Ajker Patrika

সাটুরিয়ার গাজীখালী: খননেও মেলেনি নদীর সুফল

  • দুই দফায় ১৬ কোটি টাকা বরাদ্দে পুনঃখননের পরও বর্ষায় পানিশূন্য
  • ধলেশ্বরী নদীর উৎসমুখ পলিতে ভরাট হয়ে গেছে
  • ওই উৎসমুখ পুনঃখনন করা গেলে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক হতে পারে
মো. আব্দুর রাজ্জাক, ঘিওর (মানিকগঞ্জ) 
সাটুরিয়ার গাজীখালী: খননেও মেলেনি নদীর সুফল
মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার গাজীখালী নদীভরা কচুরিপানা। ছবিটি সম্প্রতি তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার গাজীখালী নদী দুই দফায় প্রায় ১৬ কোটি টাকা বরাদ্দে পুনঃখনন করা হয়েছিল। কিন্তু বর্ষা মৌসুম শুরু হলেও নদীর অধিকাংশ অংশে পানি নেই, কোথাও কোথাও এমন ঘন কচুরিপানা জন্মেছে যে পানির অস্তিত্বই চোখে পড়ে না। ফলে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে নৌ চলাচল, বিপাকে পড়েছেন জেলে, কৃষক ও নদীনির্ভর মানুষ।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে ছোট নদী, খাল ও জলাশয় পুনঃখনন প্রকল্পের আওতায় মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া, সদর, সিংগাইর এবং ঢাকার ধামরাই সীমান্তজুড়ে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ গাজীখালী নদী পুনঃখনন করা হয়। তিনটি ভাগে বিভক্ত এই প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সাটুরিয়া অংশে দুই দফায় প্রায় ১৬ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছিল।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দুই দফায় বিপুল অঙ্কের টাকা ব্যয়ে নদী পুনঃখনন করা হলেও তার কোনো সুফল মেলেনি; বরং পুনঃখননের কয়েক বছরের মধ্যে নদী আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। তাঁদের ভাষায়, ‘সরকারের কোটি কোটি টাকা জলে গেছে, কিন্তু নদীর নাব্যতা ফেরেনি।’

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, সাটুরিয়ার গোপালপুর থেকে ধামরাইয়ের বারবারিয়া পর্যন্ত নদীর দীর্ঘ অংশ কচুরিপানায় ঢেকে আছে। কোথাও কোথাও সামান্য পানি থাকলেও কচুরিপানার কারণে তা চোখে পড়ে না। ফলে ছোট নৌকাও চলাচল করতে পারছে না।

স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিরা জানান, একসময় গাজীখালী নদীকেন্দ্রিক গড়ে উঠেছিল সাটুরিয়া বাজার। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বড় বড় নৌকায় করে ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা এই নদীপথে বাজারে আসতেন। কিন্তু বর্তমানে সেই নদীপথ পুরোপুরি অচল।

নদীটির বিষয়ে সাটুরিয়া সদরের বাসিন্দা শিক্ষক রুহুল আমিন, কৃষক মজিবর মিয়া, ব্যবসায়ী আতাউল হক, কলেজশিক্ষার্থী আকাশ আহমেদসহ বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা বলছেন, পুনঃখননের সময় নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার পরিবর্তে অপরিকল্পিতভাবে মাটি অপসারণ করা হয়েছে। ফলে খননের বছর কিছুটা পানি থাকলেও পরে নদী আবার ভরাট হয়ে যায়।

হরগজ গ্রামের আবদুল মজিদ বলেন, ‘একসময় গ্রামের খাল দিয়ে নৌকা নিয়ে গাজীখালী নদী হয়ে সাটুরিয়া হাটে আসতাম। এখন খালে পানি নেই, নদীতেও শুধু কচুরিপানা। নৌকা চলা তো দূরের কথা, পানিই দেখা যায় না।’

দরগ্রাম এলাকার জেলে জ্যোতিন রাজবংশী বলেন, ‘আগে এই নদীতে শত শত জেলে মাছ ধরে সংসার চালাত। এখন নদীতে পানি নেই, মাছও নেই। অনেকে বাধ্য হয়ে মাছ ধরা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছে।’

পানাইজুরি গ্রামের বাসিন্দা আবদুল হালিম বলেন, ‘একসময় সাটুরিয়া বাজারের খাদ্যগুদাম পর্যন্ত নদী ছিল। বড় বড় নৌকা ও ট্রলার চলত। এখন নদী ছোট হয়ে গেছে, পানির জায়গা দখল করেছে কচুরিপানা। নদী খননের নামে অর্থ অপচয় হয়েছে, কিন্তু নদীর কোনো উন্নতি হয়নি।’

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কচুরিপানা অপসারণের কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় নদীর পানি দূষিত হচ্ছে এবং অক্সিজেনের অভাবে মাছ মারা যাচ্ছে। এতে নদীনির্ভর জেলে পরিবারগুলো জীবিকা সংকটে পড়েছে।

পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক বেসরকারি সংস্থা বারসিকের মানিকগঞ্জ আঞ্চলিক সমন্বয়কারী বিমল রায় বলেন, ‘শুধু পুনঃখনন প্রকল্প নয়, গাজীখালী নদীর উৎসমুখ পুনঃখনন, নিয়মিত কচুরিপানা অপসারণ এবং নদী রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা না হলে একসময় এলাকার ঐতিহ্যবাহী এই নদী মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘আমি যোগদানের আগেই গাজীখালী নদীর পুনঃখননের কাজ হয়েছে। তাই সে বিষয়ে মন্তব্য করতে পারছি না। তবে বর্তমানে নদীতে পানি না আসার প্রধান কারণ হলো, গোপালপুর এলাকায় ধলেশ্বরী নদীর উৎসমুখ যমুনা নদীর পলিতে ভরাট হয়ে গেছে। ওই উৎসমুখ পুনঃখনন করা গেলে নদীতে আবারও পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক হতে পারে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত