
হরমুজে চলমান অচলাবস্থাকে কেন্দ্র করে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর নতুন এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে ইরান। দেশটি এখন এই সুবিধা হাতছাড়া করতে রাজি নয়। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের সঙ্গে আলাপকালে একাধিক বিশ্লেষক জানিয়েছেন, হোয়াইট হাউসের সঙ্গে তেহরান শেষ পর্যন্ত কী চুক্তিতে পৌঁছাল তা বড় বিষয় নয়, বরং হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের এই নতুন প্রভাব বর্তমান সামরিক সংঘাতের মেয়াদকালকেও ছাড়িয়ে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা ইঙ্গিত দিচ্ছে, দুই পক্ষের মধ্যে কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে এখনো বেশ দূরের পথ। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি কোনো চুক্তি হয়ও, তবুও ইরানের এই নতুন ‘জ্বালানি অস্ত্র’ কেড়ে নেওয়া হয়তো সম্ভব হবে না।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ হতো এই জলপথ দিয়ে। ফলে এটি বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক অর্থনীতি ইতিমধ্যে ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হয়েছে।
রাজনৈতিক ঝুঁকি বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়া গ্রুপের সিনিয়র অ্যানালিস্ট গ্রেগরি ব্রিউ সিএনএনকে বলেন, ‘ইরান যেটি প্রমাণ করেছে তা হলো—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক বোমাবর্ষণের মুখেও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার এবং তা বন্ধ রাখার ক্ষমতা তাদের রয়েছে। আর এটি এমন এক অর্জন যা কেউ কখনো তাদের কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না।’ তিনি এটিকে ইরানের ‘নতুন পারমাণবিক বিকল্প’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
বেশ কয়েকজন বিশ্লেষক যুক্তি দিয়েছেন, সম্পূর্ণ বন্ধ থাকার চেয়ে ইরানের আংশিক নিয়ন্ত্রণে হরমুজ প্রণালি খোলা থাকলে বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষতি কিছুটা কম হবে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক কিছু একাডেমি ও জ্বালানি খাতের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘কেপলার’ গত এপ্রিলে একটি রূপরেখা প্রকাশ করে, যেখানে ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে ইরান কীভাবে এই প্রণালি পরিচালনা করতে পারে তা দেখানো হয়। অর্থাৎ, বিষয়টি আশঙ্কাজনক হলেও ইতিমধ্যে মূলধারার আলোচনায় স্থান করে নিয়েছে।
ইরান ইতিমধ্যে মার্কিন দাবি উপেক্ষা করে হরমুজের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতেও শুরু করেছে। গত মাসে তারা ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথোরিটি’ গঠন করেছে, যার কাজ হলো এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য নতুন নিয়ম বা প্রোটোকল তদারকি করা। এর আওতায় ইরানি কর্তৃপক্ষের স্ক্রুটিনি বা ভেটিং এবং ক্ষেত্রবিশেষে ট্রানজিট ফি বা টোল প্রদানের নিয়ম রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই পিজিএসএ-এর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং শিপিং কোম্পানিগুলোকে তেহরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি করতে নিষেধ করেছে। এমনকি ইরানকে টোল দেওয়া কোম্পানিগুলোর ওপর সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞার হুমকিও দিয়েছে হোয়াইট হাউস। তা সত্ত্বেও, বিশ্ববাজারে তেলের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসায় কিছু তেল ব্যবসায়ী ও শিপিং কোম্পানি বৈশ্বিক সরবরাহ সচল করতে মরিয়া হয়ে ইরানের সঙ্গেই গোপনে রফাদফা করছে বলে জানা গেছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যালান গেল্ডার জানান, শিপিং ইন্টেলিজেন্স ফার্ম লয়েডস লিস্টের তথ্য অনুযায়ী ইরান একটি ট্যাংকারের কাছ থেকে ২০ লাখ ডলার ট্রানজিট ফি বা টোল দাবি করেছে। যদি যুদ্ধপূর্ববর্তী সময়ের মতো প্রতিদিন গড়ে ১৪০টি ট্যাংকার এই ফি দিয়ে যাতায়াত শুরু করে, তবে প্রতি ব্যারেল তেলে মাত্র ১ ডলারের মতো বাড়তি খরচ যোগ হবে, যা হরমুজ বন্ধ থাকার চেয়ে অনেক কম ক্ষতিকর।
তবে উড ম্যাকেঞ্জির অর্থনীতি বিভাগের প্রধান পিটার মার্টিন সতর্ক করে বলেছেন, ‘যদি এই বছরের শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে, তবে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ২০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারে। আর এমনটা হলে বর্তমান জ্বালানি সংকট একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নেবে।’
জ্বালানি বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রাইস্টাডের ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ প্রধান হোর্হে লিওন সিএনএনকে বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত যে ভবিষ্যৎ দিনগুলোতেও হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের এই নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব বজায় থাকবে।’ এর ফলে চলতি বছরের শুরুতে তেলের দাম যেখানে প্রতি ব্যারেল ৬০ ডলার ছিল, সেটি ২০২৭ সালেও আর সেই পুরোনো অবস্থায় ফিরে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
এদিকে হরমুজের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হওয়া এই সংশয়ের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো বিকল্প রপ্তানি পথের দিকে ঝুঁকছে। সৌদি আরব তাদের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত হাবশান-ফুজাইরাহ পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল রপ্তানি ডাইভার্ট করছে। আমিরাত হরমুজ প্রণালি এড়াতে দ্বিতীয় আরেকটি পাইপলাইনের কাজও শুরু করেছে।
তবে কুয়েত, কাতার বা বাহরাইনের মতো দেশগুলোর জন্য এই বিকল্প পথগুলো রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিকভাবে খুব একটা সহজ নয়, কারণ তাদের পাইপলাইন নিতে হবে সৌদি বা ইরাকের ওপর দিয়ে। বিশেষ করে কাতারের জন্য (যারা বিশ্বের মোট এলএনজি সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ নিয়ন্ত্রণ করে) হরমুজের বিকল্প তৈরি করতে গেলে কেবল ব্যয়বহুল পাইপলাইন নির্মাণই যথেষ্ট নয়, বরং পাইপলাইনের গ্যাসকে তরলীকৃত করার জন্য বন্দরে নতুন এলএনজি ফ্যাসিলিটিও তৈরি করতে হবে।
তা ছাড়া, এই নতুন অবকাঠামোগুলোও ইরানি হামলা থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকবে না। ইউরেশিয়া গ্রুপের বিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রিউয়ের মতে, নতুন যেকোনো পাইপলাইনও সহজে ইরানি মিসাইল ও ড্রোনের নাগালে চলে আসবে। ফলে দিন শেষে হরমুজ প্রণালি এবং পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা বহুলাংশে ইরানের সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের ওপরই নির্ভর করবে। আর বিশ্ব অর্থনীতিকে এই কঠোর বাস্তবতাকে মেনেই পথ চলতে হবে। এটিই এখন ইরানের সবচেয়ে বড় এবং নতুন এক ‘অস্ত্র’।
সিএনএন থেকে অনূদিত

যুদ্ধের সাত মাস পর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে হাজির হয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
১৭ ঘণ্টা আগে
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিশ্বকাপজয়ী ক্রিকেট অধিনায়ক ইমরান খানকে ঘিরে দেশটির সামরিক বাহিনী ও সরকারের সংকট ক্রমেই গভীর হচ্ছে। কারাগারে বন্দী থাকার তিন বছরের বেশি সময় পরও ইমরানের জনপ্রিয়তা কমেনি।
১৮ ঘণ্টা আগে
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে এবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যাননি। তাঁর স্থলে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। নিউইয়র্কে চলা সাধারণ পরিষদের বিতর্কে আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর ভারতের হয়ে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে...
১ দিন আগে
আগামী সপ্তাহে পাকিস্তানের ফেডারেল রাজধানী ইসলামাবাদের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ–মিছিলের ডাক দিয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক–ই–ইনসাফ পার্টি (পিটিআই)। এই বিক্ষোভ ব্যর্থ করতে প্রস্তুতি হিসেবে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে শিপিং কনটেইনার দিয়ে সড়ক অবরোধ করছে।
১ দিন আগে