
২০২১ সালের ১৫ আগস্ট মার্কিন ও ন্যাটো সামরিক বাহিনী প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে কাবুলের মসনদে দ্বিতীয়বারের মতো আসীন হয় তালেবান। ক্ষমতার পাঁচ বছর পূর্তিতে এসে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ আফগানিস্তান আজ এক জটিল ও বৈপরীত্যপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে।
দীর্ঘ দুই দশকের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতি টেনে তালেবান প্রশাসন দেশের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে একধরনের আপাত স্বস্তি আনতে সক্ষম হলেও, মানবাধিকারের চরম সংকোচন, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা এবং গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকা অর্থনৈতিক সংকট দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন চিহ্নের সৃষ্টি করেছে।
সাধারণ আফগানদের মধ্যে একদিকে যেমন সংঘাত কমার জন্য কিছুটা স্বস্তি রয়েছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের তীব্র সংকট এবং নারীদের শিক্ষায় অব্যাহত নিষেধাজ্ঞাকে কেন্দ্র করে আফগান সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দানা বাঁধছে ক্ষোভ ও হতাশা।
তালেবান সরকারের সবচেয়ে বড় দাবি—তারা দেশকে কয়েক দশকের গৃহযুদ্ধ থেকে মুক্ত করে নিরাপত্তা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছে। জাতিসংঘের আফগানিস্তান বিষয়ক সহায়তা মিশনও (ইউনামা) স্বীকার করেছে, সশস্ত্র সংঘাত কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ কিছুটা হলেও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই ‘নিরাপত্তা’ এসেছে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতার এক বিশাল মূল্যের বিনিময়ে। বিশেষ করে দেশটির অর্ধেক জনসংখ্যা—নারী ও কিশোরীরা—তাদের ন্যূনতম সামাজিক ও নাগরিক অধিকার থেকেও পুরোপুরি বঞ্চিত।
কাবুলের ৩০ বছর বয়সী বাসিন্দা মোহাম্মদ কাশেমের কথায় আফগানদের এই মানসিক টানাপোড়েনের চিত্র স্পষ্ট হয়। তিনি বলেন, ‘আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া যে বিগত পাঁচটি বছর শান্তিতে কেটেছে। তবে সরকারের কাছে আমাদের আকুল আবেদন হলো, তরুণদের জন্য যেন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হয় এবং শিক্ষা অর্জনে তাদের উৎসাহিত করা হয়।’
ক্ষমতায় আসার সময় তালেবান ইসলামিক শরিয়াহ মেনে নারীদের শিক্ষা ও কাজের সুযোগ দেওয়ার কথা বললেও বাস্তবের চিত্র পুরোপুরি বিপরীত। ষষ্ঠ শ্রেণির ঊর্ধ্বে মেয়েদের শিক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পরবর্তী সময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও নারী শিক্ষার্থীদের প্রবেশ পুরোপুরি রুদ্ধ করে দেওয়া হয়।
পার্ক, জিম ও গণগোসলখানায় নারীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা ছাড়াও পুরুষ অভিভাবক (মাহরাম) ছাড়া দূরযাত্রায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে।
ইউনেসকোর সর্বশেষ সমীক্ষা অনুযায়ী, আফগানিস্তানে প্রায় ২৪ লাখ কিশোরী ও তরুণী বর্তমানে মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত—যা গত বছরের তুলনায় প্রায় দুই লাখ বেশি। এ ছাড়া প্রাথমিক শিক্ষার বয়সীদের মধ্যে প্রায় ৫৩ শতাংশ শিশু কোনো স্কুলেই যেতে পারছে না।
কাবুলের ৩৯ বছর বয়সী নারী অধিকারকর্মী ও উদ্যোক্তা ফাজিলা সোরোশ বলেন, ‘ইসলামিক এমিরেটের যেসব কর্মকর্তা নতুন নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তাঁদের এখন একটি স্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্তে আসা উচিত।’
পেশাদার জনশক্তির সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কাবুলের আরেক বাসিন্দা দোস্ত মোহাম্মদ খান বলেন, ‘দেশ গড়ার জন্য ভবিষ্যতে আমাদের নারী চিকিৎসক ও প্রকৌশলীর প্রয়োজন হবে। শরিয়াহ অনুযায়ী পোশাকরীতি মেনে হলেও নারীদের পড়াশোনার সুযোগ দেওয়া জরুরি।’
জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থা ‘ইউএন উইমেন’-এর মতে, তালেবান গত পাঁচ বছরে নারীর অধিকার যেভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে কেড়ে নিয়েছে, তা আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে একেবারেই অভূতপূর্ব। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রধান পূর্বশর্ত হিসেবে নারী অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে আসছে। কিন্তু তালেবান কর্তৃপক্ষ এই বৈশ্বিক চাপকে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বলে মনে করে।
তালেবানের তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী মৌলভি হায়াতুল্লাহ মহাজর ফারাহি এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, ‘আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার সব শর্ত ইসলামিক এমিরেট পূরণ করেছে। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেই এগিয়ে আসতে হবে।’
তিনি আরও জানান, তালেবান বিশ্বের অন্তত ৪০টি দেশের সঙ্গে কোনো না কোনো কূটনৈতিক বা বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখছে। যদিও এখন পর্যন্ত কেবল রাশিয়াই তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দিয়েছে। এ ছাড়া আফগানিস্তানে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয় হওয়ার জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনকে ফারাহি ‘শত্রুভাবাপন্ন প্রচারণামাত্র’ বলে উড়িয়ে দেন।
অবশ্য আপাতদৃষ্টিতে তালেবান সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও, খোদ যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারতসহ বেশ কিছু প্রভাবশালী দেশ আফগান সরকারের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। দেশটির অবকাঠামো এবং বিশেষ করে খনিজ খাতে বিনিয়োগ নিয়ে অনেক দেশের মধ্যেই গোপন প্রতিযোগিতা চলছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।
তালেবান সরকার অভ্যন্তরীণ মুদ্রা স্থিতিশীল রাখা, নতুন শিল্প পার্ক নির্মাণ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির দাবি করলেও বাস্তব অর্থনৈতিক চিত্র অত্যন্ত করুণ।
বৈদেশিক সাহায্য বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় দেশটির মূল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে পড়েছে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করেছে, তহবিলের মারাত্মক ঘাটতির কারণে খাদ্য সহায়তা কমিয়ে দিতে বাধ্য হওয়ায় দেশটির এক-তৃতীয়াংশ প্রদেশে শিশুদের পুষ্টিহীনতা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
লাখ লাখ শিক্ষিত তরুণ আজ কর্মহীন, যা তরুণদের অবৈধ উপায়ে দেশত্যাগে বাধ্য করছে।
তালেবান শাসনের পাঁচ বছর পূর্তিতে এটি স্পষ্ট যে কেবল সামরিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অর্জিত ‘নিরাপত্তা’ দিয়ে কোনো দেশের স্থায়ী উন্নয়ন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে এবং দেশের অর্ধেক জনসংখ্যাকে শিক্ষা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন রাখলে আফগানিস্তানের সংকট আগামী দিনে আরও ঘনীভূত হবে। ইউনামা যেমনটা সতর্ক করে বলেছে—নারীদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা না তুললে আফগানিস্তানের পুনর্গঠন এবং বৈশ্বিক মূলধারায় ফেরা অসম্ভব। তালেবান প্রশাসনের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বন্দুকের শাসনের বাইরে এসে জনগণের অর্থনৈতিক ও মৌলিক চাহিদা পূরণ করা।
তথ্যসূত্র: এবিসি নিউজ

১৭ জুলাই, ২০২৬। তিউনিসের উপকণ্ঠে অবস্থিত মর্নাগিয়া কারাগার। কমপ্লেক্সের ভেতরের তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে। হঠাৎ নিজ সেলে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান ৮৫ বছর বয়সী রশিদ ঘানুশি। তিনি তিউনিসিয়ার পার্লামেন্টের সাবেক স্পিকার।
১ দিন আগে
গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসন নিয়ে লাতিন আমেরিকার সাধারণ মানুষের মধ্যে যখন ক্ষোভ ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে, তখন অঞ্চলটির রাষ্ট্রক্ষমতা যেন হাঁটছে ঠিক উল্টো পথে। একের পর এক নির্বাচনে ডানপন্থি ও জনতুষ্টিবাদী নেতাদের উত্থান ঘটছে, আর তাদের অনেকেই ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা, সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে...
১ দিন আগে
অক্টোবরে ইসরায়েলের গাজায় গণহত্যা শুরুর তিন বছর পূর্ণ হবে। যেকোনো বিচারে এটি যুদ্ধাপরাধ। এই যুদ্ধাপরাধ ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীর, দক্ষিণ লেবানন এবং ইরানেও পুনরাবৃত্তি করেছে। এই তিন বছরের অধিকাংশ সময় তুরস্ক এবং আরব বিশ্ব আতঙ্ক ও ক্ষোভ প্রকাশ করলেও কার্যত কিছুই করেনি। অক্ষমতার সেই সম্মিলিত আর্তনাদ ছিল
৩ দিন আগে
তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের নেতারা পবিত্র মক্কা নগরীতে বৈঠক করে একটি নতুন প্রতিরক্ষা জোট গঠনে সম্মত হয়েছেন। গত ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
৪ দিন আগে