Ajker Patrika

সেন্সরে সালমানের ‘মাতৃভূমি’: চীনের মান ভাঙাতে নতুন করে শুটিং, বদলাতে হলো নামও

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
সেন্সরে সালমানের ‘মাতৃভূমি’: চীনের মান ভাঙাতে নতুন করে শুটিং, বদলাতে হলো নামও
সালমান খানের ‘ব্যাটল অব গালওয়ান’ সিনেমার নাম বদলে হয়ে গেল ‘মাতৃভূমি’। ছবি: স্ক্রিনশট

হিন্দি চলচ্চিত্রের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জাতীয়তাবাদ এবং সীমান্ত সংঘাতকেন্দ্রিক সিনেমা সর্বদাই ভারতীয় বক্স অফিসে ব্যবসায়িক সাফল্যের অন্যতম মূল হাতিয়ার। তবে বলিউড তারকা সালমান খানের নতুন যুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘মাতৃভূমি: মে ওয়ার রেস্ট ইন পিস’ (পূর্বনাম: ‘ব্যাটল অব গালওয়ান’) সিনেমা নির্মাণ, রাষ্ট্রীয় পররাষ্ট্রনীতি এবং ভূরাজনীতির মধ্যকার সূক্ষ্ম ভারসাম্যের একটি জটিল উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভারতের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সম্প্রতি চলচ্চিত্রটির সংশোধিত সংস্করণে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) দিলেও, সিনেমাটির প্রায় ৪০ শতাংশ দৃশ্য পুনরায় চিত্রগ্রহণ (রিশুট) এবং চীন সংক্রান্ত সমস্ত সরাসরি তথ্য বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নির্দেশ করে, কীভাবে আন্তর্জাতিক কূটনীতি এখন রুপালী পর্দার গল্প তৈরিকে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করছে।

২০২০ সালে পূর্ব লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ভারতীয় ও চীনা সৈন্যদের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের বাস্তব পটভূমিতে সিনেমাটির মূল গল্প তৈরি হয়েছিল। সালমান খান এতে ১৬ বিহার রেজিমেন্টের অধিনায়ক প্রয়াত কর্নেল বিক্কুমাল্লা সন্তোষ বাবুর অনুপ্রাণিত চরিত্রে অভিনয় করেন।

তবে প্রথম টিজার প্রকাশের পরপরই চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস-এর তীব্র প্রতিক্রিয়া এবং পরবর্তীতে ভারতের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সতর্কতা পরিস্থিতি বদলে দেয়।

বিগত কয়েক বছরে ভারত ও চীনের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ও সীমান্ত উত্তেজনা প্রশমনে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে চলচ্চিত্রটিতে চীনকে সরাসরি উসকানিমূলক বা বেইজিংকে প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করা নয়াদিল্লির বর্তমান কৌশলগত অবস্থানের সঙ্গে বৈপরীত্য তৈরি করে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, চলচ্চিত্র শিল্পকে রাষ্ট্র প্রায়শই ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করে। কিন্তু যখন কোনো চলচ্চিত্রের কনটেন্ট রাষ্ট্রীয় পররাষ্ট্রনীতির পথে অস্বস্তি তৈরি করে, তখন সেন্সরশিপ ও রাষ্ট্রীয় তদারকি কঠোর হয়। ‘মাতৃভূমি’র ক্ষেত্রে চীনের সরাসরি উল্লেখ বাদ দিয়ে একটি কাল্পনিক ভৌগোলিক পটভূমি যোগ করা নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সতর্কতারই বহিঃপ্রকাশ।

সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফায়েড (সিবিএফসি)-এর নতুন নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, বৈদেশিক বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ক্ষুণ্ন করতে পারে—এমন উপাদান চলচ্চিত্রে রাখা যাবে না। এর ফলে ঐতিহাসিক ঘটনা বা বাস্তব সংঘাতের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত চলচ্চিত্রের সৃজনশীল স্বাধীনতার পরিধি কতটা সংকুচিত হচ্ছে, তা নিয়ে চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের মধ্যে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।

একটি বহুল প্রতীক্ষিত বিগ-বাজেট সিনেমার প্রায় ৪০ শতাংশ অংশ নতুন করে শুট করা এবং মুক্তির তারিখ বারবার পিছিয়ে যাওয়া অর্থসংস্থানের দিক থেকে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণ ও সেন্সর নীতিমালার কারণে নির্মাতারা শেষ পর্যন্ত সিনেমাটির মূল নির্যাস বদলে ‘যুদ্ধ জয়’ থেকে সরিয়ে ‘মানবিক সহানুভূতি ও সৈনিকদের ভেতরের মানসিক লড়াইকে’ প্রাধান্য দিতে বাধ্য হয়েছেন।

পরিচালক অপূর্ব লাখিয়া এবং প্রযোজনা সংস্থার কৌশলগত রূপান্তরটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সিনেমাটির শিরোনাম থেকে ‘গালওয়ান’ শব্দ বাদ দিয়ে ‘মে ওয়ার রেস্ট ইন পিস’ যুক্ত করার অর্থ হলো এটিকে নির্দিষ্ট কোনো সীমান্ত যুদ্ধের বিবরণ থেকে সরিয়ে সর্বজনীন সেনাপ্রেম ও মানবিক ত্যাগের গল্প হিসেবে তুলে ধরা।

চিত্রনাট্যে সৈনিকদের ব্যাকস্টোরি, পারিবারিক বন্ধন এবং রোমান্টিক আবহ যোগ করার মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রের তীব্র আক্রমণাত্মক ভাবমূর্তি কমিয়ে আনা হয়েছে। সেটিই সরকারি সবুজ সংকেত পাওয়ার ক্ষেত্রে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।

‘মাতৃভূমি’র ওপর দিয়ে যাওয়া এই সেন্সরশিপ ও গল্প পরিবর্তনের যাত্রা প্রমাণ করে, বর্তমান যুগে ইতিহাস বা রাজনৈতিক সংঘাতনির্ভর বিনোদন নির্মাণ আর কেবল বিনোদনমূলক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

যদি সেন্সর বোর্ড (সিবিএফসি) থেকে চূড়ান্ত ছাড়পত্র পাওয়া যায়, তবে আগামী ১৩ নভেম্বর দিওয়ালির সপ্তাহে ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে আসতে পারে। তবে বাস্তবভিত্তিক যুদ্ধচিত্র থেকে কাল্পনিক প্রেক্ষাপটে বদলে যাওয়া সালমান খানের এই নতুন রূপকে দর্শকেরা কীভাবে গ্রহণ করবেন—তা-ই এখন দেখার বিষয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত