Ajker Patrika

একসঙ্গে তিন লাশের খাটিয়া, কাঁদছে পরিবার

নাটোর (লালপুর) প্রতিনিধি
একসঙ্গে তিন লাশের খাটিয়া, কাঁদছে পরিবার
নিহত দিনমজুরদের স্বজনদের আহাজারি। ছবি: আজকের পত্রিকা

‘ও বেটা, একবার ডাকো বেটা। ওরে আমার মানিক বেটা, ওরে আমার কাইলি বেটা, আমাকে দেখপি (দেখবে) কেরে বেটা’ বলে বিলাপ করে কাঁদছিলেন ট্রাকচাপায় নিহত দিনমজুর বাবুল আলীর মা। তাঁর সেই কান্না শুনে আশপাশের মানুষের চোখ ভিজে যায়। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নাটোরের লালপুরের দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের ভেল্লাবাড়িয়া (নগরকয়া) গ্রামে এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা যায়।

এর আগে গতকাল সকালে লালপুরে বালুবাহী ট্রাকের চাপায় নিহত হন বাবুল আলীসহ তিনজন। উপজেলার ঈশ্বরদী ইউনিয়নের নবীনগর গ্রামে ঈশ্বরদী-লালপুর আঞ্চলিক মহাসড়কে এই দুর্ঘটনা ঘটে। বাবুল আলীর (৪০) বাড়ি ভেল্লাবাড়িয়া (নগরকয়া) গ্রামে। নিহত অন্য দুজন হলেন একই গ্রামের জাহিদুল ইসলাম (৫০) ও মনির হোসেন (২৭)। এই দুর্ঘটনায় আহত হন একই গ্রামের রাজিবুল ইসলাম (২৬), রাব্বি (২৫), মজনু (৩৫) ও মিঠুন (৩০)।

একসঙ্গে তিনজনের মৃত্যুর ঘটনায় ভেল্লাবাড়িয়া (নগরকয়া) গ্রামের পরিবেশ শোক-কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে। গতকাল একে একে মরদেহগুলো যখন গ্রামে আনা হয়, তখন স্বজনদের আহাজারিতে পুরো গ্রামের মানুষের চোখ ভিজে ওঠে। পাশাপাশি তিনটি বাড়িতে নেওয়া হয় মরদেহগুলো। কোথাও মায়ের হাহাকার, কোথাও শোকে পাথর স্ত্রী, কোথাওবা সন্তানের নির্বাক চাহনি চোখে পড়ে। পুরো গ্রাম যেন এক বিশাল শোকপুরীতে পরিণত হয়। পরে জানাজার জন্য ভেল্লাবাড়িয়া শাহ বাগুদেওয়ান (রহ.) আলিম মাদ্রাসা মাঠে একসঙ্গে তিনটি লাশবাহী খাটিয়া রাখা হয়। সেখানে বাদ আসর জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে মাগরিবের আগমুহূর্তে মরদেহগুলোর দাফন সম্পন্ন হয়।

নিহত বাবুলের স্ত্রী রাখি শোকে পাথর হয়ে গেছেন। তিনি বলেন, সংসারের অভাব মেটাতে তাঁর স্বামী প্রায়ই বাইরে কাজে যেতেন, কাজ শেষে ১০-১২ দিন পর আবার ফিরে আসতেন। কিন্তু এবার আর ফেরা হলো না। এখন কীভাবে সংসার চালাবেন, তা নিয়ে দিশেহারা তিনি। বাবাকে হারিয়ে ১৭ বছরের ছেলে রাকিবুল ও ১৪ বছরের মেয়ে বৃষ্টি—দুজনেই নির্বাক হয়ে আছে।

ভেল্লাবাড়িয়া শাহ বাগুদেওয়ান (রহ.) আলিম মাদ্রাসা মাঠে নিহত দিনমজুরদের জানাজা হয়। ছবি: আজকের পত্রিকা
ভেল্লাবাড়িয়া শাহ বাগুদেওয়ান (রহ.) আলিম মাদ্রাসা মাঠে নিহত দিনমজুরদের জানাজা হয়। ছবি: আজকের পত্রিকা

নিহত মনির হোসেনের ৮০ বছর বয়সী মা মরিয়ম বেগম ছেলের স্মৃতিচারণা করছেন, আর কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। সন্তানহারা মায়ের আহাজারি, ‘ও বেটা একবার ডাকো বেটা।’ তাঁর বোন ছকিনা ভাই হারানোর শোকে পাগলপ্রায়। কাঁদতে কাঁদতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তিনি। নিহত মনিরের স্ত্রী লিমা খাতুন (২২) সাত বছরের সন্তান দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র রিফাতকে পাশে নিয়ে বসে আছেন। আর তাঁর গর্ভে রয়েছে পাঁচ মাসের আরেকটি সন্তান। তিনি বলেন, কাজে বের হওয়ার সময় তাঁর স্বামী বলেছিলেন, ‘বর্গা নিয়া (নেওয়া) জমিটুকুর দিকে খেয়াল রেখো।’ তাঁর চোখে এখন শুধু অনিশ্চয়তার অন্ধকার। তার সংসারে উপার্জন করার মতো কেউ নেই। কী নিয়ে বাঁচবেন, কীভাবে চলবে সংসার—নানান ভাবনায় তিনি বাক্‌রুদ্ধ হয়ে পড়েছেন।

আরেক নিহত দিনমজুর জাহিদুল ইসলামের পরিবারেও নেমে এসেছে একই শোকের ছায়া। সংসারের টানাপোড়েন সামলাতে জীবনে এই প্রথম কাজের সন্ধানে এলাকার বাইরে বের হয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাকের চাপায় জীবন দিতে হলো তাঁর। তাঁর দুই মেয়ে প্রথম বর্ষের ছাত্রী চাঁদনী খাতুন (১৯) এবং নবম শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতি খাতুন (১৩)। তাঁদের চোখে এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। তাঁদের পড়ালেখা আর সংসার কীভাবে চলবে, তা নিয়ে কিছুই ভেবে পাচ্ছেন না তাঁরা। বাবাহীন এই সংসারে অকূলপাথারে পড়েছেন তাঁরা। তাঁদের এক আত্মীয় জয়তুননেছা জানান, অভাব-অনটনের মধ্যেও সততা আর পরিশ্রম দিয়েই জীবন চালিয়ে যাচ্ছিল পরিবারটি। জীবনের তাগিদেই প্রতিবেশীদের সঙ্গে কাজের উদ্দেশ্যে এই প্রথম গ্রামের বাইরে বের হয়েছিলেন জাহিদুল ইসলাম। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে কাজের সন্ধানে যাওয়া ছয়জনের মধ্যে তিনজনই আর ফিরে এলেন না।

এলাকাবাসীর দাবি, এই অসহায় দিনমজুর পরিবারগুলোর পাশে সরকারসহ সমাজের বিত্তবানরা যেন এগিয়ে আসে।

নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন পুতুলের নির্দেশে দুর্ঘটনায় হতাহত ব্যক্তিদের পরিবারের খোঁজখবর নেন বিএনপির নেতারা। তাঁরা পরিবারগুলোকে সকল প্রকার সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন লালপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক হামিদুর রহমান বাবু, তাহমিদুর রহমান, শহীদুল ইসলাম, রবিউল ইসলাম রবি প্রমুখ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত