
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের জাঁতাকল, চড়া সুদহার, শুল্ক নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং বৈরী আবহাওয়ার নানা বাধা সত্ত্বেও ভারত সাড়ে ৭ শতাংশের বেশি ঈর্ষণীয় গতিতে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের দাবি করছে। যদিও ভারতের বিরোধীদের মধ্যে এই হার নিয়ে তীব্র দ্বিমত রয়েছে। তবে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল এই বড় অর্থনীতিটির শেয়ারবাজার ২০২৬ সালে এসে অন্যতম বাজে পারফর্ম করা বাজারে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ভারতীয় শেয়ারবাজারে দরপতনের এই মাত্রা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য বলছে, ভারতের শীর্ষস্থানীয় বৃহৎ কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান দুই সূচক ‘সেফেক্স’ ও ‘নিফটি’ টানা আট সপ্তাহ পতনের মুখ দেখার পর চলতি সপ্তাহের সোমবার থেকে সামান্য ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। গত ২৫ বছরের মধ্যে এটিই ছিল তাদের টানা দীর্ঘতম দরপতনের ধারা।
ভারতের যেসব সাধারণ ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী নিফটি সূচকে অর্থ ঢেলেছিলেন, চলতি বছরেই তাঁদের মূলধনের প্রায় ১৫ শতাংশ হাওয়া হয়ে গেছে। অথচ এর বিপরীতে তাঁরা যদি জানুয়ারি থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার ‘কসপি’ (Kospi) সূচকে অর্থ বিনিয়োগ করতেন, তবে ৬২ শতাংশ বাড়তি মুনাফা পেতেন। আর গত দুই বছরের হিসাবে সেই রিটার্নের পরিমাণ দাঁড়াত ১৭০ শতাংশ।
সার্বিকভাবে বললে, গত এক দশকে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা ভারতে যে পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন—তা থেকে তাঁদের তুলে নেওয়া ও বিক্রি করা অংশের অর্থ বাদ দিলে অবশিষ্ট নিট অর্থ এখন প্রায় শূন্যের কাছাকাছি এসে ঠেকেছে। আন্তর্জাতিক ব্রোকারেজ হাউস বার্নস্টেইন রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, কেবল গত দুই বছরেই বিদেশী প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে স্তম্ভিত করার মতো পরিমাণ, প্রায় ৪ হাজার কোটি বা ৪০ বিলিয়ন ডলার তুলে নিয়েছেন।
মূলত মিউচুয়াল ফান্ডসহ বিভিন্ন খাতে সাধারণ ভারতীয় ও স্থানীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বিপুল অর্থের প্রবাহই বাজারকে এর চেয়ে বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতের মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর তহবিলের আকার (অ্যাসেট আন্ডার ম্যানেজমেন্ট) ২০১৬ সালের ১২ হাজার ৫০০ কোটি বা ১২৫ বিলিয়ন ডলার থেকে লাফিয়ে উঠে চলতি বছর প্রায় ৯০ হাজার কোটি বা ৯০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগকারী ভারতীয়দের সংখ্যা তিন গুণ বেড়ে ১৫ কোটিতে দাঁড়িয়েছে।
আর এ কারণেই বাজারের সাম্প্রতিক এই দরপতন আরও বেশি চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, কর্মসংস্থানের করুণ দশা, আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি এবং টানা কমতে থাকা ব্যবহারের কারণে এমনিতেই যেসব পরিবার হিমশিম খাচ্ছে, এখন শেয়ারবাজারে জমানো পুঁজিতে ধস নামায় তারা চরম সংকটে পড়েছে।
ভারতের এই চাঙ্গা অর্থনীতি কেন তার শেয়ারবাজারকে টেনে তুলতে পারছে না—তার পেছনে মূল ৫টি কারণ নিচে তুলে ধরা হলো—
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি অষ্টম মাসে গড়াচ্ছে। বিষয়টি বিশ্লেষকদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি দীর্ঘায়িত হয়েছে। ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৯০ থেকে ১০০ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আপাতত কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না।
ফ্র্যাঙ্কলিন টেম্পলটন অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ইন্ডিয়ার ফান্ড ম্যানেজার হরি শ্যামসুন্দর বলেন, ‘এই একক কারণই বাজারে ভীষণ নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। খনিজ তেলের দাম ৭০ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে থাকলে বাজার তা সামলে নিতে পারে। কিন্তু যখনই ব্যারেলপ্রতি দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, তখন মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি কোম্পানিগুলোর আয় ও মুনাফায় টান পড়ে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করে।’
ভারত তার প্রয়োজনীয় খনিজ তেলের ৯০ শতাংশের বেশি আমদানি করে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক তেল এবং বিপুল পরিমাণ এলপিজি ও এলএনজি আসে এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই। যদিও নতুন উৎস হিসেবে রাশিয়ার তেলের বাজার ব্যবহার করে দিল্লি জ্বালানি উৎসে বৈচিত্র্য এনেছে, তবে সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার সাথে বাণিজ্যরত দেশগুলোর ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়ায় বিষয়টি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
তেলের দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতি চড়চড় করে বাড়ছে, আর তার জের ধরে বিশ্বজুড়ে সুদের হারও ওপরের দিকে। মার্কিন সরকারি বন্ডের প্রকৃত সুদ বা ইয়েল্ড বর্তমানে ৫ %-এর ওপরে উঠে গেছে, যা প্রায় ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। মার্কিন বন্ডকে সাধারণ ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগ হিসেবে ধরা হয়। তাই বিশ্বজুড়ে সুদের হার বাড়লে বিদেশী মূলধন ভারতের মতো ঝুঁকিপূর্ণ উদীয়মান বাজারগুলো থেকে বেরিয়ে গিয়ে নিরাপদ মার্কিন বন্ডের দিকে ছুটে যায়।
বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য কম রিটার্নের সমস্যার সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ করেছে দুর্বল রুপি। ডলারের বিপরীতে ভারতীয় মুদ্রার দরপতনের কারণে মুদ্রার মান হিসাব করলে তাঁদের লোকসানের পাল্লা আরও ভারী হয়েছে। গত এক দশকে নিফটি সূচক বার্ষিক মাত্র ৬ শতাংশ পর্যন্ত ডলার রিটার্ন দিতে পেরেছে, যা অন্যান্য প্রতিযোগী বাজারের তুলনায় মোটেও আকর্ষণীয় নয়।
গত দুই বছরের বাজার সংশোধন অন্যান্য উদীয়মান বাজারগুলোর তুলনায় ভারতীয় শেয়ারের যে বাড়তি দাম বা 'প্রিমিয়াম' ছিল, তা অনেকটাই কমিয়ে এনেছে। শ্যামসুন্দর বলেন, ‘গত ১০ বছরের গড়ের তুলনায় শেয়ারের দাম এখন কিছুটা কমেছে।’ তিনি আরও জানান যে, অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির তুলনায় ভারতীয় শেয়ারগুলো যে বাড়তি দাম পেত, তা গত কয়েক বছরে অনেকটাই সঙ্কুচিত হয়েছে। তা সত্ত্বেও কোম্পানিগুলোর আয়ের তুলনায় তাদের শেয়ারের দাম এখনও বেশ চড়া। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের মতো দেশগুলোর কোম্পানিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিপ্লবের সুফল পেয়ে নিজেদের আয় বহুলাংশে বাড়িয়ে নিয়েছে।
ভারতের অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্পে এআই বা নতুন প্রযুক্তির অর্থনীতির এই বড় অংশটি বলতে গেলে একদমই অনুপস্থিত। বার্নস্টেইন রিসার্চ সম্প্রতি এক নোটে উল্লেখ করেছে, ‘ভারতের অনেক বড় বড় কোম্পানি (লার্জ ক্যাপ) পুরনো আমলের অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রতিনিধিত্ব করছে। তাদের অধিকাংশই ভবিষ্যতে বিনিয়োগ না করে অতীতকে আঁকড়ে ধরে রক্ষা করার চেষ্টা করছে। বিশ্বমানের প্রতিযোগিতার হাত থেকে রেহাই পেতে তারা প্রায়শই নীতিগত সুরক্ষার ওপর ভরসা করে।’
বর্তমানে ছোট আকারের কোম্পানিগুলো এখনও এত বড় হতে পারেনি যা বিদেশী প্রাতিষ্ঠানিক তহবিলকে আকৃষ্ট করতে পারে। ভারত যদিও ডেটা সেন্টার এবং চিপ তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে, তবুও দেশটি ওপেনএআই, অ্যানথ্রোপিক কিংবা চীনের ডিপসিকের মতো বিশ্বমানের কোনো টেক জায়ান্ট তৈরি করতে পারেনি—অথচ এআই খাতের সিংহভাগ মুনাফা এসব জায়গাতেই আসে।
বার্নস্টেইন-এর মতে, ভারত যদি এসব উদীয়মান খাতে বিশ্বমানের প্রতিযোগী শিল্প গড়ে তুলতে পারে, তবেই কেবল বিদেশী বিনিয়োগকারীদের নজর ফেরানো সম্ভব হবে। তারা বলছে, ‘মহাকাশ, প্রতিরক্ষা, সেমিকন্ডাক্টর এবং ডিপ-টেক উদ্ভাবনের মতো ক্ষেত্রগুলোতে আমরা প্রাথমিক কিছু লক্ষণ দেখছি ঠিকই, তবে এগুলোর আকার এখনও এতই ছোট যে চলতি দশকের সিংহভাগ সময়ে মূলধন আকর্ষণে এগুলো খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারবে না।’
আগামী দিনে ভারতীয় শেয়ারবাজার কোন দিকে মোড় নেবে, তা বেশ কিছু তাৎক্ষণিক বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে। ব্রোকারেজ সংস্থা কেয়ারএজ-এর মতে, ‘ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা কমলে এবং শেয়ারের দাম তুলনামূলকভাবে আকর্ষণীয় পর্যায়ে এলে বিদেশী পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের আবার ফেরার সুযোগ তৈরি হতে পারে।’ যদিও বাণিজ্য সংক্রান্ত চাপ ও চড়া জ্বালানি মূল্য আগামী দিনে কর্পোরেট পারফর্ম্যান্সের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
আপাতত বিদেশী বিনিয়োগকারীরা আশা ছেড়ে দিলেও, ভারতীয় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা চিন্তিত হওয়া সত্ত্বেও মিউচুয়াল ফান্ডে তাঁদের মাসিক এসআইপি বা বিনিয়োগের প্রবাহ থামাননি। তবে মূল পরীক্ষাটি হবে তখনই—যদি ভবিষ্যতে বাজারে এর চেয়েও বড় কোনো দরপতন ঘটে এবং সেই পরিস্থিতিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের এই ধৈর্য ও সহনশীলতা টিকে থাকে কি না।
তথ্যসূত্র: বিবিসি

ভারতের কোনো খেলনার দোকানে ঢুকে শিশুর পছন্দের নতুন কোনো খেলনা কেনার পাশাপাশি আপনি বুঝতে পারবেন, কীভাবে ভারত তার শক্তিশালী প্রতিবেশী চীনের সঙ্গে আরও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
১ দিন আগে
হিন্দি চলচ্চিত্রের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জাতীয়তাবাদ এবং সীমান্ত সংঘাতকেন্দ্রিক সিনেমা সর্বদাই ভারতীয় বক্স অফিসে ব্যবসায়িক সাফল্যের অন্যতম মূল হাতিয়ার। তবে বলিউড তারকা সালমান খানের নতুন যুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘মাতৃভূমি:
১ দিন আগে
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সি চিনপিংয়ের ওয়াশিংটন বৈঠকের কয়েক দিন আগে আমি এনডিটিভিতে লিখেছিলাম, চীনের সঙ্গে আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে কতটা গুরুত্ব দেয়, এই শীর্ষ বৈঠক তা স্পষ্ট করে দেবে। আমি তিনটি সম্ভাব্য ফলাফলের কথা বলেছিলাম। ট্রাম্প চীনের কাছ থেকে বড় কোনো ছাড় আদায় করতে পারেন, দুই পক্ষ এমন
২ দিন আগে
নাইকি এখনো বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্পোর্টস ব্র্যান্ড এবং বিশ্বজুড়ে তরুণদের মাঝে এর বিপুল গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তবে একসময় যেভাবে বিশ্ববাজারে একক আধিপত্য বজায় রেখেছিল, সেখানে যে বড় ধরনের চিড় ধরেছে তা স্পষ্ট।
৩ দিন আগে