ত অপরাধ, কর-সংক্রান্ত অপরাধ ও পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত অপরাধও দুদকের এখতিয়ারভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

সংশোধনীর খসড়ায় বহুল আলোচিত ও সমালোচিত দুদক আইন, ২০০৪-এর ৩২(ক) ধারাটি বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। এই ধারায় উল্লেখ রয়েছে, ‘এই আইনের অধীন জজ, ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ১৯৭-এর বিধান আবশ্যিকভাবে প্রতিপালন করিতে হইবে।’ এই ধারা উচ্চ আদালত আগেই অবৈধ ঘোষণা করেছেন। ফলে সংশোধিত আইনের খসড়ায় এটি বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে।

আইনের ২০(ক) ধারায় তদন্ত ১২০ দিনের মধ্যে শেষ করার যে বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে, সেটি বাতিল করে সংশোধনীর খসড়ায় নতুন একটি ধারা প্রতিস্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। একইভাবে ‘গোপনীয় অনুসন্ধান’ পরিচালনা করা, কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা এবং বিদেশি নাগরিকত্ব থাকা ব্যক্তিদের কমিশনার হিসেবে নিয়োগে অযোগ্য ঘোষণা করার বিষয়টিও দুদক আইনের সংশোধনীর খসড়ায় সুপারিশ করা হয়েছে।

এ ছাড়া দুদক আইনের ২৮-এর (গ) ধারাটি বাতিলেরও সুপারিশ করা হয়েছে। এই ধারায় উল্লেখ রয়েছে, ‘মিথ্যা জানিয়া বা তথ্যের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত না হইয়া কোনো ব্যক্তি ভিত্তিহীন কোনো তথ্য, যে তথ্যের ভিত্তিতে এই আইনের অধীন তদন্ত বা বিচারকার্য পরিচালিত হইবার সম্ভাবনা থাকে, প্রদান করিলে তিনি মিথ্যা তথ্য প্রদান করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন।’

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলাম বলেন, যেসব সংশোধনী আনার সুপারিশ করা হয়েছে, সেগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুপারিশ করা এসব প্রস্তাব পাস করা হলে দুদকের ক্ষমতা অনেকাংশে বাড়বে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত