
সামরিন আইয়ুব প্রথমে ভিডিওটি দেখে হতভম্ব হয়ে যান। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের এই ফ্রিল্যান্স মডেল গত বছর ফোনে দিল্লিতে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের স্মৃতি ঘেঁটে দেখছিলেন। তখনই এক বন্ধু ইনস্টাগ্রামে ছড়িয়ে পড়া একটি ক্লিপ তাঁর কাছে পাঠান। সেই ভিডিওটি যেন তাঁর জীবনকাহিনি বলছিল। নয়া দিল্লিতে তাঁর জীবন, বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো বলে যাচ্ছিল এমনকি একজন বর্ণনাকারীর। এরসঙ্গে ছিল স্ক্রলিং ক্যাপশন, টেলিভিশন নিউজ সেগমেন্টের মতো হেডলাইন। কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্কই ছিল না। পুরো ঘটনাটিই ছিল সম্পূর্ণ কৃত্রিমভাবে বানানো।
সামরিন বলেন, ‘এটা একেবারে স্টকিংয়ের মতো ছিল। ওরা আমার জীবনের প্রথম সেমিস্টার থেকে শেষ সেমিস্টার পর্যন্ত সব অনুসরণ করেছে’ এবং সেগুলোই এই ভিডিওতে তুলে ধরেছে। ভিডিওটিতে দিল্লির জামিয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর ছাত্রজীবনের নানা ছবি জোড়া লাগিয়ে দেখানো হয়েছিল। ক্লাস প্রজেক্ট থেকে শুরু করে বিদায় অনুষ্ঠান, সহপাঠীদের সঙ্গে সেলফি, ক্যাম্পাস জীবনের দৈনন্দিন মুহূর্ত—সবই ব্যবহার করা হয়েছিল এতে।
ভয়েসওভারটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। সেই ভিডিওতে মিথ্যা দাবি করা হয় যে—তিনি মুসলিম নারী হয়েও হিন্দু পুরুষদের কাছে ‘নিজের দেহ বিক্রি করেন।’ ছবিতে থাকা বিভিন্ন মানুষকে ভুলভাবে চিহ্নিত করা হয় এবং এমনকি তাঁর নিজের ভাইকেও ‘পিম্প’ বা দালাল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। সামরিন বলেন, ‘এটা এতটাই বাস্তব দেখাচ্ছিল যে, কেউ—এমনকি আমার বাবা-মা দেখলেও—ভাবতেন এটা সত্যি।’
তিনি এমন কয়েকজন মুসলিম নারীর একজন, যারা গবেষকদের ভাষায় এখন ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে ওঠা একটি প্রবণতার শিকার। সেই প্রবণতাটি হলো—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে যৌন ইঙ্গিতমূলক ছবি ও প্রচারণামূলক কনটেন্ট তৈরি। সম্প্রতি এই ধরনের হামলার শিকার একাধিক মুসলিম নারীর সঙ্গে আল জাজিরা যোগাযোগ করেছিল। তারা কেউই নাম প্রকাশ করে কথা বলতে চাননি, লজ্জা এবং পুনরায় মানসিক আঘাতের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে। তাই তাদের ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে।
মুসলিম নারীদের যৌন ইঙ্গিতমূলক ছবি ও ভিডিও তৈরির এই প্রবণতা বিকশিত হচ্ছে ভারতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনায় সক্রিয় অংশগ্রহণের পাশাপাশি। এর মধ্যে রয়েছে চলতি বছরের শুরুতে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের এআই ইমপ্যাক্ট সামিট। এই সামিটে এআই খাতের উদ্ভাবন ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়।
ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অফ অর্গানাইজড হেট (সিএসওএইচ) এক গবেষণায় বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে থাকা ১ থাকা ৩২৬টি এআই-জেনারেটেড ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করেছে। এগুলো ২০২৩ সালের মে থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত এক্স, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ২৯৭ পাবলিক অ্যাকাউন্ট থেকে সংগ্রহ করা হয়। গবেষকরা দেখেছেন, মুসলিম নারীদের যৌন ইঙ্গিতমূলকভাবে উপস্থাপনাই সর্বাধিক এনগেজমেন্ট পেয়েছে। প্ল্যাটফর্মগুলোতে এসব কনটেন্টে ৬৭ লাখেরও বেশি ইন্টারঅ্যাকশন হয়েছে।
গবেষণার সহ-লেখক ও সিএসওএইচ-এর ডিজিটাল গবেষণা বিশ্লেষক জেনিথ খান বলেন, ‘জেনারেটিভ এআই খুব দ্রুত এবং বিনা খরচে যৌন কল্পনাকে চিত্রে রূপান্তর করার সুযোগ করে দিয়েছে। ইমেজ জেনারেটর এবং ডিপফেক প্রযুক্তি খুব কম প্রযুক্তিগত দক্ষতা দিয়েই মানুষকে বিদ্বেষমূলক বর্ণনাকে বাস্তবসম্মত ভিজ্যুয়াল কনটেন্টে রূপ দিতে সাহায্য করছে।’
গবেষকদের পাশাপাশি আরও অনেকেই এই প্রবণতা পর্যবেক্ষণ করছেন। মুম্বাইভিত্তিক আরটি ফাউন্ডেশন পরিচালিত অনলাইন সেফটি হেল্পলাইন ‘মেরি ট্রাস্টলাইনে’র প্রতিবেদনেও এমন ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে। তাদের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, মূলধারার গণমাধ্যম সাধারণত যাদের দিকে নজর দেয়—সেলিব্রিটি বা রাজনীতিবিদ—তাদের বাইরেও সাধারণ নারীরাও একই ধরনের কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবির মাধ্যমে ক্ষতির শিকার হচ্ছেন।
হেল্পলাইনের ফ্রন্টলাইন কাউন্সেলরদের একজন সালমান মুজাওয়ার। তাঁর কাজই মূলত ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা নথিভুক্ত করার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তিনি বলেন এই ধরনের ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে। ২০২২ সালে চালু হওয়ার পর থেকে মেরি ট্রাস্টলাইন ৪৮২ টিরও বেশি মামলা পরিচালনা করেছে। এর মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশই ডিজিটালভাবে বিকৃত কনটেন্ট সংশ্লিষ্ট—এবং এআই প্রযুক্তি সহজলভ্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই হার বাড়ছে। মুজাওয়ার বলেন, ‘এই ধরনের লঙ্ঘন লজ্জা, ভয় এবং ট্রমার কারণে অনেকটাই চাপা পড়ে যায়। ঘটনাগুলো খুব কমই পরিবার পর্যন্ত জানানো হয়, বৃহত্তর জনপরিসরে তো আরও কম।’
সামরিক আইয়ুবের ভিডিওটি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একাধিক সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। দ্রুতই শুরু হয় অপমানজনক মন্তব্য, হুমকিমূলক ফোনকল এবং তাঁর চরিত্র নিয়ে আক্রমণ। তিনি বলেন, ‘এটা ছিল এক ধরনের ডিজিটাল লিঞ্চিং। এক বা দুইটি নয়, ডজনেরও বেশি অ্যাকাউন্ট সেই ভিডিও ছড়িয়ে দিচ্ছিল, আর শত শত মানুষ সেটি শেয়ার করছিল।’
সিএসওএইচ-এর ডেটাসেটে এমন এআই-জেনারেটেড মিমও রয়েছে, যেখানে মুসলিম নারীদের ধর্মীয় পোশাকে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ পরিস্থিতিতে দেখানো হয়েছে এবং সাংবাদিক ও অ্যাক্টিভিস্টদের লক্ষ্য করে ভুয়া পর্নোগ্রাফিক ছবি তৈরি করা হয়েছে। এসব ছবিতে গবেষকরা একটি পুনরাবৃত্ত ভিজ্যুয়াল প্যাটার্ন দেখেছেন—একদিকে ‘মুসলিম-চিহ্নিত নারী’, অন্যদিকে ‘হিন্দু-চিহ্নিত পুরুষ।’
জেনিথ খান বলেন, এই এআই নির্মিত ন্যারেটিভে ‘মুসলিম পুরুষদের প্রায়ই সহিংস বা নৈতিকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে দেখানো হয়। অন্যদিকে মুসলিম নারীদের উপস্থাপন করা হয় অনুগত হিসেবে, অথবা তাদেরকে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের পুরুষদের দ্বারা ‘উদ্ধার’ করা হয়েছে বলে দেখানো হয়।’ গবেষকদের মতে, এই চিত্রায়ন কেবল রাজনৈতিক আলোচনার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়—এটি রাজনৈতিক বাস্তবতারই অংশ।
মিউনিখের লুদভিগ ম্যাক্সিমিলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া নৃবিজ্ঞানী সহানা উদুপি এই ঘটনাকে বৃহত্তর ‘রাজনীতির পর্নিফিকেশনের’ অংশ হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, এই প্রক্রিয়ার লক্ষ্যবস্তু হলো নারী ও সংখ্যালঘুরা। তাঁর মতে, ডানপন্থী ডিজিটাল সংস্কৃতি হাস্যরস, মিম এবং যৌনায়িত চিত্র একত্র করে নির্যাতনকে স্বাভাবিক করে তোলে। উদুপি বলেন, ‘এই অনুশীলনগুলো একটি ইকোসিস্টেম তৈরি করে। এগুলো গোষ্ঠীগত উদযাপন এবং সম্মিলিত আগ্রাসনের ওপর টিকে থাকে।’
গবেষকদের মতে, এই ইকোসিস্টেমের শিকড় কেবল নারীবিদ্বেষে নয়, আরও গভীর আদর্শিক কাঠামোতে নিহিত। সাউথ এশিয়া মাল্টিডিসিপ্লিনারি একাডেমিক জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় সোমা বসু লিখেছেন, এখানে যৌনতার রাজনৈতিকীকরণ ঘটছে। ভারতের মুসলিম নারীদের দেহ যেন সাম্প্রদায়িক আধিপত্যের যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে—যার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রকাশ দেখা গেছে ‘সুলি ডিলস’ এবং ‘বুলি বাই’ কেলেঙ্কারিতে। এসব ছিল অনলাইন মক-অকশন প্ল্যাটফর্ম, যেখানে মুসলিম নারীদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। বসু এই ঘটনাগুলোকে ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কিছু কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থনের সঙ্গে যুক্ত করেন, পাশাপাশি দলের ডিজিটাল স্বেচ্ছাসেবকদের অনানুষ্ঠানিক সহায়তার কথাও উল্লেখ করেন।
জেনিথ খানের গবেষণা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে একই বাস্তবতাকে স্পর্শ করে। তিনি বলেন, ‘দক্ষিণ এশীয় অনেক সংস্কৃতিতে নারীদের পরিবারিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তাই মুসলিম নারীদের ভিজ্যুয়ালভাবে আক্রমণ করা মানে মুসলিমদের সামগ্রিকভাবে নিচু করে দেখানো।’
তিনি নিজেও গবেষণাটি নিয়ে গভীরভাবে বিচলিত হয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘একজন মুসলিম নারী এবং গবেষক হিসেবে এটি আমার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। আমি মনে করি, আমি খুবই আতঙ্কিত হয়েছিলাম যখন দেখলাম একটি হিজাব পরা নারীর ছবি সফট পর্ন হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। একজন নারী হিসেবে আপনি প্রতিদিনই নারীবিদ্বেষী আচরণের মুখোমুখি হন। এটি সেই পরিচয়ের ওপর আরও একটি স্তর যোগ করেছে।’
এই উদ্বেগের জবাবে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) রাজনীতিবিদ আতিক রশীদ বলেন, এআই ‘ইতিবাচক ও নেতিবাচক—দুইভাবেই ব্যবহার করা যেতে পারে’ এবং এর অপব্যবহার ঠেকাতে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানান। তিনি ডিপফেক এবং যৌনভাবে ইঙ্গিতমূলক স্পষ্ট কনটেন্টকে ‘অত্যন্ত হতাশাজনক’ বলে অভিহিত করেন এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন।
তবে তিনি বিষয়টিকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখাকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং বলেন, বিজেপি ‘সব ধর্মের নারীদের সম্মান করে’ এবং ‘সুলি ডিলস’ ও ‘বুলি বাই’ ঘটনার ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এর আগে, ২০২১ ও ২০২২ সালে ঘটে যাওয়া ‘সুলি ডিলস’ এবং ‘বুলি বাই’ ঘটনাগুলোতে বিকৃত ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল। দুটি ঘটনাই ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি করে এবং পুলিশি তদন্ত শুরু হয়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পরে ‘সুলি ডিলস’ নামে অ্যাকাউন্ট তৈরি করার অভিযোগে অউমকেশ্বর ঠাকুরকে এবং ‘বুলি বাই’ তৈরির অভিযোগে নীরজ বিষ্ণোইকে গ্রেপ্তার করে। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে দিল্লির একটি আদালত মানবিক কারণে দুইজনকেই জামিন দেয়।
গবেষকদের মতে, জেনারেটিভ এআইয়ের উত্থান মুসলিম নারীদের অনলাইনে হয়রানির মাত্রা ও গতি নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। নতুন অ্যাপ্লিকেশনগুলো ব্যবহারকারীদের ছবি আপলোড করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যৌনায়িত ছবি তৈরি করার সুযোগ দেয়। এমন টুল অনলাইনে সহজলভ্য, অনেক সময় বিনামূল্যে পাওয়া যায় এবং এতে কোনো প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রয়োজন হয় না।
সিএসওএইচ-এর গবেষণা ও আউটরিচ পরিচালক এভিয়ান লেইডিগ বলেন, ‘নারীদের, বিশেষ করে সংখ্যালঘু নারীদের লক্ষ্য করে প্রযুক্তি ব্যবহার করে হয়রানি করার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এখন যা ভিন্ন, তা হলো এআই টুল যে পরিমাণ লঙ্ঘন ও ক্ষতির মাত্রা তৈরি করতে পারে।’
যারা আগে থেকেই দীর্ঘস্থায়ী অনলাইন হয়রানির মধ্যে বসবাস করছেন, তাদের জন্য এআই-নির্ভর চিত্রায়ণ নতুন এক ভয়ের মাত্রা যোগ করেছে। ২৭ বছর বয়সী আফরিন ফাতিমা পেশায় গবেষক ও অধিকারকর্মী। তিনি ২০১৯ সালে ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) বিরুদ্ধে কথা বলার পর থেকে অনলাইন নির্যাতনের মুখোমুখি হচ্ছেন। যেসব মুসলিম নারীদের ছবি ‘সুলি ডিলসে’ আপলোড করে ‘নিলাম’ করা হয়েছিল তাদের মধ্যে আফরিনও ছিলেন। জাতিসংঘ ভারতের এই আইনকে ‘মৌলিকভাবে বৈষম্যমূলক’ আখ্যা দেয়। এই আইন প্রতিবেশী মুসলিম-প্রধান দেশগুলো থেকে ভারতে আসা অমুসলিম সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব দ্রুত দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি।
সুলি ডিলস বিতর্কের চার বছর পরেও এই নির্যাতন প্রায় থামেনি। অনেক সময় অজ্ঞাত অ্যাকাউন্ট—যেগুলো সাধারণত হিন্দু নাম ব্যবহার করে—এখনও আফরিনের কাছে অপমানজনক বার্তা, ধর্ষণের হুমকি এবং লক্ষ্যভিত্তিক হয়রানির বার্তা পাঠিয়ে যায়। যদিও আফরিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুবই সীমিত উপস্থিতি রাখেন। তিনি বলেন, ‘প্রতি কয়েকদিন পর পরই কোনো না কোনো অচেনা অ্যাকাউন্ট থেকে ধর্ষণ বা মৃত্যুর হুমকি আসে।’ এআই-নির্ভর যৌন ইঙ্গিতমূলক ছবির সম্ভাবনা সেই ভয়ের মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
আফরিন ফাতিমা বলেন, ‘যখন আমি এসব ছবি সম্পর্কে পড়ি, তখন এটি খুব ব্যক্তিগত আক্রমণ বলে মনে হয়। এগুলো এক ধরনের ‘ফিয়ার সাইকোসিস’ তৈরি করে।’ ফাতিমা জানান, অনলাইন ঘৃণা তাঁর বাস্তব জীবনের চলাফেরাকেও প্রভাবিত করেছে। তিনি বলেন, ‘আমি একা কোথাও যাতায়াতে অস্বস্তি বোধ করি। যখন আপনি অনলাইনে মুসলিম নারীদের নিয়ে এই ধরনের কল্পনা ছড়াতে দেখেন, তখন ভাবতে শুরু করেন—বাস্তব জীবনে কেউ আপনাকে আক্রমণ করতে পারে কি না।’
ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর সামরিনের পেশাগত সুযোগ-সুবিধা দ্রুত কমে যেতে থাকে। তিনি বলেন, ‘একজন মডেল হিসেবে আপনার সুনামই সবকিছু। আপনার প্রোফাইলে নেতিবাচক মন্তব্য থাকলে ব্র্যান্ডগুলো আপনার কাছে আসে না।’
চার-পাঁচ মাস ধরে ভুয়া অ্যাকাউন্টগুলো তাঁর প্রোফাইলে অপমানজনক মন্তব্যের বন্যা বইয়ে দেয়, ফলে সম্ভাব্য ক্লায়েন্টরা দূরে সরে যায়। এই হয়রানি তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্কও বদলে দেয়। তিনি বলেন, ‘ইনস্টাগ্রাম আগে আমার জন্য নিরাপদ জায়গা ছিল। এখন সেখানে আমি নিরাপদ বোধ করি না, তাই আমি কী পোস্ট করছি এবং কতটা পোস্ট করছি, সব সীমিত করে ফেলেছি।’
সামরিন এই বিষয়ে দিল্লির সাইবারক্রাইম ইউনিটে রিপোর্ট করেন এবং লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। তাঁর আক্ষেপ ও অভিযোগ ‘কিছুই হয়নি।’ তাঁর অভিযোগ, অধিকাংশ আপত্তিকর কনটেন্ট শুধু তখনই সরানো হয়েছে, যখন তাঁর বন্ধুরা একসঙ্গে রিপোর্ট করেছেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভারতের বিদ্যমান আইন এআই-নির্মিত কনটেন্টের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হিমশিম খাচ্ছে। আইনজীবী ও ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক অপার গুপ্ত বলেন, ‘ছবিটি কৃত্রিম হলেও ক্ষতিটা বাস্তব।’
ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৬–ই ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত অঙ্গের ছবি তার সম্মতি ছাড়া ধারণ বা প্রকাশ করলে ফৌজদারি শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু যদি কোনো ব্যক্তির শরীর কখনোই বাস্তবে ধারণ করা না হয়ে থাকে—অর্থাৎ পুরো ছবিটি যদি এআই-নির্মিত হয়—তাহলে এই ধারা অনেক ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নাও হতে পারে। অপরা গুপ্ত বলেন, ‘ছবিটি ভুয়া হলেও এটি নারীদের জন্য এক ধরনের স্থায়ী কলঙ্কচিহ্ন তৈরি করে।’
অন্যদিকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো ‘সেফ হারবার’ সুরক্ষা পায়, যতক্ষণ তারা অবৈধ কনটেন্ট রিপোর্ট পাওয়ার পর সরিয়ে নেয়। কিন্তু গুপ্ত বলেন, অনেক ভুক্তভোগী সেই পর্যায়েও পৌঁছাতে পারেন না। তিনি বলেন, ‘প্ল্যাটফর্মগুলো এটিকে রিপোর্ট করা সহজ করে না। এটি আমার ছবি, এটি ডিপফেক, এটি সরিয়ে ফেলতে হবে—এভাবে প্রমাণ করা ভুক্তভোগীদের জন্য কঠিন।’
কাঠামোগত পরিবর্তন না হলে—প্ল্যাটফর্ম ডিজাইন, অ্যালগরিদমিক অগ্রাধিকার এবং আইনি কাঠামোতে—এআই-নির্ভর হয়রানি এমন গতিতে ছড়াতে থাকবে, যে কোনো আইনই তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।
এই বাস্তবতায়, লক্ষ্যবস্তু হওয়া মুসলিম নারীদের জন্য দায়বদ্ধতা এক অধরা ছায়াই থেকে যায়। সামরিক বলেন, ‘আমি সবচেয়ে বেশি চেয়েছিলাম—যারা এসব অ্যাকাউন্টের পেছনে আছে তাদের খুঁজে বের করতে। তারা আমাকে না জেনেই আমার সুনাম ধ্বংস করেছে।’
অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে হারের পর থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসে (টিএমসি) ভাঙন দেখা দেয়। এবার সেই ভাঙন সরাসরি আঘাত হানল লোকসভায়। দলটির ২৮ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ২০ জনই আনুষ্ঠানিকভাবে দল ছাড়ার কথা জানিয়েছেন।
৫ ঘণ্টা আগে
যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ছাড়ার ঐতিহাসিক গণভোটের আরও একটি বর্ষপূর্তি যখন ঘনিয়ে আসছে, তখন দেশটির জনমতে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ব্রেক্সিটের এক দশক ছুঁইছুঁই সময়ে এসে ব্রিটেনের সিংহভাগ মানুষ এখন মনে করছেন...
৫ ঘণ্টা আগে
এই হত্যাকাণ্ড এবং এর বিপরীতে নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়া ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও দ্বিপক্ষীয় কূটনীতিতে বেশ কিছু গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে...
১৮ ঘণ্টা আগে
গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল কয়েক দশ আগেই। এই সত্যটাই ধীরে ধীরে সামনে আসছে এখন। এই বিষয়ে গাজায় দায়িত্ব পালন করা চারজন ইসরায়েলি সেনার সাক্ষ্য শোনা যাক।
১ দিন আগে