Ajker Patrika

স্যাটেলাইট সেবায় যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া আধিপত্য কেড়ে নিল ইরান যুদ্ধ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ২১: ১০
স্যাটেলাইট সেবায় যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া আধিপত্য কেড়ে নিল ইরান যুদ্ধ
পৃথিবীর কক্ষপথে একটি স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহ। ছবি: দ্য ন্যাশনাল

ইরান যুদ্ধ বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে, মহাকাশভিত্তিক তথ্য নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের প্রভাব আর আগের মতো অটুট নেই। সাম্প্রতিক এই সংঘাত শুধু সামরিক শক্তির লড়াই নয়, বরং তথ্য ও নজরদারির ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়েও এক নীরব প্রতিযোগিতা চলছে পৃথিবীর কক্ষপথে।

কয়েক দশক ধরে ‘প্ল্যানেট ল্যাবস’ ও ‘ভ্যান্টর’-এর মতো মার্কিন স্যাটেলাইট কোম্পানিগুলো যুদ্ধক্ষেত্র, পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি এবং মানবিক সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিত্র সরবরাহ করে এসেছে। তাদের সরবরাহ করা উচ্চ রেজল্যুশনের ছবি সাংবাদিক, গবেষক, মানবাধিকার সংস্থা ও সামরিক বিশ্লেষকদের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। সেনা চলাচল পর্যবেক্ষণ, বোমা হামলার প্রমাণ সংগ্রহ কিংবা ধ্বংসযজ্ঞ উন্মোচনে বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট ইমেজিং এক নতুন যুগের সূচনা করেছে।

প্রযুক্তিগত অগ্রগামিতা, উৎক্ষেপণ সুবিধা ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর কারণে এত দিন এই খাতে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় একচেটিয়া আধিপত্য বজায় রেখেছিল। কিন্তু ইরান যুদ্ধ সেই আধিপত্যের সীমাবদ্ধতাকে সামনে এনে দিয়েছে।

২০২৬ সালের মার্চে প্ল্যানেট ল্যাবস মধ্যপ্রাচ্যের স্যাটেলাইট ছবি প্রকাশে বিলম্ব চার দিন থেকে বাড়িয়ে ১৪ দিন করে। পরে তারা ইরান ও আশপাশের সংঘাতপূর্ণ এলাকার সাম্প্রতিক ছবি সরবরাহ পুরোপুরি সীমিত করে। একইভাবে ভ্যান্টরও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অঞ্চলের ছবির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। কোম্পানিগুলোর দাবি—এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যাতে সংবেদনশীল তথ্য যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা না হয়।

এই ঘটনাগুলো দেখিয়েছে, বাণিজ্যিক হলেও এসব প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক বাস্তবতার বাইরে নয়। মার্কিন আইনের অধীনে লাইসেন্সপ্রাপ্ত হওয়ায় ওয়াশিংটন চাইলে জাতীয় নিরাপত্তা বা পররাষ্ট্রনীতির স্বার্থে এসব তথ্যের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে সব তথ্যের মালিক হতে হয় না, বরং নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর মাধ্যমেই তারা প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

তবে যখন এই প্রবেশাধিকার সীমিত হয়ে যায়, তখন ব্যবহারকারীরা বিকল্প খুঁজতে শুরু করেন। এভাবে বিকল্প উৎস হিসেবে ইউরোপের ‘ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি’ ও ‘এয়ারবাস ডিফেন্স অ্যান্ড স্পেস’-এর মতো সংস্থাগুলো আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। কারণ, তারা মার্কিন যুদ্ধকালীন বিধিনিষেধের আওতায় পড়ে না।

অন্যদিকে চীনের স্যাটেলাইটশিল্পও দ্রুত এগিয়ে আসছে। ‘চেং গুয়াং স্যাটেলাইট টেকনোলজি’ ও ‘মিজার ভিশন’-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অমার্কিন বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। বিশ্লেষকদের মতে, এখন চীন পৃথিবীর যেকোনো স্থানের উচ্চ রেজল্যুশনের ছবি দিনে একাধিকবার তুলতে সক্ষম।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে কোনো একক দেশ আর মহাকাশভিত্তিক বাণিজ্যিক তথ্য পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। একসময় যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে এই ক্ষেত্র দখলে রেখেছিল, পরে ইউরোপ যুক্ত হয়। এখন চীনসহ আরও অনেক দেশ এই প্রতিযোগিতায় শক্ত অবস্থান তৈরি করছে।

তবে এই পরিবর্তন ওয়াশিংটনের জন্য উদ্বেগের কারণ। একটি ফাঁস হওয়া মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নথিতে মিত্রদেশগুলোকে চীনা স্যাটেলাইট সেবার ওপর নির্ভর না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কারণ, এতে সংবেদনশীল তথ্য বেইজিংয়ের হাতে পৌঁছাতে পারে।

সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে—তথ্য বাণিজ্যিক হলেও তার প্রবেশাধিকার এখনো রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত। তবে দ্রুত বাড়তে থাকা স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার ফলে ভবিষ্যতে এই নিয়ন্ত্রণ আরও ছড়িয়ে পড়বে এবং কোনো একক শক্তির পক্ষে একে একচেটিয়াভাবে ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত