Ajker Patrika

পলিথিনের নিচের সেই বাবা-ছেলের মাথার ওপর উঠল নতুন ছাদ

বড়াইগ্রাম (নাটোর) প্রতিনিধি
আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৯: ৩২
পলিথিনের নিচের সেই বাবা-ছেলের মাথার ওপর উঠল নতুন ছাদ
এমপি আব্দুল আজিজ আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন ঘরের চাবি তুলে দেন। ছবি: আজকের পত্রিকা

ঝড়-বৃষ্টিতে পলিথিনের ছাউনি উড়ে যেত। বৃষ্টির পানি গড়িয়ে পড়ত চৌকিতে। তীব্র রোদে উত্তপ্ত হয়ে উঠত আশ্রয়টুকু। সেই পলিথিনের নিচেই দিনের পর দিন কেটে যাচ্ছিল বৃদ্ধ কফিল প্রামাণিক (৭০) ও তাঁর দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছেলে আসমত প্রামাণিকের (৫২) জীবন।

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার জোনাইল ইউনিয়নের মানইর গ্রামের এই বাবা-ছেলের সেই কষ্টের জীবনে অবশেষে এসেছে স্বস্তি। পলিথিনের ছাউনির বদলে এখন তাঁদের মাথার ওপর উঠেছে টিনের ছাদ। আজ শুক্রবার বিকেলে স্থানীয় এমপি আব্দুল আজিজ আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের হাতে নতুন ঘরের চাবি তুলে দেন।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বাবা-ছেলের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি নজরে আসে ঢাকাস্থ বড়াইগ্রাম উপজেলা সমিতি ও উপজেলা প্রশাসনের। পরে তাঁদের উদ্যোগে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় একটি ঘর।

কিছুদিন আগেও মানইর গ্রামের রাস্তার পাশে পলিথিন টাঙিয়ে কোনোরকমে দিন কাটছিল কফিল ও আসমতের। প্যারালাইজড হয়ে চলাফেরায় অক্ষম কফিলের নিজের কোনো ঘরবাড়ি নেই। অন্যদিকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছেলে আসমতই ছিলেন তাঁর একমাত্র ভরসা।

জীবনও আসমতের প্রতি খুব একটা সদয় ছিল না। জন্মান্ধ না হলেও পরে পোলিও রোগে দৃষ্টিশক্তি হারান তিনি। একসময় স্ত্রী ও এক মেয়েকে নিয়ে তাঁর সংসার ছিল। প্রায় সাত-আট বছর আগে স্ত্রী তাঁকে ছেড়ে চলে যান। পরে মেয়েটিও মারা যান। এরপর অন্ধত্বের মধ্যেই বাবার দেখভালের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন আসমত। বাবার খাবারের জোগাড় করতে তাঁকে মানুষের দ্বারে দ্বারে সাহায্য চাইতে হতো।

আগের সেই পলিথিনের ছাউনিতে বর্ষা কিংবা রোদ—কোনোটিই তাঁদের জন্য স্বস্তির ছিল না। এক খণ্ড জমি থাকলেও সেখানে নিরাপদ একটি ঘর তোলার সামর্থ্য ছিল না। অভাবের সংসারে খাবারের সংস্থান করাই যেখানে কঠিন, সেখানে একটি স্থায়ী ঘর ছিল তাঁদের কাছে অনেকটা স্বপ্নের মতো।

সেই স্বপ্নই এখন বাস্তব। আজ চাবি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি এমপি আব্দুল আজিজ তাঁদের পানির সমস্যা দূর করতে একটি বিদ্যুৎচালিত পাম্প দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দেন। অনুষ্ঠানে তিনি বাবা-ছেলের দুর্দশা তুলে ধরায় সংবাদকর্মীদের এবং নিজেদের অর্থায়নে তাঁদের জন্য ঘর নির্মাণে এগিয়ে আসা ব্যক্তিদের ধন্যবাদ জানান।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বড়াইগ্রাম উপজেলা সমিতির সভাপতি ও সাবেক সিভিল সার্জন শামসউদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক আলতাফ হোসাইন, জোনাইল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান রাশেদুল ইসলাম রাসেল, জোনাইল বাজার ব্যবসায়ী সমিতির নবনির্বাচিত সভাপতি মসলেম উদ্দিন, বড়াইগ্রাম উপজেলা সমিতির উপদেষ্টা আব্দুল কাদের, পিকেএসএফের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মনির হোসেন, সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি ও ঢাকা ইমপালস হাসপাতালের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার রাশিদুল ইসলাম, বড়াইগ্রাম সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক শফীউল হাসান তিতু, সমিতির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাফিসহ বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা।

রাস্তার পাশে পলিথিনের নিচে বাবা-ছেলের সেই দিনগুলো এখন অতীত। নতুন ঘরটি হয়তো তাঁদের জীবনের সব সংকট দূর করবে না, কিন্তু অন্তত বৃষ্টি এলে আর পলিথিনের ছাউনির দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না। রাত নামলে থাকবে নিরাপদ আশ্রয়, আর মাথার ওপর থাকবে একটি স্থায়ী ছাদ—যেটি এতদিন তাঁদের জীবনে ছিল অধরা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত