Ajker Patrika

অংশীদার থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী: দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাব খর্ব করছে যুক্তরাষ্ট্র?

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
অংশীদার থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী: দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাব খর্ব করছে যুক্তরাষ্ট্র?
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নরেন্দ্র মোদি। ফাইল ছবি

ভারত সফরে এসে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও প্রত্যাশিতভাবেই ভারতকে আমেরিকার ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদারদের’ একটি হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি দুই দেশের অভিন্ন মূল্যবোধ, ‘জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক’ এবং ‘নয়া শতাব্দীকে সংজ্ঞায়িত করবে এমন সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে’ কৌশলগত সমন্বয়ের কথা উল্লেখ করেন। কিন্তু অংশীদারত্বের এই পরিচিত ভাষা ক্রমেই ফাঁপা শোনাতে শুরু করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য অপমানজনক মন্তব্য এবং শুল্ককে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের ফলে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু ২০২৫ সালে ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তনের আগেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক চাপের মুখে পড়েছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, চীনের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রভাবের কারণে যখন ভারতের আঞ্চলিক অবস্থান ধারাবাহিকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের কৌশলগত প্রতিবেশে এমন নীতি অনুসরণ করেছে, যা ভারতীয় স্বার্থকে উপেক্ষা করেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি তার বিপরীতেও গেছে।

বাংলাদেশ তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। ২০২৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের সময় যুক্তরাষ্ট্র গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে সমর্থন দিয়েছিল। কিন্তু ভারত জানত, এতে গুরুতর ঝুঁকি রয়েছে। পরবর্তীতে সেই আশঙ্কাই বাস্তবে রূপ নিয়েছে। এরপর রয়েছে মিয়ানমার। ২০২১ সালে দেশটির সামরিক বাহিনী একটি বেসামরিক সরকারকে উৎখাত করার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র জান্তার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর জন্য ‘অপ্রাণঘাতী’ সামরিক সহায়তা।

অথচ এর ফলে ভারতের সংবেদনশীল উত্তর-পূর্ব সীমান্তে যে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা উপেক্ষিত হয়েছে। গত মার্চে এক মার্কিন নাগরিক এবং ছয় ইউক্রেনীয় নাগরিককে ভারতে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ, তারা প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়া ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রবেশ করে মিয়ানমারে গিয়ে জান্তাবিরোধী যোদ্ধাদের ড্রোনযুদ্ধের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সহায়তা দিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্র নেপালকেও নতুনভাবে দেখতে শুরু করেছে। ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ভারতের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত এই দেশটিকে এখন আর ভারতের নীতির অংশ হিসেবে নয়, বরং স্বতন্ত্র কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চপর্যায়ের মার্কিন কর্মকর্তারা কাঠমান্ডু সফর বাড়িয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রেই তারা অতীতে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী নয়াদিল্লিতে যাত্রাবিরতি না করেই নেপাল সফর করেছেন।

ট্রাম্প পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছেন। বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে। পাকিস্তান যে এখনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়, সামরিক সহায়তা এবং গোয়েন্দা সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে, কিংবা পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির গত নভেম্বর মাসে কার্যত একটি সাংবিধানিক অভ্যুত্থান ঘটিয়েছেন, তা যেন গুরুত্বহীন হয়ে গেছে। ট্রাম্পের পরিবারের সদস্য এবং তাঁর ব্যবসায়িক সহযোগীরা পাকিস্তানে লাভজনক চুক্তি করেছেন। আর দৃশ্যত সেটিই ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে যথেষ্ট কারণ হয়ে উঠেছে দক্ষিণ এশিয়ার বিপজ্জনক কৌশলগত সমীকরণগুলোকে আবার সক্রিয় করার জন্য।

যুক্তরাষ্ট্র এমনকি চীনের প্রতিও তুলনামূলকভাবে সমঝোতামূলক মনোভাব নিতে শুরু করেছে। যদিও দুই পরাশক্তির মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা এখনো তীব্র, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কিছু ক্ষেত্রে আপসকামী অবস্থান ব্যাপক অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিশেষ করে ভারতের জন্য, যার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ দীর্ঘদিন ধরে চীনের আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে তার ভূমিকাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল।

তবে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ভারতকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনা আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রতিরোধক হিসেবে দেখলেও, একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের আঞ্চলিক আধিপত্যের ধারণা নিয়ে অস্বস্তিতে ভোগে। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. পল কাপুর ব্যাখ্যা করেন, দক্ষিণ এশিয়ায় কোনো একক শক্তি যেন অতিরিক্ত প্রভাবশালী হয়ে উঠতে না পারে, সেটিই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য। তাঁর এই বক্তব্য ট্রাম্প প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্রের (এনএসএস) প্রতিধ্বনি, যেখানে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ‘কোনো দেশকে এতটা প্রভাবশালী হতে দিতে পারে না’ যে তারা ‘মার্কিন স্বার্থের জন্য হুমকি’ হয়ে দাঁড়ায়। তাই যুক্তরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে, একটি বহুমাত্রিক ও বহুকেন্দ্রিক আঞ্চলিক ব্যবস্থা যেকোনো একক দেশের আধিপত্যপূর্ণ ব্যবস্থার চেয়ে বেশি স্থিতিশীল এবং মার্কিন স্বার্থের জন্য বেশি অনুকূল। এমনকি সেই দেশটি ঘনিষ্ঠ ‘কৌশলগত অংশীদার’ হলেও। ২০১৭ সালের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্রের তুলনায় নতুন এনএসএস-এ ভারতের উল্লেখ খুবই সীমিত। সেখানে শুধু বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে ‘বাণিজ্যিক (এবং অন্যান্য) সম্পর্ক’ উন্নত করতে চায়, যাতে ভারত ‘ইন্দো-প্যাসিফিক নিরাপত্তায় অবদান’ রাখতে উৎসাহিত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের এই সংরক্ষণশীল মনোভাব শুধু ভূরাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিকও। সম্প্রতি নয়াদিল্লি সফরে যুক্তরাষ্ট্রের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউ বলেন, ‘আমরা ভারতের ক্ষেত্রে সেই ভুল করতে যাচ্ছি না, যা ২০ বছর আগে চীনের ক্ষেত্রে করেছিলাম।’ তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে এমনভাবে ‘সব বাজার গড়ে তুলতে’ দেবে না, যাতে পরে ভারত অনেক বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘হারিয়ে’ দিতে পারে। বার্তাটি স্পষ্ট—যুক্তরাষ্ট্র এখন ভারতকে লালন-পালন করার মতো কৌশলগত অংশীদার হিসেবে নয়, বরং নিয়ন্ত্রণে রাখার মতো আঞ্চলিক ও অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।

ভারতকে এই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। এই বাস্তবায় ভারতের কৌশলগত চিন্তায় মৌলিক পরিবর্তন আনার দাবি জানায়। দক্ষিণ এশিয়া এবং তার বাইরেও নিজের প্রভাব বজায় রাখতে ভারত আর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ওপর নির্ভর করতে পারে না। বরং অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর প্রতি রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা এবং ছোট দেশগুলোর কাছে আকর্ষণীয় বাস্তব জনকল্যাণমূলক সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে তাকে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার করতে হবে।

ট্রাম্প প্রশাসন সম্ভবত আশা করছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত বৈশ্বিক পর্যায়ে অংশীদার থাকলেও আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারবে। কিন্তু এই সমীকরণ টিকিয়ে রাখা সহজ হবে না। এর ফলাফল শুধু ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে না, বরং দক্ষিণ এশিয়া এবং তার বাইরের কৌশলগত ভূদৃশ্যও গঠন করবে।

প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে ব্রহ্ম চ্যালানির লেখা নিবন্ধ থেকে সংক্ষেপিত। অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত