Ajker Patrika

সৈয়দপুরে কালের সাক্ষী টেলিগ্রাম অফিস ধ্বংসের মুখে

রেজা মাহমুদ, সৈয়দপুর (নীলফামারী) 
সৈয়দপুরে কালের সাক্ষী টেলিগ্রাম অফিস ধ্বংসের মুখে
সৈয়দপুর শহরের দেড় শ বছরের পুরোনো টেলিগ্রাফ অফিস ও টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ভবন। ছবি: আজকের পত্রিকা

নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরের দেড় শ বছরের পুরোনো টেলিগ্রাফ অফিস ও টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ভবন। তদারকি ও সংস্কারের অভাবে ব্রিটিশ আমলের এই প্রাচীন স্থাপনাটি এখন ধ্বংসের মুখে পড়েছে।

স্বাধীনতার পর প্রাচীন ভবনটি পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ টেলিগ্রাফ এবং টেলিফোন বিভাগ, টিঅ্যান্ডটি বোর্ড, বিটিটিবি এবং সর্বশেষ ২০০৮ সালে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) অধীনে আসে। নব্বইয়ের দশকে এখানে আধুনিক ডিজিটাল সুইচিং ও অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হয়। পরবর্তী সময়ে রংপুর রোডে বিটিসিএলের নতুন অফিস স্থানান্তরিত হওয়ার পর এই ঐতিহাসিক ভবনটি সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।

স্থানীয়রা বলছেন, তদারকি না থাকায় মূল্যবান ভূসম্পত্তিটি প্রভাবশালীরা দখল করে নিতে পারে। তাই ভবনটিকে সরকারি উদ্যোগে সংস্কার করে যেন টেলিযোগাযোগ প্রদর্শনী কেন্দ্র বা তথ্যচিত্র জাদুঘর বানানো হয়। এতে ঐতিহাসিক সম্পদ রক্ষা হবে। সেই সঙ্গে নতুন প্রজন্ম সৈয়দপুর শহরের গোড়াপত্তন ও আধুনিকায়নের ইতিহাস জানতে পারবে। এলাকায় পর্যটনের সম্ভাবনা বাড়বে।

বিটিসিএল সূত্রে জানা গেছে, ১৮৭০ সালে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা প্রতিষ্ঠার পর এই অঞ্চলের আমূল পরিবর্তন ঘটে। তৎকালীন আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের শিয়ালদহ-শিলিগুড়ি ব্রডগেজ লাইনের প্রধান জংশন ছিল সৈয়দপুর। এই লাইনের ট্রেন চলাচল ও সিগন্যালের বার্তা আদান-প্রদানের জন্য স্টেশনের পাশেই প্রায় এক একর জমির ওপর এই টেলিগ্রাফ অফিসটি নির্মাণ করা হয়। চুন-সুরকি, পোড়ামাটির লাল ইট এবং ভারী লোহার বিম দিয়ে এটি নির্মাণ করে ব্রিটিশ গণপূর্ত বিভাগ। খিলান আকৃতির দরজা-জানালা আজও ভবনটির প্রাচীন ঐতিহ্যের জানান দেয়। এর ভেতরের বিশাল হলরুমটি ছিল টেলিগ্রাফের মরস কোড রিসিভার। এ ছাড়া ছিল স্টাফ কোয়ার্টার ও টেলিকম টাওয়ার। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এটি উত্তরবঙ্গ ও আসাম অঞ্চলের প্রধান ম্যানুয়াল টেলিফোন এক্সচেঞ্জে রূপান্তরিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আসাম সীমান্তে জাপানি সেনাদের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে এবং ব্রিটিশ সেনাদের রসদ সরবরাহের জরুরি বার্তা পাঠাতে এই অফিসটি দিনরাত ২৪ ঘণ্টা সচল রাখা হতো।

সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনটি যেন ভুতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়েছে। এর দেয়ালে বট-অশ্বত্থগাছ গজিয়েছে, দরজা-জানালা খুলে পড়েছে এবং খসে পড়েছে পলেস্তারা। ভবনের স্থাপত্যশৈলী মুছে যাচ্ছে। মূল ভবনের পাশের কোয়ার্টারগুলোতে অজ্ঞাতনামা লোকজন বসবাস করছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন বলেন, চারপাশের মূল্যবান জমি দখলের মুখে পড়েছে। রাতের আঁধারে ভবনের ভেতরের পুরোনো লোহালক্কড় ও দামি ইট চুরি হয়ে যাচ্ছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বা বিটিসিএল কর্তৃপক্ষ দ্রুত এগিয়ে না এলে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি চিরতরে হারিয়ে যাবে।

সৈয়দপুর সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক কামরুল হাসান সিদ্দিকী বলেন, অফিসটি কেবল একটি সাধারণ ভবন নয়। এটি এ অঞ্চলের যোগাযোগের ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল।

বিটিসিএলের নীলফামারী কার্যালয়ের সহকারী ব্যবস্থাপক (টেলিকম) রেজওয়ানুল হক বলেন, বিটিসিএলের কার্যক্রম বর্তমানে নতুন কার্যালয় থেকে পরিচালিত হচ্ছে। তবে পুরোনো কার্যালয়ে বিটিসিএল ও টেলিটকের টাওয়ার রয়েছে এবং তা দেখভালের জন্য স্টাফ কোয়ার্টারে কর্মী আছেন। মূল ভবনটি অনেক পুরোনো হওয়ায় এখন আর ব্যবহার করা হয় না।

নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম বলেন, ইতিমধ্যে বিষয়টি নিয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি সংস্কার করে ব্যবহার উপযোগী করার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত