Ajker Patrika

হরমুজ প্রণালি শুধু তেলের জন্য নয়

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
হরমুজ প্রণালি শুধু তেলের জন্য নয়
ছবি: সিএনএন

হরমুজ প্রণালি সংকুচিত হলে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না—মুহূর্তের মধ্যেই তা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে। জ্বালানির দাম হঠাৎ বেড়ে যায়, সরবরাহ ব্যবস্থা কেঁপে ওঠে, আর অনিশ্চয়তার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে। তবে এই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও গভীর এক বাস্তবতা—যা এই অঞ্চলের প্রকৃত ইতিহাস এবং আধুনিক ধারণার মধ্যে একটি বড় ব্যবধান।

তেল আবিষ্কারের বহু আগে থেকেই হরমুজ ছিল একটি বিস্তৃত ও আন্তসংযোগ বাণিজ্য ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু। বসরা থেকে এডেন, মুম্বাই থেকে কেরালার কোঝিকোড়, এমনকি আফ্রিকার জানজিবার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এই নেটওয়ার্ক। এই বন্দরগুলো কেবল দখল বা ক্ষমতার কারণে নয়, বরং পণ্য, মানুষ এবং চিন্তার আদান-প্রদানের মাধ্যম হিসেবে বিকশিত হয়েছিল। আরব নাবিকেরা মৌসুমি বায়ুর সুনির্দিষ্ট হিসাব করে সমুদ্রযাত্রা করতেন, ভারতীয় ব্যবসায়ীরা দীর্ঘ মেয়াদি বাণিজ্যে অর্থ জোগাতেন, আফ্রিকান ব্যবসায়ীরা স্বর্ণ, হাতির দাঁত ও সংস্কৃতি নিয়ে যুক্ত হতেন এই চক্রে। পারস্যের ব্যবসায়ীরা স্থলভাগের সাম্রাজ্যকে সমুদ্রপথের সঙ্গে যুক্ত করতেন।

এই জটিল ও পারস্পরিক নির্ভরশীল ব্যবস্থাগুলো কোনোভাবেই অনুন্নত ছিল না। বরং এগুলো ছিল বিশ্বাস, সুনাম এবং উন্মুক্ততার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা উন্নত বাণিজ্য কাঠামো। অথচ আধুনিক সময়ে এই অঞ্চলকে প্রায়ই শুধুমাত্র তেলসমৃদ্ধ অর্থনীতি বা সংঘাতের ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়—যা বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এই বিষয়ে আমিরাতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ন্যাশনালের এক নিবন্ধে লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন—যা এই ইতিহাসের প্রতিধ্বনি বহন করে। সম্প্রতি ভারতে ঈদুল ফিতর উদ্যাপন শেষে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ফিরে এসে তিনি উপলব্ধি করেন, বর্তমানের অস্থিরতা আসলে অতীতের দীর্ঘ ধারাবাহিকতারই অংশ। মালাবার উপকূল—থালাসেরি, মাহে, কোঝিকোড়—একসময় ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জীবন্ত মহাসড়ক। ১৪ ও ১৫ শতকেই কোঝিকোড় ছিল বিশ্বের অন্যতম বহুজাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র, যেখানে আরব, পারস্য, আফ্রিকান ও চীনা ব্যবসায়ীরা অবাধে আসা-যাওয়া করতেন। ইউরোপীয় শক্তিগুলো, যেমন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, এই ব্যবস্থাকে সৃষ্টি করেনি; বরং নিজেদের এতে যুক্ত করেছিল।

এদিকে সম্প্রতি সিএনএন-এর এক নিবন্ধে বলা হয়েছে—এই প্রণালির গুরুত্ব শুধু জ্বালানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রায় ১০ কোটি মানুষের জন্য খাদ্য ও জীবিকারও প্রধান ভরসা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে উপসাগরীয় দেশগুলোর খাদ্য সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ অত্যন্ত প্রতিকূল। গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা প্রায়ই ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায় এবং চাষযোগ্য জমি খুবই সীমিত। ফলে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো দেশগুলো তাদের খাদ্যের বড় অংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল। সৌদি আরব ৮০ শতাংশের বেশি, আমিরাত প্রায় ৯০ শতাংশ এবং কাতার প্রায় ৯৮ শতাংশ খাদ্য আমদানি করে। ইরাকের ক্ষেত্রেও অধিকাংশ খাদ্য এই প্রণালি দিয়েই আসে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিকল্প রুট খোঁজা হচ্ছে, তবে তা ব্যয়বহুল এবং জটিল। অনেক খাদ্যবাহী জাহাজ এখন প্রণালির বাইরে অপেক্ষা করছে, যার গন্তব্য অনিশ্চিত। কিছু জাহাজকে ভারত বা শ্রীলঙ্কার বন্দরে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে, ফলে সরবরাহ শৃঙ্খলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।

আজ যখন হরমুজকে ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়, তখন বাইরে থেকে এই অঞ্চলকে সংঘাতের চোখেই দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবে এখানকার জীবনধারা অনেকটাই স্থিতিশীল ও নিরাপদ, যা বহির্বিশ্বের ধারণার সঙ্গে মেলে না। ইতিহাস দেখায়—বড় বন্দরগুলো কখনো প্রবাহ থামিয়ে নয়, বরং তা সহজ করে দিয়েই সমৃদ্ধ হয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত