Ajker Patrika

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়: সিট দখলের সংস্কৃতি ফিরছে রাবির হলে

  • বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে শিক্ষার্থী প্রায় ৩২ হাজার।
  • ১৭টি আবাসিক হলে আসন প্রায় ১০ হাজার।
  • হল থেকে বহিষ্কৃত তিন ছাত্র বহাল তবিয়তে।
  • ছাত্রত্ব শেষ হওয়া অনেকে ছাড়েননি হল।
দীন ইসলাম, রাবি
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়: সিট দখলের সংস্কৃতি ফিরছে রাবির হলে
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক। ছবি: সংগৃহীত

প্রতিষ্ঠার সাত দশক পরও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) শিক্ষার্থীদের আবাসনসংকট কাটেনি; বরং আবাসিক হলগুলোতে আবারও সিট দখলের সংস্কৃতি ফিরে আসার অভিযোগ তুলেছে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন। এসব অভিযোগের তির ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে শিক্ষার্থী রয়েছেন প্রায় ৩২ হাজার। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭টি আবাসিক হলে আসন প্রায় ১০ হাজার। ফলে প্রতি তিনজন শিক্ষার্থীর মধ্যে দুজনই আবাসিক হলে থাকার সুযোগ পান না।

অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আবাসিক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করে। তবে নীতিমালার বিভিন্ন ফাঁকফোকর এবং বাস্তবায়নে তদারকির ঘাটতির কারণে সেটির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সম্প্রতি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলে বৈধ আবাসিকতা ছাড়া তিন শিক্ষার্থীর অবস্থানের অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের মধ্যে আরিফ শাহরিয়ার ও নাহিদুল ইসলাম তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। অপর শিক্ষার্থী দ্বিতীয় বর্ষের লতিফুর রহমান, যিনি রাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল-সমর্থিত প্যানেল থেকে হল সংসদের কার্যনির্বাহী সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি মেহেদী হাসান মারুফ বলেন, ‘অতীতে ছাত্রলীগের সময়ে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে আবাসিক সিট বণ্টনের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। কিন্তু বর্তমানেও আমরা সেই সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি দেখতে পাচ্ছি।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের সিট বরাদ্দ নীতিমালা অনুযায়ী, মেধাবী, অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল, প্রতিবন্ধী এবং নৃগোষ্ঠীভুক্ত শিক্ষার্থীদের জন্য মোট আসনের ১০ শতাংশ হল প্রাধ্যক্ষদের বিশেষ কোটায় সংরক্ষিত। তবে গত ১ মার্চ ছাত্রদলের নেতা আমির হামজা এবং ৫ এপ্রিল আসিফ উদ্দিনকে আমীর আলী হলে এই ১০ শতাংশ বিশেষ কোটায় আবাসিকতা দেওয়া হয়। দুজনই রাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল-সমর্থিত প্যানেল থেকে প্রার্থী ছিলেন।

শাখা সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির—এই দুটি সংগঠনই জুলাই আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছিল। অথচ তারাই আজ নিজেদের প্রভাব থাকা হলগুলোতে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার বিনিময়ে সিট দিচ্ছে।’

এদিকে ছাত্রদলের সহ-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক নাসিম আহমেদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ছাত্রত্ব শেষ হওয়ার পরও জিয়া হলের ৩২১ নম্বর কক্ষে অবস্থানের অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে শাখা ছাত্র ইউনিয়নের কোষাধ্যক্ষ কায়সার আহমেদ বলেন, ‘সম্প্রতি একটি হলে এমন একজনকে অবস্থান করতে দেখা গেছে, যাঁর শিক্ষাজীবন অনেক আগেই শেষ হয়েছে। এটি হলের সিট ব্যবস্থাপনা এবং আবাসিক নীতিমালার বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।’

গত এপ্রিলে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের একটি কক্ষে ‘নারী থাকার সন্দেহে’ তল্লাশি চালানোর দায়ে হল সংসদের এজিএস ইসরাফিল হোসাইন, সাংস্কৃতিক সম্পাদক সাকিব জুবায়ের এবং আবাসিক শিক্ষার্থী ফোরকান হাফিজ জীমের (তিনজনই ইসলামী ছাত্রশিবির মনোনীত হল সংসদের প্রতিনিধি) আবাসিকতা বাতিল করে হল প্রশাসন। তবে তাঁরা ওই হলেই অবস্থান করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সহসভাপতি এবং রাকসুর ভিপি প্রার্থী শেখ নূর উদ্দিন আবীর বলেন, ‘শিবিরের অনেক নেতা সিট বাতিল হওয়ার পরও বিভিন্ন হলে অবস্থান করছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যেন সব হলে একযোগে অভিযান পরিচালনা করে। এতে প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে।’ এই নেতা বলেন, ‘এখন অবধি ছাত্রদল জোরপূর্বক সিট দখল করেছে বা কাউকে উচ্ছেদ করেছে, এমন কোনো তথ্য পাইনি। অনেক ক্ষেত্রে বড় ভাইয়ের অনুমতি নিয়ে ছোট ভাইয়েরা একই কক্ষে বা সিটে ডাবলিং করে থাকছে। বিষয়টি এমন নয় যে কারও বৈধ সিট থেকে তাকে বের করে দিয়ে সেটি দখল করা হয়েছে।’

সিট দখলের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী। তিনি বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এসব অভিযোগ আনা হচ্ছে। বরং শিবির, রাকসু এবং হল সংসদের কারা নিয়মবহির্ভূতভাবে হলে অবস্থান করছে, শিগগির আমরা সেসব তথ্য তুলে ধরব।’

একইভাবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল। তিনি বলেন, ‘এমন একটি ঘটনাও দেখানো যাবে না, যেখানে আমাদের সুপারিশে কোনো শিক্ষার্থী হলে আবাসিকতা পেয়েছে। আমাদের বিরুদ্ধে যারা অভিযোগ করছেন, তাঁরা যেন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করেন।’

প্রাধ্যক্ষদের রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে প্রাধ্যক্ষ পরিষদের আহ্বায়ক এবং মাদার বখস হলের প্রাধ্যক্ষ শাহ হোসাইন আহমেদ মাহাদী বলেন, ‘যদি এমন তথ্য থাকে, তাহলে অবশ্যই প্রাধ্যক্ষ পরিষদ সেই বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে।’

উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আব্দুল আলীম বলেন, ‘হলের প্রাধ্যক্ষরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক নীতিমালা অনুসারেই সিট বরাদ্দ দিচ্ছেন। তবে যেসব শিক্ষার্থী নিয়ম না মেনে অবৈধভাবে হলে অবস্থান করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও হল প্রশাসন ব্যবস্থা নিচ্ছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত