
পৃথিবীর একপ্রান্তের একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। একটি বিমান নেমে এলেন মোসাদের একদল এজেন্ট। তাঁরা নিজেদের ফোন চালু করেই দেখলেন, গাজার সীমান্তবর্তী ইসরায়েলি অঞ্চলে কয়েক শ মানুষ নিহত, অজানা সংখ্যক ইসরায়েলি জিম্মি, আর পুরো একটি এলাকা হামাসের নিয়ন্ত্রণে। পুরো ঘটনা তাঁদের বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল।
মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেও, দ্রুতই নিজেদের সামলে নেন। কোনো কিছুই তাঁদের মিশন থেকে বিরত রাখতে পারবে না। মিশনটি ছিল—ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে মোসাদের সঙ্গে কাজ করতে রাজি করানো। এই আহমেদিনেজাদ কি না একসময় ইসরায়েলের অন্যতম বড় শত্রু হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
এই অকল্পনীয়-অভাবনীয় সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে উঠতে শুরু করেছিল তারও এক বছর আগে। মোসাদের হাতে এমন গোয়েন্দা তথ্য আসতে থাকে, যা আহমাদিনেজাদের দৃষ্টিভঙ্গির বিস্ময়কর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। যে ব্যক্তি একসময় ইসরায়েলকে রোগ ছড়ানো এক শয়তানি সত্তা হিসেবে চিত্রিত করেছিলেন, তিনি ২০১৩ সালে ক্ষমতা ছাড়ার পর ধীরে ধীরে অনেক দূর সরে গিয়েছিলেন তাঁর পুরোনো অবস্থান থেকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি আয়াতুল্লাহদের শাসনব্যবস্থার অন্যতম উচ্চকণ্ঠ সমালোচকে পরিণত হন।
আহমাদিনেজাদের একটি বিশ্বাসকে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সেই বিশ্বাস ছিল—নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরান আর টিকে থাকতে পারবে না এবং দেশের পারমাণবিক কর্মসূচি এখন সম্পদ নয়, বরং বোঝায় পরিণত হয়েছে। আহমেদিনেজাদকে রাজি করানোর মিশনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ব্যক্তিরা বিশ্বাস করতে শুরু করেন, শাসকগোষ্ঠীর প্রতি তাঁর বিরোধিতা এতটাই গভীর যে—তিনি মোসাদের সঙ্গে সহযোগিতা করতেও এবং নিজের ভবিষ্যৎ তাদের হাতে তুলে দিতেও প্রস্তুত।
তখন হামাসের বিরুদ্ধে ইসরায়েলে যুদ্ধ ও গাজা গণহত্যা তুঙ্গে। কেউ কল্পনাও করেনি যে ইসরায়েল তেহরানে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু আহমাদিনেজাদের সঙ্গে যোগাযোগ গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মোসাদপ্রধান ডেভিড বার্নিয়া হঠাৎ এই মিশনের সঙ্গে জড়িত নিজ কার্যালয়ের সবাইকে বিদায় করে দেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে নির্ধারিত নিরাপত্তা বৈঠক বাতিল করেন এবং পুরো মনোযোগ নিবদ্ধ করেন সাবেক ইরানি প্রেসিডেন্টের দিকে। পরবর্তী কয়েক মাস ধরে তিনি ব্যক্তিগতভাবে পুরো অভিযানটির তদারকি করেন।
ঘটনাটি ছিল প্রায় অকল্পনীয়।
এমন এক জ্যেষ্ঠ ইরানি নেতার সঙ্গে যোগাযোগ, শুধু বাস্তবই নয়, কার্যকরও ছিল। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে যখন ইরান ইসরায়েলের প্রধান যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়, তখন আহমাদিনেজাদ দেশটির সবচেয়ে মূল্যবান ব্যক্তিত্বের একটিতে পরিণত হন। আর যখন জেরুজালেম ‘অপারেশন পুস ইন বুটস—Operation Puss in Boots’ নামে ইরানি শাসনব্যবস্থাকে উৎখাতের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন দেশের নতুন নেতৃত্ব হিসেবে আহমাদিনেজাদকেই বেছে নেওয়া হয়। আশা ছিল, তিনি দেশকে নতুন পথে পরিচালিত করবেন, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের প্রচেষ্টা পরিত্যাগ করবেন এবং বিশ্বের সামনে পুরোনো অথচ নতুন এক ইরানকে উপস্থাপন করবেন।
আসলে, শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের এই প্রকল্পে আহমাদিনেজাদ ছিলেন কেবল একটি ছোট্ট অংশ। পরিকল্পনার মধ্যে আরও ছিল ইরানের ভেতরে প্রভাব বিস্তারের গোপন অভিযান, ইরাকে কুর্দি বাহিনীকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার কর্মসূচি, শাসনব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করতে অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকে সক্রিয় করা এবং মিলিশিয়া বাহিনীর চলাচলের জন্য একটি স্থল করিডর প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিমানবাহিনীর পরিকল্পনা।
তবে ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকদের মধ্যে মতবিরোধও ছিল গভীর।
সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক মেজর জেনারেল শ্লোমি বিন্দার সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে—এই পরিকল্পনা সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার গবেষণা বিভাগের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ওফির মিজরাহি-রোজেন পুরো একটি নথি লিখে এই উচ্চাভিলাষী অভিযানের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা তজাচি হানেগবি পরিকল্পনা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। কারণ, তাঁর মতে এটি ছিল বাস্তবতার চেয়ে কল্পনার ওপর দাঁড়ানো এক প্রকল্প। এরপর এইচ-আওয়ারের (এটি একটি বহুল ব্যবহৃত সামরিক পরিভাষা, যা দিয়ে কোনো সামরিক অভিযান, আক্রমণ বা মিশনের নির্দিষ্ট শুরুর সময়কে বোঝায়) মাত্র তিন দিন আগে মতবিরোধ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, ইসরায়েলি সশস্ত্রবাহিনীর (আইডিএফ) চিফ অব স্টাফ ইয়াল জামির সবকিছু থামিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু নেতানিয়াহু এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
নেতানিয়াহু এবং বার্নিয়া যে তাসের ঘর নির্মাণ করেছিলেন, তা কুর্দিরা একটি গুলিও ছোড়ার আগেই ভেঙে পড়ে।
এরপর প্রায় ছয় মাস কেটে গেলেও এই অভিযানের অন্তরালের পূর্ণ কাহিনি কখনো প্রকাশ পায়নি। গত কয়েক মাসে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রতিরক্ষা বাহিনীর কর্মকর্তা, কূটনীতিক এবং বিদেশি কর্মকর্তাসহ ৩০ জনেরও বেশি জ্যেষ্ঠ সূত্রের সঙ্গে কথা বলেছে। তাঁদের বর্ণনায় উঠে এসেছে, কীভাবে ইসরায়েল তার ইতিহাসের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী উদ্যোগগুলোর একটিতে হাত দিয়েছিল এবং কীভাবে মোসাদ অবিশ্বাস্য রকম অল্প সময়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছিল।
এত কিছুর পর কী হয়েছে? অপারেশন ‘পুস ইন বুটস’ শুরু থেকেই ছিল এক অনিশ্চিত ও ভঙ্গুর পরিকল্পনা, যার ভিত ছিল দুর্বল। ফলে, পুরো পরিকল্পনাই আসলে ব্যর্থ হয়েছে।
মাত্র দুই বছরেরও কিছু বেশি সময় আগে, ২০২৪ সালের ১৯ মে তৎকালীন ইরানি প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসিকে বহনকারী হেলিকপ্টার ইরান-আজারবাইজান সীমান্তের কাছে বিধ্বস্ত হয়। রাইসি ইরান-ইরাক যুদ্ধের শেষদিকে প্রায় পাঁচ হাজার রাজনৈতিক বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন বলে অভিযোগ আছে। তাঁর মৃত্যু যেকোনো বড় মোড় ঘুরিয়ে দেবে, এমনটা প্রত্যাশিত ছিল না। কারণ, বহুদিন ধরেই প্রত্যেক ইরানিই জানত—প্রেসিডেন্টরা আসেন-যান, কিন্তু দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নেন সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি।
কিন্তু সেটিই ঘটেছিল। অর্থাৎ, পুরো খেলার মোড় ঘুরে গিয়েছিল।
রাইসির মৃত্যুর খবর যখন গ্লিলতে মোসাদের সদর দপ্তরে পৌঁছায়, তখন কর্মকর্তারা একটি অপ্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করেন—তেহরানের রাস্তায় আনন্দ-উল্লাসের দৃশ্য। সংস্থাটি আগেই জানত, ইরানের শাসনব্যবস্থায় দুর্বলতার লক্ষণ দেখা দিচ্ছে। এর এক বছর আগে, বাধ্যতামূলক হিজাববিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর মাহসা আমিনির মৃত্যুকে ঘিরে শুরু হওয়া বিক্ষোভের আগুন তখনও পুরোপুরি নিভে যায়নি। নৈতিকতা পুলিশ (মোরালিটি পুলিশ) তাদের উপস্থিতি অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছিল, আর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ভারে সরকার হিমশিম খাচ্ছিল।
তবুও, প্রেসিডেন্টের মৃত্যুকে ঘিরে সাধারণ মানুষের প্রকাশ্য উল্লাস ছিল অত্যন্ত অস্বাভাবিক ঘটনা। মোসাদের কাছে এটি ছিল ভবিষ্যতের ইঙ্গিত। পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে সংস্থাটি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে ইরানের শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে সাধারণভাবে যা ধারণা করা হয়, বাস্তবে তা তার চেয়েও দুর্বল। আর তারা এতে একটি সুযোগ দেখতে পায়। ২০২৪ সালের গ্রীষ্মকাল নেতানিয়াহুর দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনার সময় হয়ে ওঠে। এ সময়ই নেতানিয়াহু ধীরে ধীরে ৭ অক্টোবরের হামলার ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে শুরু করেন। বল প্রয়োগের ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘদিনের সতর্কতা বদলে গিয়ে জায়গা নেয় অনেক বেশি কট্টর, প্রায় লাগামহীন এক মনোভাব। গাজার মতোই, ইরানের ক্ষেত্রেও।
পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির অগ্রগতি নিয়ে তিনি সত্যিই উদ্বিগ্ন ছিলেন। যদিও তিনি তাঁর পুরো রাজনৈতিক ক্যারিয়ারজুড়েই এই একই ভয় পেয়ে এসেছেন! একই সঙ্গে গাজায় যুদ্ধের স্থবিরতা তাঁকে বিচলিত করেছিল এবং তিনি এমন একটি সাফল্য খুঁজছিলেন, যা হামাসের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের অচলাবস্থাকে ছাপিয়ে যাবে। যেভাবেই দেখা হোক না কেন, ঠিক এই সময়েই তিনি সিদ্ধান্ত নেন—ইসরায়েলকে তেহরানের শাসনব্যবস্থা উৎখাতের লক্ষ্যে এগোতে হবে।
নেতানিয়াহু যখন মোসাদপ্রধান ডেভিড বার্নিয়াকে ডেকে নতুন এই মিশনের জন্য সংস্থার অ্যাসেট ও সক্ষমতা পুনর্বিন্যাসের নির্দেশ দেন। এর আগে, ২০০৯ সালে নেতানিয়াহু পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার আগে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট তৎকালীন মোসাদপ্রধান মেইর ডাগানকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ইসরায়েল কি ইরানের শাসনব্যবস্থার মূল শিকড়ে আঘাত হানতে পারে কি না। পরে এই বিষয়ে ওলমার্ট বলেছিলেন, ‘ডাগানের উত্তর ছিল, না। আমরা নানা ধরনের প্রভাব বিস্তারের অভিযান পরিচালনা করেছিলাম এবং দেখেছিলাম, সেগুলোর প্রকৃত কোনো মূল্য নেই।’
মোসাদপ্রধান হিসেবে ডাগানের দায়িত্বকালের শেষ দিকে নেতানিয়াহু আবারও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফিরে আসেন। তিনি ফিরে আসার পরপরই বিষয়টি ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক কমিটির একটি গোপন বৈঠকে আলোচনা হয়। বৈঠকে উপস্থিত একটি সূত্র হারেৎজকে জানান, ‘ডাগান বলেছিলেন, এটি আমাদের সামর্থ্যের বাইরে। তবে তিনি এটাও বলেছিলেন, যদি আমেরিকানরা এই দায়িত্ব নেয়, তাহলে তাদের সহায়তা করার মতো উপায় আমাদের থাকবে।’
মোসাদের পরবর্তী পরিচালক তামির পারদোর সময়েও এই নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। মোসাদের এক সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা স্মরণ করে বলেন, তিনি একদিন পারদোর কার্যালয়ে গিয়ে তাঁকে ইরানের শাসনব্যবস্থা উৎখাতকে একটি কৌশলগত লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করার প্রস্তাব দেন। পারদো সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, ‘এর জন্য কোনো রিসোর্সই মোসাদের নেই। এর অর্থ ছিল না—এই বিষয়ে কাজে লাগানোর জন্য মোসাদের কোনো অপারেটিভও ছিল না, পরিকল্পনাও ছিল না।’
ইওসি কোহেনের নেতৃত্বেও ইরান ছিল মোসাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তবে তখনো লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন নয়। সে সময় প্রচলিত ধারণা ছিল, হত্যাকাণ্ডের লক্ষ্য হওয়া উচিত ইরানের রাজনৈতিক নেতারা নন, বরং দেশটির পারমাণবিক বিজ্ঞানীরা। সর্বশেষ, দুই বছর আগে নেতানিয়াহু যখন বার্নিয়াকে কৌশল পরিবর্তনের নির্দেশ দেন, তখন তিনি শুরুতেই তুলনামূলক সীমিত একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করেন—সরাসরি শাসনব্যবস্থা উৎখাত নয়, বরং সেটিকে অস্থিতিশীল করে তোলা।
এরপর মোসাদ এমন সব প্রভাব বিস্তারের অভিযান ও কার্যক্রমের পরিকল্পনা শুরু করে, যার উদ্দেশ্য ছিল ইরানি জনগণের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করা। কিছু প্রস্তাবে দেশের বিভিন্ন জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদ উসকে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। অন্য কিছু পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল উন্নত প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম এবং স্থানীয় সহযোগীদের সহায়তায় বাস্তব জনবিক্ষোভকে আরও উসকে দেওয়া। এটি ছিল অনেক বেশি পরিশীলিত কৌশল, যা ইসরায়েলের ভেতরে অস্থিরতা তৈরির জন্য ইরানিদের তরফ থেকে দেয়ালে গ্রাফিতি আঁকাতে উৎসাহিত করার প্রচেষ্টার উন্নত সংস্করণ।
এখন প্রশ্ন আসে—মোসাদ নিজেই এসব পরিকল্পনার ওপর কতটা আস্থা রেখেছিল? খুবই সামান্য। সংস্থার ভেতরে অনেকেই তখন সতর্ক করেছিলেন যে, এটি সম্পদের সম্পূর্ণ অপচয়। নেতানিয়াহু ও বার্নিয়া সেই সতর্কবার্তা শুনেছিলেন, কিন্তু তবুও প্রয়োজনীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার কাজ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরবর্তী ছয় মাস ধরে মোসাদের কর্মকৌশল এভাবেই চলতে থাকে, ২০২৪ সালের শীতের একেবারে শুরুর দিনগুলো পর্যন্ত। তারপর, হঠাৎ করেই নেতানিয়াহু সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে তাঁকে ভিন্ন পথে হাঁটতে হবে। তাঁকে সর্বশক্তি নিয়োগ করেই এগোতে হবে।
২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর সিরিয়ার বিদ্রোহীরা আলেপ্পো অঞ্চলে সামরিক অভিযান শুরু করে। ১৩ বছরের গৃহযুদ্ধের পর প্রথমে ঘটনাটি আরেকটি স্থানীয় সংঘর্ষ বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু খুব দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, গণহত্যা ও রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে সিরিয়ার জনগণকে দীর্ঘদিন আতঙ্কিত করে রাখা বাশার আল-আসাদের সেনাবাহিনী আসলে ছিল কাগুজে বাঘ।
বিদ্রোহীরা প্রায় কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই আলেপ্পো থেকে হামা, হামা থেকে হোমস এবং হোমস থেকে দামেস্কের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। পথে পথে আসাদের সেনারা নিজেদের ইউনিফর্ম খুলে ফেলে, সাধারণ পোশাক পরে নেয় এবং অবস্থান ত্যাগ করে। গোটা বিশ্ব বিস্ময়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করে—কীভাবে একটি শাসনব্যবস্থা মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে পড়ছে। মাত্র দেড় সপ্তাহের মধ্যেই বিদ্রোহীরা দামেস্কের উপকণ্ঠে পৌঁছে যায়। একাধিক সূত্রের মতে, আবু মোহাম্মদ আল-জোলানির নেতৃত্বাধীন মিলিশিয়া বাহিনীর এই সাফল্যে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু গভীরভাবে মুগ্ধ হন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সাবেক এই কমান্ডার নতুন পরিচয়ে, আহমদ আল-শারা নামে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হন।
সে সময় ইসরায়েলি নীতিনির্ধারক মহলের আলোচনায় অংশ নেওয়া একটি সূত্র বলেন, ‘আল-জোলানি মূলত প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। সিরিয়ার ঘটনাপ্রবাহের পর নেতানিয়াহু মোসাদের কাছে গিয়ে বলেছিলেন, যদি তারা ইরানের শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করতে চায়, তাহলে তাদের মাটিতে (ইরানে) লোক দরকার। অর্থাৎ সরাসরি মাঠে উপস্থিত যোদ্ধা দরকার। তাদের এমন সশস্ত্র যোদ্ধা প্রয়োজন, যারা অস্থিরতা ও বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারবে।’
জোলানির সাফল্য থেকেই জন্ম নেয় মোসাদের ‘কুর্দি পরিকল্পনা’। ইরাকি কুর্দিস্তানে মিলিশিয়াদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং পশ্চিম ইরানে সম্ভাব্য আক্রমণের জন্য তাদের আকাশপথে সহায়তা প্রদানের কথা ভাবা হয়। কিন্তু মোসাদ এই পরিকল্পনা তৈরি শুরু করার আগেই এটি ইসরায়েলি ডিফেন্স এস্টাবলিশমেন্টের সর্বত্র বিস্ময় ও সংশয়ের জন্ম দেয়। এমনকি মোসাদের ভেতরেও এ নিয়ে প্রকৃত উদ্বেগ ছিল।
একটি সূত্র এই বিষয়ে বলেন, ‘নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার সব সদস্য সেখানে বসেছিলেন, আর সবার মুখেই যেন একটাই অভিব্যক্তি ছিল—এখানে আসলে কী হচ্ছে? তাঁরা সবাই হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন।’ একাধিক সূত্রের ভাষ্য, গৃহযুদ্ধ শুরুর আগেই সিরিয়া ছিল একটি বিভক্ত ও দরিদ্র দেশ। ২০২৪ সালে এসে, টানা ১৩ বছরের যুদ্ধের পর দেশটি সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। তাঁদের মতে, সেই সিরিয়ার সঙ্গে ইরানের তুলনা করা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ারই শামিল। ইরান অর্থনৈতিকভাবে শক্তিধর একটি রাষ্ট্র, যার জনসংখ্যা সিরিয়ার তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি। দেশটির জনসংখ্যা ৯ কোটি, যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাষ্ট্র এবং তার নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে যুক্ত।
অপর এক নিরাপত্তা সূত্র বলেন, ‘ইরান এমন একটি দেশ, যার আয়তন ইউরোপের প্রায় অর্ধেকের সমান। সেখানে জটিল ও গভীরভাবে প্রোথিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আপনি কুর্দি মিলিশিয়াদের দিয়ে এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলতে চান? এই কলমটা দেখছেন? এটা দিয়ে ওই ভবনটা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করার মতোই ব্যাপার। এটা একেবারেই অসম্ভব।’
কিন্তু নেতানিয়াহু অনড় ছিলেন এবং মোসাদপ্রধান ডেভিড বার্নিয়া নিজেকে সম্পূর্ণভাবে এই পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করেন। সিদ্ধান্ত হয়ে যাওয়ার পর কুর্দি মিলিশিয়ারাই স্বাভাবিক পছন্দে পরিণত হয়। কুর্দিরা ইরানের বৃহত্তম সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীগুলোর একটি এবং তেহরানের শাসনব্যবস্থার সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনাপূর্ণ। হাজার হাজার কুর্দি কর্মী ইরাকের কুর্দি অঞ্চলে ঘাঁটি গেড়ে শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে কাজ করছিলেন এবং তাঁরা সিআইএর পৃষ্ঠপোষকতা পেতেন। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ১৯৭০-এর দশক থেকেই মোসাদের সঙ্গে বিভিন্ন কুর্দি গোষ্ঠীর সম্পর্ক রয়েছে, যা সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়েছে।
ইসরায়েল যখন পরিকল্পনাটি এগিয়ে নিতে শুরু করে, তখন মোসাদ বিভিন্ন কুর্দি গোষ্ঠীকে চিহ্নিত ও মূল্যায়ন করে। যেসব গোষ্ঠীর সঙ্গে তারা যোগাযোগ করেছিল, তাদের মধ্যে কয়েকটি অংশগ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করে। আবার কিছু গোষ্ঠীকে ইচ্ছাকৃতভাবেই বাদ দেওয়া হয়। মোসাদ সিদ্ধান্ত নেয়, যেসব গোষ্ঠী প্রকাশ্যভাবে তুরস্কবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত, তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে না। কারণ এতে আঙ্কারার উদ্বেগ তৈরি হতে পারে এবং পুরো অভিযান জটিল হয়ে উঠতে পারে। পরে দেখা যায়, এই আশঙ্কা যথার্থই ছিল।
সিরিয়ার বিদ্রোহীদের সফল অভিযানের প্রায় দেড় মাস পর জেরুজালেমে ইসরায়েলের জোট সরকারের দলগুলোর প্রধানেরা অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার বৈঠকে মিলিত হন। এটি পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার তুলনায় ছোট একটি ফোরাম, যেখানে জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীরা থাকেন এবং যা নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার অধীনেই কাজ করে। সেই সময় পর্যন্ত নেতানিয়াহু মন্ত্রীদের সঙ্গে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের পরিকল্পনা নিয়ে কোনো আলোচনা করেননি। বৈঠকে মোসাদ ইরানের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তারের সম্ভাব্য উপায়গুলো উপস্থাপন করে। তাদের বার্তা ছিল সরাসরি—এমন পর্যায়ের প্রভাব সৃষ্টি করতে, যা শাসনব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করতে সক্ষম হবে, প্রায় ‘তিন বছর’ কাজ করতে হবে।
বৈঠকে উপস্থিত এক অংশগ্রহণকারী স্মরণ করেন, ‘পুরো বিষয়টি সবাই হাই তুলে উড়িয়ে দিয়েছিল।’ তাঁর মতে, মোসাদ ইরানের ভেতরে এমন কোনো উল্লেখযোগ্য হাতিয়ার, সম্পদ বা বাস্তব সক্ষমতার কথা তুলে ধরতে পারেনি, যার মাধ্যমে ঘটনাপ্রবাহকে প্রভাবিত করা সম্ভব হতো। বৈঠকে উপস্থিত অধিকাংশ মানুষের কাছে শাসনব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করার ধারণাটি ছিল নিছক কল্পনা, এমনকি উন্মাদনার কাছাকাছি কিছু। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নিজে যেহেতু সেই ‘উন্মাদনার’ পক্ষে ছিলেন, তাই বিষয়টি বারবার আলোচনায় ফিরে আসতে থাকে।
এদিকে কুর্দি পরিকল্পনার প্রস্তুতির পাশাপাশি মোসাদ ইরানে প্রভাব বিস্তারের (influence campaign) কার্যক্রমও চালিয়ে যেতে থাকে। প্রথম থেকেই মোসাদ বুঝেছিল, যদি তারা ইরানি জনমতকে প্রভাবিত করতে চায়, তবে প্রথমে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে অর্থবহ অবস্থান তৈরি করতে হবে। রাজধানীর কেন্দ্রজুড়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার বিস্তৃত আচ্ছাদিত গলি ও বাণিজ্যপথের এই বিশাল নেটওয়ার্ককে জনমতের স্পন্দন মাপার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বহু বছর ধরেই গ্র্যান্ড বাজার ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবাদ আন্দোলনগুলোর জন্মস্থান। সেখান থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভকে সাধারণত রাজনৈতিক উসকানির চেয়ে অর্থনৈতিক দুর্দশার প্রকৃত বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হয়। ফলে এগুলো জনসাধারণের কাছে একধরনের বৈধতা অর্জন করে। মোসাদ জানত, বাজারে যা ঘটে, তা তেহরানজুড়ে প্রতিফলিত হয়; আর তেহরানে যা ঘটে, তা পুরো ইরানেই ছড়িয়ে পড়ে।
এরপর, ২০২৫ সালের পুরো সময়জুড়ে মোসাদ তাদের হয়ে কাজ করা এজেন্টদের মাধ্যমে গ্র্যান্ড বাজারে নিজেদের প্রভাব বিস্তারে উল্লেখযোগ্য সম্পদ ব্যয় করে। উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি জনমত গড়ে তোলা, যা তৃণমূল থেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে উঠে আসবে। সংস্থাটির বিশ্বাস ছিল, পরবর্তী বড় প্রতিবাদ আন্দোলন গ্র্যান্ড বাজার থেকেই শুরু হবে, এবং শেষ পর্যন্ত সেটিই ঘটেছিল। তাই তারা সেই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার চেষ্টা করেছিল। এই প্রচেষ্টা শুধু নিম্নস্তরের অপারেটিভদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মোসাদ স্থানীয় এমন নেতাদেরও নিজেদের প্রভাববলয়ে আনতে চেয়েছিল, যারা শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবেন। সংস্থাটি একাধিক ভিন্ন চ্যানেলের মাধ্যমে কাজ করছিল। তাদের ব্যবহৃত পদ্ধতিও ছিল নানাবিধ।
কিন্তু গ্রীষ্মের শুরুতে, যখন ২০২৫ সালের ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হয়, তখন অগ্রাধিকার নাটকীয়ভাবে প্রভাব বিস্তার থেকে বল প্রয়োগের দিকে সরে যায়। সে অনুযায়ী পরিকল্পনাও সংশোধন করা হয়। সেই মুহূর্ত থেকে মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের হত্যাকাণ্ড, আকাশপথে বোমাবর্ষণ এবং মিলিশিয়াদের অনুপ্রবেশ।
সিরিয়ায় আল-জোলানির দ্রুত সাফল্য শুধু নেতানিয়াহুর জন্য অনুপ্রেরণার উৎসই ছিল না। আসাদ সরকারের পতনের পরের কয়েক দিনের মধ্যেই ইসরায়েলি বিমানবাহিনী সিরিয়ায় রাশিয়ার তৈরি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করে দেয়, যার ফলে ইরানের দিকে একটি নিরাপদ আকাশপথ তৈরি হয়। ১৩ জুন ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো পূর্ব দিকে উড়ে যায় এবং অভিযান শুরু করে। পরবর্তী ১২ দিন ধরে ইসরায়েল ইরানের ওপর ধারাবাহিক আঘাত হানে। নিজেদের প্রায় অসহায় অবস্থায় দেখতে পায় ইরানি সরকার। আইডিএফের তেল আবিবের কিরিয়া কমপ্লেক্সের ভূগর্ভস্থ কমান্ড সেন্টারের জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তারা অভিযানের ফলাফলে সন্তুষ্ট ছিলেন। কিন্তু নেতানিয়াহু সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মানসিক অবস্থায় কাজ করছিলেন।
এই বিষয়ে নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ একজন জানান, ‘প্রধানমন্ত্রী ছিলেন উচ্ছ্বাসে ভরপুর।’ হারেৎজের সঙ্গে কথা বলা তাঁর আরও কয়েকজন সহযোগীও একই ধরনের ধারণা পেয়েছিলেন। তাঁদের একজন বলেন, ‘প্রথম আঘাত সফল হয়েছিল। তারপর আমেরিকানরাও যোগ দিল। মনে হচ্ছিল, যেন সবকিছু সত্যি হওয়ার জন্য অতিরিক্ত ভালো অবস্থায় আছে। ঠিক তখনই নেতানিয়াহু বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, ইরানের শাসনব্যবস্থাকে সত্যিই পতনের মুখে ঠেলে দেওয়া সম্ভব।’
আকাশযুদ্ধে ইসরায়েলের সাফল্য থেকে জন্ম নেওয়া সেই উচ্ছ্বাসের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল বিপদ। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, বাড়তি সাফল্য মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছিল। নেতানিয়াহুর মনে হয়েছিল, এখন সুবিধাজনক অবস্থানকে আরও কাজে লাগানোর সময় এসেছে। তিনি জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, তাঁরা কি ‘খামেনিকে শেষ করতে’ পারবেন? উত্তর ছিল, না। এরপর আলোচনা হয়, শিয়া মুসলিমদের কাছে প্রতীকী মর্যাদাসম্পন্ন এক প্রবীণ ধর্মীয় নেতাকে হত্যা করলে তার কী ধরনের পরিণতি হতে পারে। আলোচনা খুব সংক্ষিপ্ত ছিল। তবে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগীরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে, তিনি এই লক্ষ্য অর্জনের ব্যাপারে একরকম আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছেন।
ইসরায়েলের ক্ষমতার বলয়ের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলেন, ‘ইরানি শাসনব্যবস্থা উৎখাতের ব্যাপারে তাঁর (নেতানিয়াহুর) এক ধরনের প্রবল আবেগ তৈরি হয়েছিল। হঠাৎ করেই তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, আমরা যদি অভিযান চালিয়ে যাই, তাহলে শেষ পর্যন্ত সরকার ভেঙে পড়বেই।’
তবে নেতানিয়াহুর এই দৃঢ় বিশ্বাসের পেছনে কোনো প্রমাণ ছিল না। বরং ১২ দিনের যুদ্ধের পর যে গোয়েন্দা চিত্র সামনে আসে, তা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র দেখতে পায়, ইরানজুড়ে ব্যাপক ও গুরুত্বপূর্ণ পুনর্গঠন কার্যক্রম চলছে। তেহরানের সরকারকে আবারও দামেস্কের সরকারের তুলনায় অনেক বেশি স্থিতিশীল বলে মনে হয়। যেখানে আসাদের সরকার পুরোপুরি রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল ছিল, সেখানে ইরান ছিল ঠিক উল্টো অবস্থানে। তারা মস্কোকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সরবরাহ করছিল। ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পও আবার পূর্ণ গতিতে উৎপাদনে ফিরে যায়। এরই মধ্যে নেতানিয়াহু আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
তেল আবিবের অভ্যন্তরীণ মন্ত্রিসভা যেহেতু আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা নয়, তাই সেখানে ভোটাভুটির প্রয়োজন হয় না। ফলে ইসরায়েলের ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় এক অভিযানে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যত একজন ব্যক্তিই নেন, আর তিনি ছিলেন নেতানিয়াহু। দুটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ঠিক এই সময়েই প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত নেন যে ইরানের নেতৃত্বের ‘শিরশ্ছেদ’ (decapitate) করতে হবে, অর্থাৎ শীর্ষ নেতৃত্বকে নির্মূল করতে হবে। তিনি ইসরায়েলি সিকিউরিটি এস্টাবলিশমেন্টকে নির্দেশ দেন, তেহরানের কেন্দ্রস্থলের অভিজাত আবাসিক এলাকার নিচে অবস্থিত ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারের নেটওয়ার্কের—যেখানে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব অবস্থান করত—ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি বজায় রাখতে। এর মাধ্যমে শুরু হয় একটি নিবিড় গোয়েন্দা অভিযান। যার উদ্দেশ্য ছিল এমন নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ করা, যাতে জানা যায় কে কোন বাঙ্কারে আছেন এবং কখন আছেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
একই সময়ে নেতানিয়াহু প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের জানান যে, প্রতি সপ্তাহের বৈঠকে ইরানের সরকারকে অস্থিতিশীল করার প্রচেষ্টা নিয়েই বিশেষভাবে আলোচনা হবে। প্রতি শুক্রবার সকাল ১০টায় জেরুজালেমে প্রধানমন্ত্রী মোসাদের প্রধান, তাঁর উপপ্রধান, সংস্থাটির ইনফ্লুয়েন্স (প্রভাব) বিভাগের প্রধান এবং আইডিএফ ও সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসতেন। বৈঠকের শুরুতে ইরানের সরকারকে উৎখাতের অভিযানের অগ্রগতি সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করা হতো। এরপর শেষ হতো বিভিন্ন নতুন ধারণা নিয়ে ব্রেনস্টর্মিং বা মুক্ত চিন্তাচর্চার মাধ্যমে।
বৈঠকের পরিবেশ ছিল স্বচ্ছন্দ। সাধারণত মোসাদপ্রধানই ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি যিনি স্যুট পরতেন। নেতানিয়াহু সামরিক ঘাঁটি পরিদর্শনের সময় যেভাবে পোশাক পরেন, সেই একই পোশাক পরতেন—একটি কালো পোলো শার্ট এবং খাকি রঙের ট্রাউজার। সামরিক পরিকল্পনার পাশাপাশি অংশগ্রহণকারীরা ইরানের জনমতকে কীভাবে প্রভাবিত করা যায়, তা নিয়েও আলোচনা করতেন। বারবার আলোচনায় উঠে আসত ইরানের ভেতরে বিভিন্ন বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা বা সিস্টেম তৈরির বিষয়টি।
টেবিলের চারপাশে বসে থাকা ব্যক্তিরা এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা সম্পর্কে কী ভাবতেন? সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে সন্দেহ ক্রমেই দানা বাঁধছিল। কেউ কেউ অন্যদের তুলনায় আরও প্রকাশ্যেই সেই সন্দেহ প্রকাশ করতেন। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জাচি হানেবিও এসব বৈঠকে অংশ নিতেন। তবে কয়েক সপ্তাহ পর তিনি বৈঠকে যাওয়া বন্ধ করে দেন। একদিন বৈঠকের একজন অংশগ্রহণকারী তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন কেন তিনি আর আসছেন না। হানেবি জবাব দিয়েছিলেন, ‘এই পরিকল্পনাগুলো আমার কাছে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির মতো মনে হয়। এগুলোর কোনো মূল্যই নেই।’
২০২৫ সালের জুনে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের ছয় মাস পর, দুটি ঘটনা ইসরায়েলকে নিশ্চিত করে যে পরিস্থিতি দ্রুত নতুন মোড় নিচ্ছে। প্রথমটি ঘটে শীতের শুরুতে। তখন ইসরায়েলি গোয়েন্দারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা উল্লেখযোগ্যভাবে গতি পেয়েছে। জেরুজালেমের মূল্যায়ন ছিল, পরবর্তী গ্রীষ্মের মধ্যেই আরেকটি সামরিক অভিযান অনিবার্য হয়ে উঠবে।
এরপর ২৮ ডিসেম্বর আসে দ্বিতীয় মোড়। লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং ইরানি রিয়ালের ধসের কারণে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে বিক্ষোভ শুরু হয়। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। খুব দ্রুতই সেই বিক্ষোভ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ইরানি শাসকগোষ্ঠী দমন-পীড়ন শুরু করে। ৮ জানুয়ারি ইন্টারনেট বন্ধ করে এবং সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার পর ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বিক্ষোভকারীদের ওপর নিপীড়ন শুরু করে। মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জনগণকে আশ্বাস দেন যে ‘সহায়তা পথে রয়েছে’ এবং তিনি সামরিক অভিযান শুরু করতে প্রস্তুত বলে ইঙ্গিত দেন।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বুঝতে পারেন, ঘটনাপ্রবাহের সময়সূচি হঠাৎই দ্রুত এগিয়ে এসেছে। তিনি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) চিফ অব স্টাফ ইয়াল জামির এবং মোসাদের প্রধান ডেভিড বার্নিয়াকে পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য তলব করেন। তিনি সেনাপ্রধান জামিরকে জিজ্ঞেস করেন, অল্প সময়ের নোটিশে সেনাবাহিনী কি হামলার পরিকল্পনা প্রস্তুত করতে পারবে? আর বার্নিয়াকে প্রশ্ন করেন, যদি সেই শীতেই অভিযান শুরু হয়, তবে কি সত্যিই ইরানের শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করা সম্ভব হবে?
সেই সময় মোসাদের কাছে উপস্থাপন করার মতো কোনো পূর্ণাঙ্গ কার্যকর পরিকল্পনা এখনো ছিল না। তবে জামির ছিলেন দ্ব্যর্থহীন। আমরা প্রস্তুতির চেয়ে সুযোগকে অগ্রাধিকার দিই—জানুয়ারির এক গভীর রাতের বৈঠকে তিনি বলেন। এক জ্যেষ্ঠ মোসাদ কর্মকর্তা স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘আমরা জানতাম, আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। কিন্তু ট্রাম্প যখন যুদ্ধে যেতে চাইলেন, তখন স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে আমরাও এগিয়ে যাচ্ছি।’
বৈঠকের শেষে নেতানিয়াহু নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর প্রধানদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা যতটা সম্ভব সেরা হামলার পরিকল্পনা তৈরি করে আমার কাছে নিয়ে আসবেন।’ এরপর বার্নিয়ার দিকে ফিরে তিনি বলেন, ‘আপনি শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করার জন্য যতটা সম্ভব সেরা পরিকল্পনা তৈরি করে আমার কাছে নিয়ে আসবেন।’ আলোচনার সমাপ্তি টানতে তিনি বলেন, ‘আমরা সম্ভাব্য সবকিছুই করব।’
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতি ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে পরিকল্পনা ও প্রস্তুতিকে আরও ত্বরান্বিত করে। সংঘাত শুরুর আগের সপ্তাহগুলোতে মোসাদের এজেন্টরা এবং কুর্দি মিলিশিয়ার জ্যেষ্ঠ কমান্ডাররা যৌথভাবে অভিযানের পরিকল্পনা করেন।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বিস্মিত হন। কারণ, গেরিলা যোদ্ধা হওয়া সত্ত্বেও কুর্দি বাহিনী ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত। তাঁরা এমন সব কমান্ডারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, যাঁরা স্যুট পরতেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। যুদ্ধ ইউনিটগুলোতে বহু নারী সদস্য দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং পুরো সংগঠনটি ছিল অত্যন্ত শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল।
এক ইসরায়েলি সূত্র বলেন, ‘কুর্দিদের ঘাঁটিগুলো সবদিক থেকেই সামরিক শিবিরের মতো। সেখানে পরিধিজুড়ে আছে বেড়া, প্রহরী টাওয়ার, টহল ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণক্ষেত্র এবং সমাবেশ এলাকা রয়েছে। এগুলো অনেকটা আইডিএফের ঘাঁটির মতো, শুধু আরও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং আরও সুশৃঙ্খল।’
পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ চলার পাশাপাশি লেবাননের যুদ্ধে হিজবুল্লাহর কাছ থেকে জব্দ করা অস্ত্র কুর্দিদের হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগও চলছিল। মোসাদের এজেন্টরা কুর্দি কমান্ডারদের সেই অস্ত্রব্যবস্থা ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেন। কয়েক দিনের কঠোর প্রশিক্ষণের পর প্রস্তুতির পুরো প্রক্রিয়া ধারণ করে একটি ভিডিও তৈরি করা হয়। ভিডিওটি দেখেছেন এমন এক সূত্র বলেন, ‘আমরা অস্ত্র ও সরঞ্জামে ভর্তি বিশাল বিশাল হ্যাঙ্গার দেখেছি। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা নিখুঁতভাবে প্রস্তুত সৈন্য, রসদবোঝাই ট্রাক। সবকিছু এতটাই নিখুঁতভাবে সংগঠিত ছিল যে তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল।’
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর হামলার আড়ালে কুর্দি বাহিনী পশ্চিম ইরানে প্রবেশ করত। বিমান হামলার লক্ষ্য ছিল এমন একটি করিডর তৈরি করা, যেখানে ইরানি বাহিনীর উপস্থিতি থাকবে না। তাদের প্রথম লক্ষ্য ছিল ইরানের কুর্দি অঞ্চলের দুটি শহর—কেরমানশাহ এবং মারিভান দখল করা। উভয় শহরই ইরাক সীমান্তের কাছাকাছি। সেখানে পৌঁছে তারা স্থানীয় সমর্থক বাসিন্দা এবং স্থানীয় কুর্দি যোদ্ধাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কথা ছিল।
একই সময়ে, মোসাদের সঙ্গে কাজ করা অন্যান্য জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোকেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযান চালানোর কথা ছিল। পরিকল্পনার মূল ধারণা ছিল, ইরানি বাহিনীকে দেশের কেন্দ্র থেকে প্রান্তিক অঞ্চলের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান অভিযান চালিয়ে ইরানের শাসকগোষ্ঠীর নেতৃত্ব এবং নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর আঘাত হানা।
তারপর, যখন ইরানি বাহিনী ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়বে, তখন পরবর্তী ধাপে তেহরানসহ অন্যান্য বড় শহরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা হবে। একই সঙ্গে ইরানের জনগণকে এই বার্তা দেওয়া হবে যে শাসকগোষ্ঠী চারদিক থেকে আক্রমণের মুখে পড়েছে এবং সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার মধ্যে জনগণকে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হবে।
মোসাদের পরিকল্পনা ছিল, এই বিক্ষোভ ও অরাজকতার পর্যায়কে এমন একাধিক অভিযানের সঙ্গে সমন্বয় করা, যার উদ্দেশ্য হবে একটি নতুন শাসনব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রিত ও পরিকল্পিত উপায়ে স্থিতিশীল করা। পরিকল্পনার চূড়ান্ত ধাপে প্রভাব-সৃষ্টিমূলক (ইনফ্লুয়েন্স) অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কৌশল গ্রহণের কথা ভাবা হয়েছিল।
ইসরায়েলে মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে প্রায়ই এমন একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখা হতো, যার সময় অনেক আগেই ফুরিয়ে গেছে। কিন্তু ইরানের ভেতরে তিনি এখনো ব্যাপক জনপ্রিয়। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বিশ্বাস, তাঁর ইসরায়েলের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি শাসকগোষ্ঠীর জানা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে ক্ষতি না করার অন্যতম কারণ ছিল এই জনপ্রিয়তাই।
মোসাদের কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলতেন, এই আক্রমণ মোটেও সীমিত ছিল না। মোসাদের হিসাব অনুযায়ী, প্রাথমিক হামলায় প্রায় ১৬ হাজার কুর্দি যোদ্ধা অংশ নিতেন এবং অভিযান যত এগোত, তাঁদের সংখ্যা ততই বাড়ত। নেতানিয়াহুর মতোই মোসাদপ্রধান ডেভিড বার্নিয়া এবং তাঁর সহকর্মীরাও আল-জোলানির উদাহরণ আঁকড়ে ধরেছিলেন। আল-জোলানি মাত্র কয়েক হাজার যোদ্ধা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন, কিন্তু পরে তাঁর বাহিনী বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় লাখ খানেকে। একই সঙ্গে মোসাদ ইরানের অস্ত্রভান্ডারগুলোরও মানচিত্র তৈরি করেছিল, যেগুলো আক্রমণ অগ্রসর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দখল করা সম্ভব হতে পারত। এতে মিলিশিয়াদের জন্য ধারাবাহিক গোলাবারুদের সরবরাহ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা ছিল।
ইসরায়েল একটি বিকল্প পরিকল্পনাও প্রস্তুত করেছিল, যা অত্যন্ত আশাবাদী একটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। সেই পরিস্থিতিতে কুর্দিরা দ্রুত অগ্রসর হবে এবং খুব সামান্য প্রতিরোধের মুখোমুখি হবে। তখন তাঁদের বাহিনীর একটি অংশকে তেহরানের দিকে পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল। প্রাথমিক আক্রমণের মতোই মোসাদ চেয়েছিল ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর হামলার মাধ্যমে তাঁদের অগ্রযাত্রার পথ পরিষ্কার করে দিতে। মোসাদের আশা ছিল, কুর্দিরা রাজধানীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পৌঁছাবে, যেগুলোকে বিরোধী শক্তির ঘাঁটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, এবং সেখান থেকে বৃহত্তর গণঅভ্যুত্থান ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করবে।
হামলার সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে মোসাদের সদস্যরা এবং কুর্দি কমান্ডাররা বিস্তারিত পরিকল্পনা পর্যালোচনা করেন, মানচিত্রে আক্রমণের রুট চিহ্নিত করেন এবং বিমানবাহিনীর নির্ধারিত আকাশপথের সহায়ক হামলার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন। হামলার নির্ধারিত সময় যত এগিয়ে আসছিল, মোসাদপ্রধান নিজেও কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর নেতাদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকে অংশ নেন। সবকিছু প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছিল। এখন শুধু হোয়াইট হাউসের সবুজ সংকেতের অপেক্ষা।
মার্কিন রাজধানী তখন তীব্র শীতের কবলে। এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে ওয়াশিংটনের সবচেয়ে শীতল ফেব্রুয়ারি ছিল সেটি। কিন্তু ১১ ফেব্রুয়ারি যখন নেতানিয়াহু হোয়াইট হাউসে পৌঁছান, তখন তাঁকে স্বাগত জানায় মৃদু বাতাস। তাপমাত্রা হিমাঙ্কের ওপরে উঠে গিয়েছিল, তুষারপাত থেমে গিয়েছিল, আর ওভাল অফিসে তাঁকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য অপেক্ষা করছিলেন এক আন্তরিক প্রেসিডেন্ট।
বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে ছিল যুদ্ধ পরিকল্পনা। নেতানিয়াহুর বিশ্বাস ছিল, অভিযান কেবল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ক্ষতি সাধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। তাই বৈঠকের অধিকাংশ সময় তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, মোসাদের পরিকল্পনা ইরানে শাসন পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম। গ্লিলোতে অবস্থিত মোসাদ সদর দপ্তর থেকে ভিডিও সংযোগে বৈঠকে যোগ দেন ডেভিড বার্নিয়া।
প্রথমে বৈঠকের ফলাফল আশাব্যঞ্জক বলেই মনে হয়। ট্রাম্প যেন বিশ্বাস করেছিলেন যে, ইরানের শাসনব্যবস্থা উৎখাতের সময় এসে গেছে। কিন্তু পরদিন যখন তিনি তাঁর উপদেষ্টাদের নিয়ে বৈঠক করেন, তখন পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইসরায়েলি পরিকল্পনা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আরও সরাসরি একে ‘বুলশিট’ বলে অভিহিত করেন। সিআইএর পরিচালক জন র্যাটক্লিফ হেসে এটিকে ‘প্রহসন’ বলে উড়িয়ে দেন। বৈঠকে উপস্থিত জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা মূল্যায়ন করেন যে, একটি কুর্দি আক্রমণ ইরানে শাসন পরিবর্তন ঘটাবে, এমন প্রত্যাশা ‘বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।’ শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পও তাঁর উপদেষ্টাদের যুক্তিতে প্রভাবিত হয়ে বলেন, শাসন পরিবর্তন হলে সেটি হবে ‘তাঁদের সমস্যা।’
শুধু ওয়াশিংটনেই নয়, এই পরিকল্পনা তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েছিল ইসরায়েলের ভেতরেও। সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের গবেষণা শাখার প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিজরাহি-রোজেন এবং বিভাগের ইরান ডেস্কের প্রধান কর্নেল এন—এর প্রস্তুত করা একটি বিস্তারিত গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়, পরিকল্পনাটির সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। সামরিক গোয়েন্দাপ্রধান মেজর জেনারেল বাইন্ডারের পৃথক মূল্যায়নেও একই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়েছিল: ইরানি শাসনব্যবস্থার পতনের সম্ভাবনা খুবই কম।
প্রকৃতপক্ষে, সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিশ্বাস ছিল—অদূর ভবিষ্যতে ইরানে শাসন পরিবর্তন কার্যত সম্ভব নয়। তাঁদের মতে, মোসাদের এই অভিযান সেই লক্ষ্য অর্জনে যথেষ্ট হবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টাই কেবল ফল দিতে পারে। বিশেষ করে পরিকল্পনার শেষ ধাপ, অর্থাৎ আহমাদিনেজাদকে ক্ষমতায় বসানোর ধারণা নিয়ে তাঁদের সংশয় ছিল সবচেয়ে বেশি। গোয়েন্দাপ্রধানদের মতে, কয়েক দিনের বিশৃঙ্খলার মধ্যে জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি কীভাবে বিকশিত হবে, তা আগাম নির্ভুলভাবে অনুমান করার চেষ্টা ছিল মূলত অর্থহীন।
বাইন্ডার আরও যুক্তি দেন, কুর্দি ও অন্যান্য জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর প্রকৃত অঙ্গীকার কতটা দৃঢ়, তা মূল্যায়ন করা কঠিন। ফলে সংকটময় মুহূর্তে তারা কীভাবে আচরণ করবে, তা আগাম বলা অসম্ভব। তিনি আরও উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের মাত্রাও তখনও স্পষ্ট ছিল না, অথচ পুরো অভিযানের সাফল্য বা ব্যর্থতার ওপর মার্কিন অবস্থানের প্রভাব ছিল নির্ধারক।
সামরিক গোয়েন্দা বিভাগ বাইরের শক্তির সহায়তায় এ অঞ্চলের কোনো দেশে সফলভাবে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠার নজির খুঁজতে শুরু করে। ১৯৮০-এর দশকে লেবাননের ঘটনাপ্রবাহ নিজেদের অনুকূলে আনার চেষ্টা করে ইসরায়েল ইতোমধ্যেই তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিল। ফিলিস্তিনি প্রেক্ষাপটে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে দুর্বল করার প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত হামাসের সামরিক শক্তি হিসেবে উত্থানের পথ প্রশস্ত করে। অন্যদিকে, হামাসকে উৎখাত করে গোত্রভিত্তিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাও গাজায় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের পর চরম হতাশায় শেষ হয়। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে শাসন পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হলেও, শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের পর তালেবান পুনরায় ক্ষমতার লাগাম নিজেদের হাতে তুলে নেয়।
নেতানিয়াহু অবশ্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞই ছিলেন। তাঁর স্বভাবসিদ্ধ পদ্ধতির বিপরীতে, এবার তিনি ঝুঁকির চেয়ে সম্ভাবনার দিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, কুর্দিরা ইরানের ভেতরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে, ইসরায়েলি বিমানবাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ও ইরানের সামরিক শিল্পকে পঙ্গু করে দেবে, যুক্তরাষ্ট্রের বাঙ্কার-বাস্টার বোমা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ ধ্বংস করবে, আর হরমুজ প্রণালীর সংকটের সমাধান করবে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু শিগগিরই তিনি বুঝতে পারেন, এসবের কোনোটিই বাস্তবে ঘটতে যাচ্ছে না।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা বিভাগ ঝুঁকিগুলোকেই সামনে আনতে চেয়েছিল। তারা এমন সব সম্ভাব্য পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে, যেখানে এই অভিযান শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলকে আগের চেয়েও খারাপ অবস্থায় ফেলতে পারে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা সতর্ক করেছিলেন, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শাসনের পতন ঘটলে সেখানে একটি সামরিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। কারণ তখন রেভল্যুশনারি গার্ডের ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার মতো কোনো বেসামরিক প্রতিষ্ঠান আর অবশিষ্ট থাকবে না। তাঁদের যুক্তি ছিল, অভিযান সফল হলেও সেই সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী না-ও হতে পারে, যদি নতুন নেতাকেও হত্যা করা হয়।
তাঁরা উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন, ১৯৮২ সালে লেবাননে বাশির জেমায়েল হত্যাকাণ্ডের কথা। একইভাবে, সাম্প্রতিক সময়ে গাজায় হামাসের নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ জানাতে ইসরায়েল-সমর্থিত নতুন একটি মিলিশিয়ার নেতা ইয়াসের আবু শাবাব প্রতিদ্বন্দ্বী মিলিশিয়াদের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত হওয়ার পর ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে তাঁর আঘাতের কারণে মারা যান।
হারেৎজের সঙ্গে জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের একাধিক আলাপচারিতায় যে চিত্র উঠে এসেছে, তা হলো—কুর্দি বাহিনী ছিল সশস্ত্র এবং প্রস্তুত। বিমানবাহিনীও অভিযানের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল। কিন্তু ওয়াশিংটনের চূড়ান্ত সবুজ সংকেত আর আসেনি। আর কুর্দিরা হলুদ সংকেত মেনে অভিযান শুরু করতে রাজি হয়নি।
ইরানে একটি সামরিক একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নেতানিয়াহুকে খুব একটা বিচলিত করেনি। বরং, ঠিক উল্টোটা। একাধিক সূত্র জানায়, বহু বছর ধরেই নেতানিয়াহু মনে করতেন, ধর্মীয় নেতাদের শাসনের চেয়ে সামরিক শাসনই ভালো বিকল্প। এ বিষয়ে তাঁর সঙ্গে আলোচনা করেছেন এমন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মতে, নেতানিয়াহুর বিশ্বাস ছিল—একটি সামরিক সরকার আদর্শিক উন্মাদনার পরিবর্তে বাস্তব স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হবে, ফলে তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব হবে। কিন্তু যেসব জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা তাঁর এই বক্তব্য শুনেছিলেন, তাঁরা এতে একমত ছিলেন না। তাঁদের ধারণা ছিল, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও ধর্মীয় নেতৃত্বের মতোই কঠোর অবস্থান নিতে পারেন, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে আরও বেশি কট্টর হতে পারেন।
গোয়েন্দা সংস্থার এই হতাশাবাদী মূল্যায়নও নেতানিয়াহুকে তাঁর সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারেনি। অভিযান যতই ঘনিয়ে আসে, তিনি নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার বৈঠক ডাকেন এবং মোসাদপ্রধান ডেভিড বার্নিয়াকে পরিকল্পনার শেষ ধাপ উপস্থাপনের নির্দেশ দেন। কিন্তু মন্ত্রীরা যখন শুনলেন, ইসরায়েলের পরিকল্পনা হলো মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে ক্ষমতায় বসানো, তখন তাঁদের মুখের অভিব্যক্তি মুহূর্তেই বদলে যায়।
বৈঠকে উপস্থিত এক ব্যক্তি পরে স্মরণ করে বলেন, ‘নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার সবাই সেখানে বসেছিলেন, আর প্রত্যেকের মুখে ছিল একটাই অভিব্যক্তি—এখানে আসলে কী হচ্ছে? সবাই হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন।’ মোসাদ ও আহমাদিনেজাদের মধ্যকার সম্পর্ক বহুদিন ধরেই গোপনে গড়ে তোলা হচ্ছিল। এমনকি যাঁরা এই সম্পর্কের কথা জানতেন, তাঁদের ক্ষুদ্র পরিসরেও তাঁকে কেবল কোডনেমে বা সাংকেতিক নামে ডাকা হতো। বার্নিয়া যখন মন্ত্রীদের সামনে বিষয়টি প্রকাশ করেন, তার আগে তাঁদের সবাইকে গোপনীয়তা রক্ষার চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে হয়।
এরপর শুরু হয় উত্তপ্ত প্রতিক্রিয়া। মন্ত্রীরা আহমাদিনেজাদের অতীত কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বার্নিয়াকে কঠিন প্রশ্ন করেন এবং পরিকল্পনার প্রতি তীব্র আপত্তি জানান। বৈঠকে উপস্থিত একজন বলেন, ‘যদি বিকল্পটাও একই রকম খারাপ হয়, তাহলে শাসনব্যবস্থা বদলানোরই বা দরকার কী?’ বার্নিয়া অবশ্য এই প্রতিক্রিয়ার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলেন। তিনি ধৈর্যের সঙ্গে ব্যাখ্যা করেন, কীভাবে আহমাদিনেজাদের সঙ্গে এই সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, তাঁর দুর্বলতাগুলো কী, তিনি ইসরায়েলের জন্য কী ধরনের কৌশলগত মূল্য এনে দিতে পারেন, এবং কেন এই অভিযানের শেষ ধাপ সম্পন্ন হলে তা ইসরায়েলের জন্য বড় ধরনের লাভ বয়ে আনতে পারে।
মন্ত্রীদের মুখে স্বাভাবিক ভাব ফিরতে অনেক দীর্ঘ সময় লেগেছিল, এবং তার আগে তাঁদের অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়।
বৈঠকে উপস্থিত আরেকজনের ভাষায়, ‘ধীরে ধীরে সবার মধ্যে এই উপলব্ধি তৈরি হতে থাকে যে, এখানে কাজ করার মতো কিছু একটা সত্যিই আছে।’
মন্ত্রীদের জানানো হয়, দীর্ঘদিন ধরে ইরানের শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার পর এবং তাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলার কারণে আহমাদিনেজাদ বর্তমানে গৃহবন্দি অবস্থায় আছেন। তাঁদের আরও বলা হয়, তাঁকে তিনবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বাধা দেওয়া হয়েছে এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদেরও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উপস্থাপনাটি একটি বিষয় স্পষ্ট করে দেয়—যে প্রেসিডেন্ট একসময় ‘ইসরায়েলকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার’ অঙ্গীকার করেছিলেন, তিনিই এখন ইরানের শাসকগোষ্ঠীর এক বিরোধী ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন।
হারেৎজের সঙ্গে কথা বলা মার্কিন সূত্রগুলো জানায়, ওয়াশিংটনের কর্মকর্তারাও আহমাদিনেজাদের সঙ্গে এই সম্পর্কের বিষয়ে অবগত ছিলেন। একটি সূত্রের দাবি, সিআইএ পরিচালক এই পরিকল্পনায় মোসাদের সঙ্গে সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার জন্য সবুজ সংকেত দিয়েছিলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও প্রস্তুতির অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে বার্নিয়ার সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেন। তিনি পুরো পরিস্থিতির ওপর নিজের সরাসরি নজর রাখতে চেয়েছিলেন।
ফেব্রুয়ারির শেষভাগে এসে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল। নেতানিয়াহু সামনে এগিয়ে যান। তাঁর আর কারও অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল না। নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব অভ্যন্তরীণ মন্ত্রিসভার (ইনার ক্যাবিনেট) হাতে ন্যস্ত করেছিল। নেতানিয়াহু সিদ্ধান্ত নেন যে মোসাদের এই অভিযান বিদ্যমান বিস্তৃত অনুমোদনের আওতায় পড়ে, তাই তিনি পরিকল্পনাটি কোনো ফোরামে ভোটাভুটিতে না নিয়েই এগিয়ে যান।
যেহেতু অভ্যন্তরীণ মন্ত্রিসভা কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা নয়, তাই সেখানে ভোটেরও প্রয়োজন হয় না। ফলে ইসরায়েলের ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় এই অভিযানে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যত একজন মানুষই নিয়েছিলেন—বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তিনি সাবেক কোনো প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নেননি, অবসরপ্রাপ্ত গোয়েন্দা প্রধানদেরও ডাকেননি। এমনকি নেসেটের (ইসরায়েলি পার্লামেন্ট) গোয়েন্দা ও গোপন সেবা বিষয়ক উপকমিটিকেও তিনি অবহিত করেননি। নেতানিয়াহু একাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, আর যাই হোক, মন্ত্রীদের কেউই আপত্তি তোলেননি।
সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত এক সূত্রের ভাষ্য, ‘নেতানিয়াহু পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে অবিশ্বাস্য রকম দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। কারও কাছেই এমন কোনো শক্তিশালী পাল্টা যুক্তি ছিল না, যার ভিত্তিতে টেবিলে মুষ্টাঘাত করে বিরোধিতা করা যায়। প্রচলিত ধারণা ছিল, সবচেয়ে খারাপ যা হতে পারে তা হলো পরিকল্পনাটি কাজ নাও করতে পারে। কেউ কেউ পুরো ধারণাটিকেই তাচ্ছিল্যের চোখে দেখেছিলেন। বৈঠকে উপস্থিত কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আড়ালে রসিকতা করে বলতেন, কুর্দিরাই সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাবে। তাঁরা জিজ্ঞেস করতেন, গুলির প্রদর্শনী কবে শুরু হচ্ছে? কিন্তু বৈঠকের ভেতরে তাঁরা কোনো আপত্তি তোলেননি। সম্ভবত তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাননি কিংবা পুরো আয়োজনের মজা নষ্ট করা ব্যক্তি হতে চাননি।’
আক্রমণ শুরুর নির্ধারিত সময়ের তিন দিন আগে চিফ অব স্টাফ জামিরই যেন সেই ‘মজা নষ্ট করা’ ব্যক্তি হয়ে ওঠার হুমকি দেন। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা ও জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এক চূড়ান্ত পরিস্থিতি মূল্যায়ন বৈঠকে মোসাদপ্রধান ডেভিড বার্নিয়া অভিযানের চূড়ান্ত বিবরণ তুলে ধরেন। এরপর তিনি হঠাৎ জানিয়ে বসেন, পরিকল্পনাটির সাফল্য নির্ভর করছে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করার ওপর। জামির বিস্মিত হয়ে যান। যদিও ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) সত্যিই খামেনিকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল, তবু এ ধরনের অভিযান স্বভাবতই সবসময় পরিকল্পনা অনুযায়ী সফল হয় না। মাত্র কয়েক মাস আগেই কাতারে হামাস নেতাদের লক্ষ্য করে পরিচালিত একই ধরনের একটি অভিযান চরম ব্যর্থতায় শেষ হয়েছিল। জামির বলেছিলেন, ‘যদি ব্যাপারটা এমনই হয়, তাহলে সবকিছু থামিয়ে দিন।’
ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর পাইলটরা তখন শত্রু ভূখণ্ডের গভীরে, ইসরায়েল থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দূরের এক অভিযানে উড্ডয়নের জন্য প্রস্তুত ছিলেন। জামিরের কাঁধে তখন বিশাল দায়িত্ব, আর তাঁর একেবারেই প্রয়োজন ছিল না যে বার্নিয়া মোসাদের এই অভিযানের দায় তাঁর ওপর চাপিয়ে দিন। উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। বৈঠকে উপস্থিত সূত্রগুলোর মতে, জামির প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, যদি খামেনিকে হত্যা করাই মোসাদের পরিকল্পনা সফল হওয়ার পূর্বশর্ত হয়, তাহলে পুরো অভিযানকেই পুনর্বিবেচনা করতে হবে। উত্তেজনা প্রশমিত হতে কয়েক মিনিট লেগে যায়। শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহু স্পষ্ট জানিয়ে দেন, যেভাবেই হোক অভিযান এগিয়েই যাবে।
শেষ পরিণতি সবারই জানা। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা চালায়। প্রথম দফার আঘাত প্রত্যাশারও বেশি সফল হয়। খামেনি নিহত হন। ইরান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইসরায়েলি বিমানবাহিনী মাহমুদ আহমাদিনেজাদের গৃহবন্দিত্ব কার্যকর করে রাখা নিরাপত্তারক্ষীদের হত্যা করে, ফলে তাঁর মুক্তির পথ খুলে যায়। কিন্তু কুর্দিদের আক্রমণ আর কখনোই শুরু হয়নি। অন্য কোনো জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীও বিদ্রোহে নামেনি। মোসাদের সেই মহাপরিকল্পনা যেন আদৌ কখনো ছিলই না।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহেও ইসরায়েল বাকু সরকারের অবস্থানের পরিবর্তনের আশা করেছিল। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিবেশী আজারবাইজান মোসাদকে নিজেদের ভূখণ্ডে একটি ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দিয়েছিল, যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপকারী দলগুলো সেটি ব্যবহার করতে পারে। পরে ওই ঘাঁটির ভূমিকা আরও বিস্তৃত করা হয়। সেখানে ড্রোন অভিযান পরিচালনা এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৮ মার্চ, যুদ্ধের তুঙ্গ মুহূর্তে, ইসরায়েল কাস্পিয়ান সাগরে অবস্থিত লক্ষ্যবস্তুর ওপরও একটি বিরল, এককালীন হামলা চালায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই পথ ঘিরে গড়ে ওঠা আশাও ব্যর্থ হয়। আজারবাইজান নিরপেক্ষ অবস্থানেই থেকে যায় এবং যুদ্ধে নিজেদের সম্পৃক্ততা আর বাড়ায়নি।
গত ৭ মার্চ ট্রাম্প প্রকাশ্যে স্পষ্ট করে দেন যে তিনি এই অভিযানে সবুজ সংকেত দেবেন না। এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা কুর্দিদের (ইরানে) প্রবেশের দিকে তাকিয়ে নেই। হ্যাঁ, আমি সেটা নাকচ করে দিয়েছি। আমি চাই না কুর্দিরা ভেতরে যাক...তারা যেতে প্রস্তুত ছিল, কিন্তু আমি তাদের বলেছি, আমি চাই না তারা যাক...যুদ্ধ এমনিতেই যথেষ্ট জটিল, তার ওপর...কুর্দিদের এতে জড়ানোর কোনো প্রয়োজন নেই।’
ট্রাম্প হয়তো এই অভিযানের মৃত্যুঘণ্টায় শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছিলেন, কিন্তু বাস্তবে মোসাদের পরিকল্পনা তারও অনেক আগে থেকেই জটিলতার মুখে পড়েছিল। এক জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক সূত্র বলেন, ‘যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যখন দেখলেন মোসাদের দিক থেকে কিছুই ঘটছে না, তখনই বুঝতে পারবেন যে কোথাও একটা সমস্যা হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর প্রায় ১০ দিন পর সবার মাথায় বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। তখন বোঝা যায়, পরিকল্পনাটি আর এগোচ্ছে না। তারপর হঠাৎ করেই যাঁদের সঙ্গে বার্নিয়া কথা বলছিলেন, তাঁরা ফোন ধরা বন্ধ করে দেন।’
বার্নিয়া এই অভিযানের ব্যর্থতার জন্য দুটি কারণকে দায়ী করেন। প্রথমটি ছিল—ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের মধ্যে একটি ফোনালাপ, যেখানে এরদোয়ান ট্রাম্পকে কুর্দিদের সঙ্গে সহযোগিতা না করার আহ্বান জানান। এরদোয়ানের আশঙ্কা ছিল, ইরাক ও ইরানের কুর্দি জনগোষ্ঠী যদি সফল হয়, তবে তা তুরস্কের নিজস্ব কুর্দি সংখ্যালঘুদেরও অনুপ্রাণিত করবে। দ্বিতীয় কারণ হিসেবে বার্নিয়া উল্লেখ করেন যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্পের দেওয়া একটি ভাষণকে, যেখানে তিনি ইরানের নাগরিকদের যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিজেদের বাড়িতে অবস্থান করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
তবে হারেৎজকে এক সাবেক জ্যেষ্ঠ মোসাদ কর্মকর্তা বলেন, ‘এই ব্যাখ্যায় বিশ্বাস করবেন না। এরদোয়ান ও ট্রাম্পের কথোপকথনকে বার্নিয়া একটি সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করছেন।’ অর্থাৎ, এটি ছিল সম্মান রক্ষার একটি অজুহাত। তিনি আরও বলেন, ‘সিআইএ যখন আপনার অপারেশনকে আজগুবি বলে উড়িয়ে দেয়, তখন তিনি পিছিয়ে আসা জন্য পথ খুঁজতে শুরু করেন।’
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার আলোচনায় অংশ নেওয়া এক সূত্রের ভাষ্য, ‘মোসাদ অভিযানের অগ্রগতির জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট মাইলফলক নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু প্রতিবারই তারা সেই লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়। তারা বলেছিল কুর্দিদের যুক্ত করবে, কিন্তু পারেনি। তারা বলেছিল অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকেও যুক্ত করবে, কিন্তু সেটিও সফল হয়নি। তারা বিভিন্ন ধরনের প্রভাব বিস্তারের (ইনফ্লুয়েন্স) অভিযান পরিচালনার কথা বলেছিল, কিন্তু সেগুলোও ব্যর্থ হয়। প্রতিবারই নতুন করে বিলম্ব তৈরি হয়।’
আসলে, হারেৎজের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত অভিযানটি বাতিল করার আগেই কুর্দিদের অভিযানটি দুই দুইবার স্থগিত করা হয়েছিল। মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী যুদ্ধের ষষ্ঠ দিনে অভিযান শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে যুদ্ধের প্রাথমিক হামলার পর সিদ্ধান্ত হয়, কুর্দিরা নির্ধারিত সময়ের দুই দিন আগেই অগ্রসর হবে। কিন্তু নতুন নির্ধারিত সময় ঘনিয়ে এলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে ইসরায়েলি বিমানবাহিনী সংশোধিত সময়সূচি অনুযায়ী তাদের আকাশপথে সুরক্ষা দিতে প্রস্তুত নয়। ফলে অভিযানটি আরও কয়েক দিন পিছিয়ে দেওয়া হয়।
নতুন নির্ধারিত সময়ের আগে বার্নিয়া কিরিয়ার সামরিক হেডকোয়ার্টারে উপস্থিত হন, যাতে মিলিশিয়াদের জন্য একটি নিরাপদ (স্টেরাইল) করিডর তৈরির শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। বিমানবাহিনী এবার প্রস্তুত ছিল। কিন্তু এবার কুর্দিরাই এগোতে অস্বীকৃতি জানায়। প্রথমে ৪৮ ঘণ্টা পিছিয়ে দেওয়ার কথা আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু একদিনের মধ্যেই সবাই বুঝে যায়, অভিযানটি সম্পূর্ণভাবে বাতিল হয়ে গেছে। হারেৎজের সঙ্গে জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের ধারাবাহিক আলোচনায় যে চিত্র উঠে এসেছে তা হলো—কুর্দিরা অস্ত্রসজ্জিত ছিল এবং প্রস্তুতও ছিল। বিমানবাহিনীও হামলা চালাতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু ওয়াশিংটনের চূড়ান্ত সবুজ সংকেত আর আসেনি। কুর্দিরা হলুদসংকেতে সন্তুষ্ট হতে রাজি ছিল না।
মিলিশিয়া নেতারা শুরু থেকেই স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদনই তাদের কাছে সর্বোচ্চ গুরুত্ব বহন করে। মোসাদ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে তাঁরা অতীতে কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন, যা শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ পরিণতিতে গিয়ে শেষ হয়েছিল। কারণ, তখন ওয়াশিংটন পৃষ্ঠপোষকতা প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। ফলে, কুর্দি পুরুষদের পাইকারি হারে হত্যা করা হয়েছিল, নারীদের ধর্ষণ করা হয়েছিলেন। ইসরায়েলের কিছু জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা এমনকি এই ঝুঁকি মেনে নিতেও প্রস্তুত ছিলেন। তাঁদের ধারণা ছিল, ‘সবচেয়ে খারাপ হলেও অভিযানটি কেবল ব্যর্থ হবে।’ কিন্তু কুর্দিরা কোনোভাবেই নিজেদের বসে থাকা সহজ শিকারে পরিণত করতে রাজি ছিল না।
যখন বার্নিয়া নিশ্চিত হন যে এই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে, তখন তিনি মোসাদ কর্মকর্তাদের মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের (রেজিম চেঞ্জ) একটি বিকল্প পরিকল্পনা প্রস্তুত করার নির্দেশ দেন। কর্মকর্তারা হতবাক হয়ে যান। কারণ এ ধরনের অভিযান পরিকল্পনা করতে সাধারণত বহু বছর সময় লাগে। তবুও দুই দিন পর তাঁরা বার্নিয়ার কাছে একটি নতুন প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। তবে সেটি কুর্দি পরিকল্পনার তুলনায় ছিল অনেক বেশি সীমিত।
বিকল্প পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল চাহারশানবে সুরি। এটি ইসলাম-পূর্ব যুগের একটি ইরানি উৎসব। যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইসলামি শাসনব্যবস্থার বিরোধিতার প্রতীক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ওই বছর ১৭ এপ্রিল অনুষ্ঠিত এই উৎসবে আগুন জ্বালানো হয় এবং আতশবাজি পোড়ানো হয়। মোসাদের ধারণা ছিল, এই উৎসবকে কেন্দ্র করে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ জ্বালিয়ে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তারা এ উদ্দেশ্যে সংস্থাটির কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ (অ্যাসেট) সক্রিয় করার প্রস্তাব দেয়। যুদ্ধ শুরুর আগের এক বছরে ইসরায়েলি এজেন্টরা ইরানের অভ্যন্তরে এমন কয়েকজন স্থানীয় নেতার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছিল, যাঁরা মানুষকে রাস্তায় নামতে উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম ছিলেন।
কিন্তু সামরিক গোয়েন্দা বিভাগ এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করে। তাদের যুক্তি ছিল, যুদ্ধ চলাকালে বড় ধরনের গণবিক্ষোভ সৃষ্টি হওয়ার কোনো বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা নেই। কর্মকর্তারা সতর্ক করে দেন, এসব সম্পদ সক্রিয় করলে তাঁদের পরিচয় ফাঁস হয়ে যাবে এবং এতে লাভের চেয়ে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সামরিক গোয়েন্দাদের মূল্যায়ন মেনে নেন। ফলে পরিকল্পনাটি যত দ্রুত এসেছিল, তত দ্রুতই বাতিল হয়ে যায়।
মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে পুনরায় ক্ষমতায় বসানোর স্বপ্নও সেখানেই মিলিয়ে যায়। পরবর্তী দিনগুলোতে মোসাদ তাদের মনোযোগ সরিয়ে নেয় ইরানের অভ্যন্তরে মোতায়েন করা ড্রোন এবং ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর সমন্বিত হামলার মাধ্যমে বাসিজ ঘাঁটি ও বিভিন্ন সড়ক চেকপয়েন্টে আঘাত হানার দিকে। ইসরায়েলের কর্মকর্তারা একে বলছিলেন, ‘দমনকারীদের দমন’ (suppressing the suppressors)। তাঁদের আশা ছিল, বাসিজ বাহিনীকে দুর্বল করা গেলে যুদ্ধ চলাকালে না হলেও যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর অন্তত সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পরিবেশ তৈরি হবে। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই সেই উদ্যোগও পরিত্যক্ত হয়।
পরিস্থিতির ভয়াবহতার সবচেয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত এসেছিল বার্নিয়ার নিজের আচরণ থেকেই। মোসাদপ্রধান দৈনিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন বৈঠকগুলোতে যাওয়াই বন্ধ করে দেন। যুদ্ধের প্রথম কয়েক দিন তিনি কিরিয়াতেই রাত কাটিয়েছিলেন। কিন্তু যখন তাঁর আর জানানোর মতো কিছু অবশিষ্ট ছিল না, তখন তিনি নিজের পরিবর্তে উপপ্রধানকে পাঠাতে শুরু করেন। কিছু বৈঠকে মোসাদের বিভিন্ন বিভাগের প্রধানেরাই সংস্থাটির প্রতিনিধিত্ব করেন। বৈঠকে উপস্থিত সবাই তখন বুঝে গিয়েছিলেন, সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।
মোসাদের পরিকল্পনার মধ্যে একধরনের প্রতারণামূলক বিভ্রম ছিল। একদিকে তাদের সাফল্য ছিল নিঃসন্দেহে চিত্তাকর্ষক। বার্নিয়া এবং তাঁর এজেন্টরা এমন এক সাবেক প্রেসিডেন্টকে, যাঁর প্রকৃত জনসমর্থন ছিল, ইসরায়েলের স্বার্থে কাজ করতে রাজি করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁরা স্থল অভিযানের জন্য একাধিক কুর্দি গোষ্ঠীর সহযোগিতা নিশ্চিত করেছিলেন, তাদের অস্ত্র দিয়েছিলেন এবং প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। তেহরানে তাঁরা সহযোগীদের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন, সারা দেশে ড্রোন মোতায়েন করেছিলেন এবং আজারবাইজানে একটি ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু চূড়ান্ত মুহূর্তে এসে কিছুই কাজ করেনি। সেই মহাপরিকল্পনার শেষ পরিণতিতে আকাশকুসুম কল্পনা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকেনি।
ইসরায়েলি নিরাপত্তা সংস্থার এক জ্যেষ্ঠ সূত্র বলেন, ‘এটি মোসাদের একটি ব্যর্থতা। আর এই ব্যর্থতার মূল কারণ ছিল এই বিশ্বাস যে, এত সীমিত সক্ষমতা নিয়ে তারা একটি শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করতে পারবে।’ অন্য সূত্রগুলোও একই ধরনের মত প্রকাশ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, বহু বছরের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির ফল হওয়ার কথা ছিল যে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার, সেটি বাস্তবে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই দাঁড় করানো হয়েছিল।
মোসাদের সাবেক পরিচালক তামির পারদো বলেন, ‘আমি যখন বিশেষ অপারেশনাল ইউনিটগুলোর একটি বিভাগের প্রধান ছিলাম, তখন সব সময়ই আমার একটি সক্রিয় কৌশলগত অপারেশন চলত। কোনো ফল পেতে আমরা দুই বছর ধরে কাজ করতাম। যদি আমাকে বলা হতো, ১০ বছর পরে হয়তো আমরা ইরানে কিছু গড়ে তুলতে পারব, তাহলে সেটি গ্রহণযোগ্য ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষকেই অস্ত্রের মুখোমুখি হয়ে লড়তে হয়, সাধারণ মানুষকেই খালি হাতে রাস্তায় নামতে হয়। ভবিষ্যতে ইরানে কী হবে আমি জানি না, কিন্তু যে-ই দাবি করে যে তারা এই শাসনব্যবস্থার পতন ঘটিয়েছে, সে আসলে জানেই না সে কী বলছে।’
মোসাদের সাবেক উপপরিচালক এবং পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা কমিটির সদস্য রাম বেন বারাক বলেন, ‘মাত্র কয়েক মাসে শাসন পরিবর্তনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায় না। আমার হিসাব ছিল, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অন্তত এক দশক লাগবে। বিকল্প নেতৃত্ব চিহ্নিত করা, একজন নেতা নির্বাচন করা, লোক নিয়োগ করা, অস্ত্র ঢোকানো...এগুলো বিপুল পরিমাণ কাজ, যার প্রতিটি ধাপেই অসংখ্য ব্যর্থতার সম্ভাবনা থাকে।’
মোসাদের আরেকটি সূত্র বলেন, ‘এটি এমন একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ, যার জন্য অন্তত ১৫ বছর সময় প্রয়োজন। এটি এমন একটি প্রকল্প, যা একজন মোসাদ পরিচালক থেকে পরবর্তী পরিচালকের হাতে হস্তান্তরিত হওয়ার কথা। এভাবে তড়িঘড়ি করে এটি করা সম্ভব নয়। মোসাদ একটি বিশাল জাহাজের মতো, আর এমন জাহাজের গতিপথ বদলাতে সময় লাগে।’
ইসরায়েলের চতুর্থ আরেকটি সূত্র বলেন, ‘এ ধরনের একটি অপারেশনের জন্য অসাধারণ মাত্রার প্রচেষ্টা দরকার।’ মোসাদের একটি বিভাগের সাবেক এই প্রধান বলেন, ‘আপনাকে একটি বিশাল অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। আর সেটি গড়ে তোলার পরও সৎভাবে স্বীকার করতে হবে যে সাফল্যের কোনো নিশ্চয়তা নেই।’
পরিকল্পনার সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্রের মতে, মূল সমস্যা ছিল প্রতিটি ধাপ আগের ধাপের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ছিল। তিনি বলেন, ‘এই পরিকল্পনার ভিত্তিপ্রস্তর ছিল কুর্দি অভিযান। আর সেটি ছাড়া সামনে এগোনো সম্ভব ছিল না। একটি ভালো অপারেশন এভাবে তৈরি হয় না, যেখানে পুরো পরিকল্পনার উত্থান-পতন একটি মাত্র কড়ির ওপর নির্ভর করে।’ সূত্রগুলোর মতে, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল ঔদ্ধত্য। যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল যেকোনো মূল্যে লক্ষ্য অর্জনের অন্ধ সংকল্প। সেই সংকল্প এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে ঝুঁকিগুলোই আর তাঁদের চোখে পড়ছিল না। যেমন নেতানিয়াহু তাঁর পূর্বসূরিদের সঙ্গে পরামর্শ করেননি এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সতর্কবার্তাকেও গুরুত্ব দেননি, তেমনি মোসাদের নেতৃত্বও প্রায় একইভাবে আচরণ করেছিল।
ইসরায়েলি একটি নিরাপত্তা সংস্থার এক সূত্র বলেন, ‘প্রস্তুতির মাঝামাঝি সময়ে মোসাদ থেকে আমাকে ফোন করে প্রভাব বিস্তার বিভাগের প্রধানের সঙ্গে দেখা করতে বলা হয়। তিনিই এই পরিকল্পনার প্রধান চালিকাশক্তি ছিলেন। আমি বলেছিলাম, আনন্দের সঙ্গেই আসব। আমি গিয়েছিলাম, কুশল বিনিময়ও হলো। কিন্তু খুব দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে গেল, তিনি মনে করেন তাঁর কোনো সাহায্যের প্রয়োজন নেই, কী করতে হবে তা তিনি আগেই জানেন। আমি তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে এলাম।’
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘২০২৫ সালের শেষ দিকে আমাকে মোসাদে প্রভাব বিস্তার বিভাগের প্রধানের সঙ্গে একটি বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই বুঝে যাই, এই আলোচনার কোনো অর্থ নেই। কয়েক মিনিট পর আমি উঠে চলে আসি।’ নিরাপত্তা সংস্থার আরেক কর্মকর্তা প্রশ্ন তোলেন, ‘যাঁদের উঠে দাঁড়িয়ে বলা উচিত ছিল যে—এসব সম্পূর্ণ অর্থহীন, তাঁরা সবাই কোথায় ছিলেন?’ তিনি বলেন, ‘পেশাদারদের বলা উচিত ছিল, 'যথেষ্ট হয়েছে। থামুন। আপনারা এমন সব ধারণা দাঁড় করাচ্ছেন, যার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। এত মানুষ ছিল, অথচ কেউই বলেনি যে—সম্রাট আসলে নগ্ন?’
বর্তমানে চলমান বিভিন্ন আলোচনায় কেউ কেউ মনে করেন, গোটা পরিকল্পনাটিই ছিল প্রথম সারির একটি কৌশলগত ভুল। আরেক সূত্র বলেন, ‘আপনারা এক কল্পনার পেছনে ছুটেছেন এবং ইরানিদের হাতে বিজয়ের একটি বর্ণনা তুলে দিয়েছেন। এই ব্যর্থতার জন্য মোসাদের বড় ধরনের দায় রয়েছে। কারণ তারা এমন ধারণা তৈরি করেছিল যে—পরিকল্পনাটি সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। আর এটি নেতানিয়াহুরও ব্যর্থতা। শুরু থেকেই তিনি এই পরিকল্পনার পক্ষে ছিলেন এবং বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নেই বলে তাঁকে জানানো হলেও তিনি এগিয়ে গিয়েছিলেন।’
তবে অন্যরা মনে করেন, এখনই চূড়ান্ত রায় দেওয়ার সময় আসেনি। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত না হলেও বৃহত্তর সামরিক ও কৌশলগত অভিযানের ফলাফল বোঝা যেতে এখনো বহু বছর লেগে যেতে পারে। তাঁদের মতে, দ্বিতীয় লেবানন যুদ্ধের পরও ইসরায়েল তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে বেরিয়েছিল, কিন্তু পরে টানা ১৭ বছর তুলনামূলক শান্তি উপভোগ করেছিল।
বার্নিয়া নিজেও এখনো বিশ্বাস করেন যে—ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন অবশ্যম্ভাবী, এবং তাঁর পূর্বাভাস, এটি আগামী এক থেকে তিন বছরের মধ্যেই ঘটবে। তবে তিনি এটিও স্বীকার করেন যে, যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এমন একটি সমঝোতা হয় যার ফলে ইরানের জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত হয় এবং নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়, তাহলে শাসনব্যবস্থাটি টিকে থাকার সম্ভাবনা খুবই বেশি। আর শুধু টিকেই থাকবে না। সেটি হবে এমন এক শাসনব্যবস্থা, যা ব্যাপক গণবিক্ষোভ মোকাবিলা করেছে, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর রাষ্ট্রের হামলা প্রতিরোধ করেছে এবং হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টির অভিযানের সামনেও নতি স্বীকার করেনি। অর্থ প্রবাহিত হবে। প্রতিরক্ষা উৎপাদন দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাবে। আর নেতানিয়াহুর এই জুয়া শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের জন্যও এক বড় মূল্য ডেকে আনতে পারে।
হারেৎজ থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ব্যাখ্যাগত বিরোধ আবারও দুই দেশকে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ অ্যালান আইয়ার। তাঁর মতে, এই বিরোধের সমাধান ছাড়া পারমাণবিক চুক্তিতে অগ্রগতি সম্ভব নয়। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র...
১ দিন আগে
ইরানের শাসকগোষ্ঠীর কাছে হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাটা ট্রাম্প প্রশাসনের দেওয়া হাজার কোটি ডলারের নিষেধাজ্ঞা মওকুফের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর কারণ হলো—তেহরান আসলে একটি দীর্ঘমেয়াদি খেলা খেলছে। ইরানি কর্মকর্তাদের বিশ্বাস, গত ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুদ্ধে...
২ দিন আগে
ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তপ্ত সময় পার করছে ইউরোপের দেশ ফ্রান্স। তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁইছুঁই হওয়ার পর জলবায়ু পরিবর্তনের চরম বাস্তবতায় দীর্ঘদিনের রক্ষণশীল অবস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে দেশটি। বিশেষ করে ঘরবাড়ি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ঠান্ডা রাখার জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র...
২ দিন আগে
বাংলাদেশের পদ্মা নদীর তীরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চারটি বিশাল আইভরি বা কুলিং টাওয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলতে ব্যস্ত স্থানীয় পর্যটকেরা। ২০২৮ সালে পুরোপুরি সম্পন্ন হওয়ার পর রূপপুর কেন্দ্রে রাশিয়ার সহায়তায় নির্মিত দুটি চুল্লি দেশের মোট বিদ্যুতের প্রায়...
২ দিন আগে