Ajker Patrika

কার্পেট বোম্বিং করে ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে’ ফিরিয়ে দেওয়ার হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৬, ২২: ১৪
কার্পেট বোম্বিং করে ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে’ ফিরিয়ে দেওয়ার হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের
আমেরিকার জন্মের এক হাজার বছর আগেই পারস্য সভ্যতা বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন সভ্যতা হিসেবে বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও দর্শনে প্রভূত উন্নতি সাধন করেছিল। সেই প্রাচীন শহরকেই প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে’ ফিরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে বিশ্ব রাজনীতিতে এটি নতুন কোনো বিষয় নয়। বরং এটি ওয়াশিংটনের কয়েক দশকের পুরোনো একটি রণকৌশল ও অভ্যাসেরই প্রতিফলন। গতকাল বুধবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প এই হুমকি দেন। তাঁর বক্তব্যের কয়েক মিনিটের মধ্যেই মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মাত্র চারটি শব্দে একই সুরে বলেন—‘ব্যাক টু দ্য স্টোন এজ’ (প্রস্তর যুগে ফিরে যাও)।

সামরিক পরিভাষায় কোনো দেশকে ‘প্রস্তর যুগে’ পাঠানোর অর্থ হলো সেখানে নির্বিচারে বোমাবর্ষণ বা ‘কার্পেট বোম্বিং’ করা। এর মূল লক্ষ্য হলো একটি দেশের আধুনিক সব অবকাঠামো ধ্বংস করে তাকে প্রাগৈতিহাসিক ও আদিম অবস্থায় নিয়ে যাওয়া।

ট্রাম্পের ভাষণে ইরান প্রসঙ্গ ও বর্তমান চিত্র

ভাষণে ট্রাম্প সরাসরি ইরানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহ আমরা তাদের ওপর অত্যন্ত ভয়াবহ আঘাত হানব। আমরা তাদের প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাব, যেখানে তাদের থাকা উচিত। তিনি আরও উল্লেখ করেন, আলোচনার দ্বার খোলা থাকলেও এই সময়ের মধ্যেই সংঘাতের সমাপ্তি ঘটতে পারে।

উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি ইরানি নাগরিক নিহত হয়েছেন। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় হাসপাতাল, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং ওষুধ কারখানাসহ হাজার হাজার বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল সিকিউরিটি বিভাগের অধ্যাপক জেনিনা ডিল আল জাজিরাকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ অবকাঠামো, টেলিযোগাযোগ, বেসামরিক শিল্প এবং শিক্ষা ও চিকিৎসা কেন্দ্র ধ্বংস করা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ট্রাম্পের এই হুমকি প্রমাণ করে যে, এটি কেবল ইরানি শাসনের বিরুদ্ধে নয়, বরং পুরো ইরানি সমাজ ও জনগণের বিরুদ্ধে একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ।’

আমেরিকার জন্মের এক হাজার বছর আগেই পারস্য সভ্যতা বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন সভ্যতা হিসেবে বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও দর্শনে প্রভূত উন্নতি সাধন করেছিল। সেই প্রাচীন শহরকেই প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট—জেনারেল কার্টিস লেমের উত্তরসূরি ট্রাম্প

‘বোমা মেরে প্রস্তর যুগে পাঠানো’ বাক্যটি প্রথম পরিচিতি পায় মার্কিন বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা কার্টিস লেমের মাধ্যমে। ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত তাঁর বই ‘মিশন উইথ লেমে’-তে তিনি উত্তর ভিয়েতনামকে এই হুমকি দিয়েছিলেন। লেমে ছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের শহরগুলোতে কার্পেট বোম্বিংয়ের মূল কারিগর, যেখানে ২ লক্ষ ৪০ হাজার থেকে ৯ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের ভয়াবহতা

১৯৫৪ সালে ফরাসিদের পরাজিত করে উত্তর ভিয়েতনামে হো চি মিনের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে দক্ষিণ ভিয়েতনামে কমিউনিস্ট বিরোধী পক্ষকে জেতাতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হস্তক্ষেপ করে। ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন উত্তর ভিয়েতনামের হ্যানয় ও হাইফং শহরে ভয়াবহ বিমান হামলা চালান, যা ইতিহাসে ‘ক্রিসমাস বোম্বিং’ নামে পরিচিত। ভিয়েতনাম যুদ্ধে লাখ লাখ সামরিক ও বেসামরিক মানুষ হতাহত হন।

প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ ও ‘ডাম্ব’ বোমার ব্যবহার

১৯৯০ সালে ইরাক কুয়েত দখল করলে ১৯৯১ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট ‘অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম’ শুরু করে। এর আগে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস বেকার ইরাকি পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারিক আজিজকে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, কুয়েত থেকে সৈন্য না সরালে ইরাককে বোমা মেরে ‘প্রস্তর যুগে’ পাঠিয়ে দেওয়া হবে। যদিও বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে ‘প্রিসিশন গাইডেড’ হামলার দাবি করে। কিন্তু বাস্তবে সেখানে প্রচুর পরিমাণ ‘ডাম্ব’ বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছিল। ফলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চলে।

৯/১১ পরবর্তী অধ্যায় ও কোরিয়া যুদ্ধ

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর পাকিস্তানকেও একই রকম হুমকি দেওয়া হয়েছিল। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ জানিয়েছিলেন, তাঁকে মার্কিন কর্মকর্তা রিচার্ড আর্মিটেজ হুমকি দিয়েছিলেন যে, তালেবানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ না দিলে পাকিস্তানকে বোমা মেরে ‘প্রস্তর যুগে’ পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

এর আগে ১৯৫০-৫৩ সালের কোরিয়া যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার ওপর এত ভয়াবহ বোমা হামলা চালানো হয়েছিল যে, দেশটির ৯৫ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা এবং ৮০ শতাংশের বেশি ভবন ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, তখন উত্তর কোরিয়ার প্রায় প্রতিটি শহরই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল।

আল জাজিরা থেকে সংক্ষেপে অনূদিত

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত