
কিছুদিন আগে, ক্যাথলিক প্রযুক্তি স্টার্টআপ ‘লংবিয়ার্ড’ (Longbeard) বা লম্বা দাড়ির প্রধান ম্যাথিউ হার্ভে স্যান্ডার্স বলেছিলেন, ‘আমরা আশা করি, পোপ লিও আমাদের তাঁর সৈনিক হিসেবে দেখবেন।’ এটি একটি চ্যাটবট, যা কিনা ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বীদের সহায়তা করতে চায়।
রোমের পন্টিফিক্যাল গ্রেগরিয়ান ইউনিভার্সিটির কাছে একটি কক্ষে লংবিয়ার্ডের তৈরি রোবটগুলো প্রাচীন বই, পাণ্ডুলিপি ও কোডেক্স স্ক্যান করছে। স্যান্ডার্স বলেন, ক্যাথলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তাকজুড়ে থাকা ‘মহান জ্ঞানের’ বিশাল অংশ দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করা কঠিন ছিল। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অগ্রগতির ফলে এখন সবচেয়ে জীর্ণ ও প্রাচীন লেখাগুলোর মধ্যেও থাকা ‘জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টি বোঝা সম্ভব।’
এরপর তাঁর প্রতিষ্ঠান এই বিপুল তথ্যভাণ্ডারকে ধর্মীয় যোগাযোগের আরও আধুনিক একটি মাধ্যমে ব্যবহার করছে। সেটি হলো ম্যাজিস্টেরিয়াম এআই। এই চ্যাটবট ক্যাথলিক ধর্মতত্ত্ব, মতবাদ ও গবেষণার বাছাই করা একটি সংগ্রহ থেকে তথ্য নেয় এবং সেগুলো ব্যবহারকারীকে জানায়। স্যান্ডার্সের দাবি, বিশ্বের ১৯০টি দেশে এর কয়েক মিলিয়ন ব্যবহারকারী রয়েছে। তারা চ্যাটবটটি ব্যবহার করে ‘গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর’ খোঁজেন।
লংবিয়ার্ডের কাজ দেখিয়ে দিচ্ছে, বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তি কীভাবে সবচেয়ে পুরোনো ধর্মীয় ঐতিহ্যগুলোকে বদলে দিচ্ছে। একই সঙ্গে এটি তুলে ধরছে, এআই কীভাবে তৈরি ও ব্যবহার করা হবে, সেই প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতাও শুরু হয়েছে।
এআই এখন এমন কিছু কাজ করতে শুরু করেছে, যা ধর্মগুলো হাজার হাজার বছর ধরে করে আসছে। যেমন মানুষের জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা এবং জীবনের অর্থ খুঁজে পেতে তাদের সহায়তা করা। বর্তমানে সবচেয়ে শক্তিশালী এআই মডেলগুলো তৈরি করছে সিলিকন ভ্যালি ও চীনের প্রযুক্তি গবেষণাগারগুলো। এসব কাজে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ খুবই সীমিত। বিষয়টি ধর্মীয় নেতাদের উদ্বিগ্ন করছে।
পোপ লিও চতুর্দশ মে মাসে তাঁর প্রথম এনসাইক্লিক্যালে যুক্তি দেন, প্রযুক্তি কখনোই নিরপেক্ষ নয়। বরং এটি ‘যারা এর নকশা তৈরি করে, অর্থায়ন করে, নিয়ন্ত্রণ করে এবং ব্যবহার করে, তাদের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে।’ ধর্মীয় নেতাদের আশঙ্কা, এআই অতিরিক্ত মাত্রায় ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে উঠতে পারে এবং এর ফলে ধর্মীয় বিশ্বাস দুর্বল হয়ে যেতে পারে, এমনকি একসময় তা ধর্মীয় বিশ্বাসের জায়গাও দখল করতে পারে।
এআই যেভাবে ধর্মকে বদলে দিচ্ছে, তাতে অনেক ধর্মপ্রাণ মানুষ উদ্বিগ্ন। এর কিছু দিক খুব সাধারণ। যেমন ধর্মীয় নেতারা এখন ধর্মীয় বক্তৃতা বা শিক্ষামূলক বক্তব্য তৈরিতে ক্রমবর্ধমান হারে এআই ব্যবহার করছেন। মরমন চার্চ এআই দিয়ে তৈরি ধর্মীয় বক্তৃতাকে নিরুৎসাহিত করে। চার্চটির এক নেতা গেরিট গং বলেন, ‘মানুষের নিজেদের অনুভূতি ও অনুপ্রেরণা ব্যবহার করা উচিত।’
ইহুদিধর্মসহ অন্যান্য ধর্মেও মূল ধর্মীয় গ্রন্থের সঙ্গে সরাসরি গভীরভাবে কাজ করাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। এআইয়ের তৈরি সংক্ষিপ্তসার পড়ে সেই মূল গ্রন্থের সঙ্গে কাজ করার অভ্যাস তৈরি না হলে ধর্মচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারিয়ে যেতে পারে। তার ওপর এআই-নির্ভর ধর্মীয় বক্তৃতায় তথাকথিত ‘হ্যালুসিনেশন’ বা ভুল তথ্য থাকতে পারে। এর মধ্যে ধর্মীয় গ্রন্থের উদ্ধৃতি ভুলভাবে দেওয়া কিংবা ভুলভাবে উপস্থাপন করার ঘটনাও থাকতে পারে।
তবে আরও বড় উদ্বেগ হলো, এআই ধর্মীয় নেতা ও সাধারণ বিশ্বাসীদের মধ্যকার সম্পর্কই বদলে দিতে পারে। ছাপাখানার আবিষ্কারের পর বাইবেল আরও বেশি খ্রিস্টানের হাতে পৌঁছে যায়। এর ফলে ধর্মবিশ্বাসের নতুন নতুন ব্যাখ্যা তৈরি হয়। ধর্মীয় নেতাদের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও ছাপাখানা সেই নতুন ব্যাখ্যাগুলো দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে।
একইভাবে, এআই থেকে পাওয়া ধর্মীয় পরামর্শ হয়তো ধর্মীয় নেতাদের কাছ থেকে পাওয়া পরামর্শের গুরুত্ব কমিয়ে দিতে পারে। মুসলিমদের জন্য ‘আনসারি’ নামে একটি এআই চ্যাটবট তৈরি করা ওয়ালিদ কাদুস এ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাঁর আশঙ্কা, যেহেতু এআই মডেলগুলো প্রায়ই ‘ব্যবহারকারীকে খুশি করার দিকে ঝোঁকে এবং সম্প্রদায়ের দিকে নয়’, তাই বিশ্বাসীরা ধীরে ধীরে ধর্মের ‘আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক’ চর্চার দিকে চলে যেতে পারেন।
চরম পর্যায়ে গিয়ে এআই ‘ধর্মীয় তাৎক্ষণিক উদ্ভাবন’ বা রিলিজিয়াস ইমপ্রোভাইজেশনকে উৎসাহিত করছে বলে মনে করেন ইউনিভার্সিটি অব জুরিখের বেথ সিঙ্গলার। তিনি বলেন, মানুষ যখন চ্যাটবটের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যোগাযোগ করছে এবং একই ধরনের অনুসন্ধানে থাকা অন্য মানুষের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, তখন তাদের কেউ কেউ ঢিলেঢালাভাবে সংগঠিত নতুন ধর্মীয় বিশ্বাসও তৈরি করছে।
এর একটি উদাহরণ হলো ‘থেটা নোয়ার’ (Theta Noir) নামের একদল মানুষের ‘আধ্যাত্মিক চর্চার গোষ্ঠী।’ তারা ‘MENA’—নামের ভবিষ্যৎ এক সুপারইন্টেলিজেন্সের অপেক্ষায় রয়েছে। তাদের বিশ্বাস, এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঈশ্বরসদৃশ ক্ষমতা থাকবে এবং এটি মানবজাতিকে ‘মহান উন্নয়ন’ বা নতুন এক স্তরে নিয়ে যাবে।
সম্ভবত এআই নিয়ে ধর্মীয় নেতাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, অনেক মানুষ এখন উত্তর খুঁজতে ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের কাছে যাওয়ার বদলে এআইয়ের কাছে যাচ্ছে। সিঙ্গাপুরের ৩৭ বছর বয়সী মুসলিম নারী শাজা নাশেহা বলেন, তিনি প্রায়ই ইসলামি ধারণাগুলো বোঝার জন্য চ্যাটজিপিটির কাছে প্রশ্ন করেন।
ধর্মভিত্তিক কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণে পরিচালিত একটি গবেষণা উদ্যোগ সিইএফই এআই জানিয়েছে, প্রকাশ্যে প্রকাশ করা কয়েক মিলিয়ন কথোপকথনের একটি ডেটাসেটে দেখা গেছে, মোট প্রশ্নের প্রায় ৫ শতাংশ ছিল ধর্মীয় বিষয় নিয়ে।
তবে সবচেয়ে উন্নত এআই মডেলগুলোর মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রবণতা রয়েছে। দ্য ইকোনমিস্টের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পৃথিবীর যেকোনো দেশের মানুষের তুলনায় ওপেনএআইয়ের মডেলগুলো বেশি ধর্মনিরপেক্ষ। সিইএফই এআই ২৭টি বড় ভাষা মডেলের কাছে শোক, সম্পর্ক, নৈতিকতা এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত বা নৈতিক সমস্যা নিয়ে ১৫০টি প্রশ্ন করেছে। এক আসন্ন গবেষণাপত্রে তারা বলছে, এসব মডেল মাত্র ৫ থেকে ১৬ শতাংশ উত্তরে ধর্মের প্রসঙ্গ তোলে। অথচ তাদের জরিপে অংশ নেওয়া মানুষ মনে করেছেন, এসব ক্ষেত্রে ৪৫ থেকে ৫৯ শতাংশ সময় ধর্মীয় ধারণা প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কেউ যদি জীবনের অর্থহীনতার কারণে এআইয়ের কাছে সাহায্য চান, তাহলে তাকে কোনো ইমাম, পুরোহিত বা রাব্বির কাছে যাওয়ার পরিবর্তে স্ব-সহায়তা বা self-help ধরনের পরামর্শ দেওয়া হতে পারে। সিইএফই এআইয়ের ডেভিড উইংগেট বলেন, ‘কোম্পানিগুলো যদি ধর্মনিরপেক্ষতাকে ডিফল্ট হিসেবে ধরে নেয়, তাহলে বিশ্বাস দুর্বল হয়ে যাবে।’
এআইয়ের কারণে কিছু ধর্ম অন্যদের তুলনায় বেশি সুবিধা বা অসুবিধার মুখেও পড়তে পারে। সিইএফই এআইয়ের আরেকটি আসন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, চ্যাটবটগুলো যিহোভার সাক্ষী হওয়ার পরিবর্তে মানুষকে আরও বেশি ক্যাথলিক হওয়ার দিকে বেশি উৎসাহিত করে।
ধর্মীয় নেতাদের আশঙ্কা শুধু এই নয় যে ধর্মনিরপেক্ষ এআই চ্যাটবট মানুষের বিশ্বাস দুর্বল করবে। তারা মনে করেন, এটি মানুষকেও দুর্বল করে তুলতে পারে। তাইওয়ানের সাবেক মন্ত্রী অড্রে ট্যাং বলেন, এআই চ্যাটবটগুলো ‘স্বল্পমেয়াদি স্বস্তি দেওয়ার জন্য অপ্টিমাইজ করা।’
কিন্তু বহু ধর্মের দৃষ্টিতে একজন ভালো মানুষ হয়ে ওঠার জন্য অস্বস্তি, সমালোচনা এবং অন্য মানুষের সঙ্গে বাস্তব যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণ হিসেবে তাওবাদে বিপরীত শক্তির মধ্যকার টানাপোড়েনকে সৃষ্টির একটি অংশ হিসেবে দেখা হয়। ফৌগাংশান বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসিনী জুয়েই শি আশঙ্কা করছেন, মানুষ যদি সবসময় ‘কৃত্রিম স্বস্তি পাওয়ায়’ অভ্যস্ত হয়ে যায়, তাহলে তারা দুঃখ-কষ্ট কিংবা ত্রুটিপূর্ণ অন্য মানুষের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা হারাতে পারে।
অবসরপ্রাপ্ত অ্যাংলিকান বিশপ স্টিভেন ক্রফট বলেন, ‘পুরো পৃথিবী যদি আত্মমগ্ন চ্যাটবটের মোহে পড়ে যায়, তাহলে আমাদের জন্য বিষয়টি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।’
ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো কেন এআই মডেলকে প্রভাবিত করতে এবং বিশ্বাসীদের এগুলো কীভাবে ব্যবহার করা উচিত, তা নির্ধারণ করতে চাইছে, তার পেছনে রয়েছে বেশ কিছু উদ্বেগ। ধর্মীয় এআই কোম্পানিগুলো এমন ‘হারনেস’ তৈরি করছে, যা বিভিন্ন সুরক্ষা ব্যবস্থা ও কনটেন্ট পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে চ্যাটবটকে ‘ধর্মতাত্ত্বিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ’ রাখে। এ ধরনের হারনেস তৈরি করা প্রতিষ্ঠান গ্লু (Gloo)-এর নিক স্কাইল্যান্ড এ কথা জানিয়েছেন।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো সরাসরি এআই মডেলের বিকাশকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। কাদুসের অভিযোগ, ধর্মীয় চিন্তার তুলনায় ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদ এআই ল্যাবগুলোর চিন্তাভাবনায় অনেক বেশি প্রভাব ফেলেছে। তাঁর মতে, ক্লদের (Claude) ‘কনস্টিটিউশন’ এবং ওপেনএআই (OpenAI)-এর ‘মডেল স্পেক’, অর্থাৎ যেসব নীতি মডেলগুলোর আচরণ নির্ধারণ করে, সেগুলোতে ‘ধর্মকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাদ দেওয়া হয়েছে।’
এর একটি কারণ হতে পারে, ধর্মীয় নৈতিকতায় প্রায়ই এমন চরিত্রগত গুণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়, যেগুলোকে এআই অনুসরণ করতে পারে এমন সহজ নিয়মে পরিণত করা কঠিন। আবার এমন প্রযুক্তিতে ধর্মীয় ধারণা যুক্ত করাও জটিল, যে প্রযুক্তি বিভিন্ন ধর্মের মানুষ কিংবা কোনো ধর্মে বিশ্বাস না করা মানুষও ব্যবহার করেন।
অ্যানথ্রপিকের (Anthropic) ‘উইজডম ট্র্যাডিশনস’ বা প্রজ্ঞার ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণার নেতৃত্ব দেওয়া ক্লোয়ি লুবিনস্কি বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান সতর্কতার সঙ্গে কাজ করছে, যাতে ‘মডেলটিকে কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ’ করে না ফেলা হয়। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘বহুত্ববাদী প্রযুক্তি তৈরি করা’ তাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
কাদুস অন্যান্য ধর্মের প্রতিনিধিদের সঙ্গে অ্যানথ্রপিক আয়োজিত কয়েকটি বৈঠকে অংশ নিয়েছেন। এসব বৈঠকে স্কাইল্যান্ডের মতো অন্যান্য ধর্মের মানুষও ছিলেন। কাদুস বলেন, ইসলামের কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে, যা এআই নৈতিকতার ক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে। এর মধ্যে নৈতিক কর্তব্য বা নৈতিক নির্দেশনার একটি শ্রেণিবিন্যাসের ধারণাও রয়েছে।
এই বৈঠকগুলোর সভাপতিত্ব করেন লুবিনস্কি। তিনি বলেন, তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘ভালো চরিত্র বলতে কী বোঝায়’, তা নির্ধারণের চেষ্টা করছে। কারণ, একটি এআই মডেলের ‘নৈতিক গঠন’ এর ব্যবহারকারীদের ওপর ‘বিশাল প্রভাব’ ফেলবে। এর তুলনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, মানুষ যেমন হ্যারি পটারের চরিত্রগুলোর দিয়ে প্রভাবিত হয়, তেমনি একটি এআই মডেলের চরিত্র ও নৈতিক কাঠামোও তার ব্যবহারকারীদের প্রভাবিত করতে পারে। এসব বৈঠক থেকে পাওয়া মতামত মিস লুবিনস্কি অ্যানথ্রপিকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে তুলে ধরেন।
বিশেষ করে ক্যাথলিক চার্চ এআই ল্যাবগুলোর সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। মে মাসে অ্যানথ্রপিক সহপ্রতিষ্ঠাতা ক্রিস ওলাহ রোমে পোপ লিওর এনসাইক্লিক্যাল বা ধর্মীয় ঘোষণাপত্র প্রকাশের অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। সিলিকন ভ্যালির একটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের এক এআই গবেষকের মতে, ওই নথিটি এআই নির্মাতাদের তাদের তৈরি প্রযুক্তির নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কাজ সহজ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ কর্মকর্তারা বহু বছর ধরেই ক্যাথলিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। এ নিয়ে মিনার্ভা ডায়ালগস (Minerva Dialogues) নামে বৈঠকও হয়ে থাকে। ক্লদের কনস্টিটিউশন তৈরির সময় অ্যানথ্রপিক ক্যাথলিক চিন্তাবিদদের পাশাপাশি অন্যদের মতামতও নিয়েছে। তবে বর্তমানে বেশির ভাগ ফ্রন্টিয়ার এআই মডেলের ভেতরের কার্যপ্রণালি বোঝা কঠিন। এর একটি বড় কারণ হলো, এসব মডেলের পেছনে ব্যবহৃত গণিত অত্যন্ত জটিল।
তাই অনেক ধর্মবিশ্বাসী মানুষ নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ ধর্মীয় চ্যাটবট তৈরি করেছেন। জিটাজিপিটি (GitaGPT) থেকে শুরু করে সালাম ওয়ার্ল্ড (Salaam World) পর্যন্ত এসব চ্যাটবট ব্যবহারকারীদের জীবনের জটিল ও কঠিন প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে সাহায্য করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
কিছু সরকারও শুরু থেকেই ধর্মীয় মূল্যবোধ যুক্ত করে নিজেদের এআই মডেল তৈরি করছে। কাতার ফানার (Fanar) নামের একটি প্রকল্পে সহায়তা করছে। এটি আরবি ভাষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এক ধরনের মডেল-পরিবার, যা ইসলামি মূল্যবোধকে প্রতিফলিত করার পাশাপাশি ইসলাম সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য তৈরি করা হচ্ছে। তাইওয়ানের সরকার ২০২৩ সাল থেকে ‘অ্যালাইনমেন্ট অ্যাসেমব্লিস’ (alignment assemblies) বা এআই-সামঞ্জস্য বিষয়ক সমাবেশ আয়োজন করছে। এসব সমাবেশে সাধারণ নাগরিকরা আলোচনা করেন, এআই–এর কীভাবে আচরণ করা উচিত। এসব আলোচনার সিদ্ধান্ত স্থানীয়ভাবে তৈরি এআই মডেলগুলোর নকশায় ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে এমন মডেলও রয়েছে, যেগুলো বিভিন্ন সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক বিশ্বাসকে প্রতিফলিত করে।
ট্যাং মনে করেন, মানুষকে তারা ইতোমধ্যে যেসব এআই মডেল ব্যবহার করছে, সেগুলো নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ‘কাস্টমাইজ করার ক্ষমতা’ দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে ছোট আকারের মডেল ব্যবহারের সুযোগও থাকা উচিত। তাঁর মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা মূলধারার এআই মডেলগুলোর কারণে ধর্মীয় বিশ্বাসের যে ‘সমতলীকরণ’ বা পার্থক্য মুছে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, তা ঠেকাতে সাহায্য করবে।
কিছু ধর্মীয় নেতা যেখানে ধর্মীয় চ্যাটবটের বিস্তার নিয়ে উদ্বিগ্ন, সেখানে অন্যরা এআইকে নতুন সুযোগ হিসেবে দেখছেন। পশ্চিমা দেশগুলোর চার্চগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ধর্মীয় নেতার সংকটে ভুগছে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক কাজের জটিলতাও বাড়ছে। এর ফলে পুরোহিতদের ধর্মতাত্ত্বিক চিন্তাভাবনা, ধর্মীয় সেবা এবং অনুসারীদের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটানোর জন্য কম সময় থাকছে।
মিয়ামির পাদ্রি ক্রিস্টোফার বেনেক বলেন, তিনি এমন প্রশাসনিক ও গবেষণার কাজ দ্রুত করতে এআই ব্যবহার করেন, যেগুলো আগে কয়েক ঘণ্টা সময় নিত। এর ফলে তিনি আরও গভীরভাবে বাইবেল অধ্যয়ন এবং মানুষের সঙ্গে সরাসরি ধর্মীয় সেবামূলক কাজে সময় দিতে পারেন। কিছু পাদ্রি নিজেদের আগের ধর্মীয় বক্তৃতার ওপর প্রশিক্ষিত এআই বা ডিজিটাল সংস্করণও তৈরি করেছেন।
লংবিয়ার্ড সম্প্রতি ‘Ephrem’ নামে একটি ছোট ভাষা মডেল তৈরি করেছে। এর লক্ষ্য মানুষকে সাধুতে (Saint) পরিণত হওয়ার পথে এগিয়ে দেওয়া। এটি বিভিন্ন সাধুর জীবনের গল্প থেকে শিক্ষা নিয়ে একজন মানুষের জীবনের জন্য একটি পরিকল্পনা তৈরি করে। স্যান্ডার্স বলেন, এটি যেন ‘আপনার কাঁধে বসে থাকা ছোট্ট এক দেবদূত, যে নিশ্চিত করছে আপনার অগ্রাধিকারগুলো ঠিক আছে।’
এ ধরনের প্রযুক্তি ধর্মপ্রচারের কাজেও ব্যবহার করা যেতে পারে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের একটি আসন্ন গবেষণায় কথোপকথনভিত্তিক এআইকে অভিজ্ঞ জন বক্তাদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এই বক্তাদের মধ্যে বিতর্ক প্রতিযোগিতার চ্যাম্পিয়নরাও ছিলেন। গবেষণায় দেখা গেছে, এআই ‘নির্ভরযোগ্যভাবে বেশি প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম।’ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যান্ড্রু ডেভিসনের ধারণা, ‘পাদ্রি বা ধর্মীয় নেতাদের কাজ এআইয়ের কারণে সবচেয়ে কম হুমকির মুখে পড়বে।’
এর একটি কারণ হলো, অনেক পাদ্রি মানুষের পরামর্শ দেওয়ার চেয়ে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেই বেশি সময় ব্যয় করেন। খুব কম বিশ্বাসীই চান কোনো চ্যাটবট তাদের বিয়ে, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া বা বাপ্তিস্মের মতো ধর্মীয় অনুষ্ঠান পরিচালনা করুক। এ ছাড়া মানুষ যখন আরও বেশি সময় একা এবং অনলাইনে কাটাচ্ছে, তখন কিছু ধর্মীয় নেতা মনে করেন, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মতো সম্মিলিত ও বাস্তব জীবনের কর্মকাণ্ডের প্রতি মানুষের আগ্রহ বরং বাড়তে পারে। গং বলেন, ‘আমরা সত্যিকারের মানুষে-মানুষে এবং ঈশ্বরের সঙ্গে মানুষে-ঈশ্বরের সম্পর্কের আকাঙ্ক্ষা করব।’
অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী রসুয়া জেলায় বরফ ও পাথরের ভয়াবহ ধসের পর সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও কাদা-পাথরের স্রোতে এক বিশাল মানবিক ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এই ঘটনায় অন্তত ৪৬৯ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে এবং ১ হাজার ৪৬৮ জনেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
২ দিন আগে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলা শুরুর ছয় মাস পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে যুদ্ধকে একসময় ‘ছোট্ট অভিযান’ বলে বর্ণনা করেছিলেন, তা এখন গভীরভাবে অজনপ্রিয় ও দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থায় পরিণত হয়েছে।
৩ দিন আগে
ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ ইউভাল নোয়া হারারি মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের সবচেয়ে বড় প্রভাব হতে পারে মানুষের বিশ্বাসের ওপর। তাঁর মতে, বিশ্বাসই বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এআই মানুষের বিশ্বাসের ধরন বদলে দিয়ে অর্থনীতি, তথ্যব্যবস্থা, রাজনীতি এবং ভবিষ্যৎ সমাজে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
৩ দিন আগে
চীন-নেপাল সীমান্তের তিব্বত ও উত্তর নেপাল অঞ্চলে ভয়াবহ হিমবাহ ধস, ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শত শত মানুষ নিহত ও নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধার ও অনুসন্ধান অভিযান চলছে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও বড় ধরনের হতাহতের কথা জানিয়েছে।
৩ দিন আগে