Ajker Patrika

প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের নিবন্ধ /স্পেসএক্স: লাগামহীন নয়া ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৫ জুন ২০২৬, ১৩: ২৪
স্পেসএক্স: লাগামহীন নয়া ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
ইলন মাস্কের নেতৃত্বাধীন স্পেসএক্স কোম্পানিকে বিশ্লেষকেরা নতুন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বলে আখ্যা দিচ্ছেন। ছবি: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

সপ্তাহ দুয়েক আগে বিশ্বের শীর্ষ ধনকুবের ইলন মাস্কের নেতৃত্বাধীন স্পেসএক্স তাদের শেয়ারের একটি অংশ নাসডাকে তালিকাভুক্ত করেছে। কোম্পানিটির সম্ভাব্য মূল্য ধরা হচ্ছে ২ ট্রিলিয়ন ডলারের উপরে। এটি ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আইপিও বা প্রাথমিক শেয়ার ছাড়ার ঘটনা। বিনিয়োগকারীদের এমন একটি প্রতিষ্ঠানের মূল্য নির্ধারণ করতে বলা হচ্ছে, যারা শুধু রকেটই বানায় না। তারা বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট নেটওয়ার্কও পরিচালনা করে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থাও ক্রমে তাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।

তবে শুধু এই ব্যবসাগুলো নয়, স্পেসএক্সের সঙ্গে যুক্ত আছে একটি ব্যয়বহুল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রকল্পও। ইলন মাস্ক এটিকে একই করপোরেট কাঠামোর মধ্যে এনেছেন। ফলে বিনিয়োগকারীদের এই অংশটিও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। স্পেসএক্সের বিনিয়োগ নথি বা প্রসপেক্টাসে নিজেদের একটি বিশেষ ধরনের কোম্পানি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তাদের দাবি, তারা দ্রুত বাড়তে থাকা একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী কোম্পানিগুলোর পাশে জায়গা পাওয়ার যোগ্য।

কিন্তু ইতিহাস অন্য ইঙ্গিত দেয়। ইতিহাস বলছে—স্পেসএক্সের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মিল অ্যাপল বা এনভিডিয়ার নয়। বরং মিল পাওয়া যায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে। সেই কোম্পানি প্রায় ৩০০ বছর টিকে ছিল। অবশ্য স্পেসএক্স এখনই কোনো অঞ্চলে কর বসাতে যাচ্ছে না বা মানুষ শাসন করতে যাচ্ছে না, যেমনটা অতীতে কিছু চার্টারপ্রাপ্ত কোম্পানি করেছিল। মহাকাশেও এখন পর্যন্ত কোনো স্থায়ী বাসিন্দা নেই বলে আমরা জানি।

কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। স্পেসএক্স এমন এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে, যা কোনো একক রাষ্ট্রের সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে কাজ করছে। একই সঙ্গে তারা এমন ক্ষমতা জমা করছে, যা পরে সরকারগুলো ফেরত নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে ১৫৭০ থেকে ১৮৬০ সালের মধ্যে ইউরোপীয় দেশগুলো সমুদ্রপথে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর জন্য চার্টারপ্রাপ্ত যৌথ-স্টক কোম্পানি ব্যবহার করত। এর মধ্যে ব্রিটিশ, ডাচ ও ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ।

এসব কোম্পানি ছিল ব্যবসা ও রাষ্ট্রের মাঝামাঝি ধরনের প্রতিষ্ঠান। তারা ব্যবসা করত, কিন্তু রাষ্ট্রের হয়ে কাজও করত। তারা বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি করত। যেখানে পরিষ্কার আইন ছিল না, সেখানে নিজেরাই নিয়ম বানিয়ে নিত। তারা অনেক সময় রাষ্ট্রের কাজও করত। তারা অর্থ ছাপিয়েছে। স্থানীয় জনগণের ওপর নিয়ন্ত্রণ চালিয়েছে। যুদ্ধ করেছে। আন্তর্জাতিক চুক্তি করেছে। ব্রিটিশ চিন্তাবিদ ও রাজনীতিক এডমন্ড বার্ক একবার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বলেছিলেন, ‘ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে এক রাষ্ট্র।’

পৃথিবীতে আবারও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। প্রথম বিষয় হলো একচেটিয়া শক্তি। স্পেসএক্স তাদের রকেট বুস্টারকে এমনভাবে তৈরি করেছে যাতে তা অবতরণের পর আবার ব্যবহার করা যায়। এতে উৎক্ষেপণের খরচ কমে। কিন্তু পুনঃব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি তখনই লাভজনক হয়, যখন নিয়মিত অনেক উৎক্ষেপণ হয়। এ জন্য স্পেসএক্স স্টারলিংক তৈরি করেছে। এটি হাজার হাজার স্যাটেলাইটের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্ক নিজেই নতুন স্যাটেলাইট পাঠানোর প্রয়োজন তৈরি করে। ফলে রকেট উৎক্ষেপণের চাহিদাও স্থায়ী হয়।

প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য এটি বড় সমস্যা। কারণ, তাদের হাতে একই সঙ্গে রকেট ব্যবসা ও স্যাটেলাইটভিত্তিক স্থায়ী গ্রাহকভিত্তি নেই। ফলে তাদের জন্য বাজারে ঢোকা কঠিন। গবেষণা বলছে, ২০১৪ সালে পৃথিবী থেকে মহাকাশে পাঠানো মোট ভরের ১০ শতাংশেরও কম ছিল স্পেসএক্সের অংশ। এখন তা প্রায় ৮০ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে এই হার আরও বেশি। সেখানে স্পেসএক্সের অংশ প্রায় ৯৪ শতাংশ। এমনকি নাসাও তাদের সবচেয়ে বড় গ্রাহকদের একটি।

এভাবে স্পেসএক্স পৃথিবীর কক্ষপথের সীমিত জায়গা এবং রেডিও স্পেকট্রামের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে নতুন প্রতিযোগীদের জন্য প্রবেশ আরও কঠিন হবে। এটি সাধারণ প্রযুক্তি বাজারের অলিগোপলি নয়। বরং অনেক পুরোনো ধরনের শক্তি কাঠামোর মতো।

এরপর আসে আইনের প্রশ্ন। ১৯৬৭ সালের আউটার স্পেস ট্রিটি এমন সময়ে লেখা হয়েছিল, যখন মহাকাশে শুধু রাষ্ট্রগুলোরই নিয়ন্ত্রণ ছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, কোনো রাষ্ট্র মহাকাশকে নিজের মালিকানা দাবি করতে পারবে না। ব্যবহার, দখল বা অন্য কোনো উপায়ে মহাকাশকে জাতীয় সম্পদ বানানো যাবে না। মহাকাশকে ঘোষণা করা হয়েছিল সমগ্র মানবজাতির কল্যাণের ক্ষেত্র হিসেবে। কিন্তু সেই নিয়ম বাস্তবায়নের কোনো শক্তিশালী ব্যবস্থা রাখা হয়নি।

এই শূন্যতার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সালে কমার্শিয়াল স্পেস লঞ্চ কম্পিটিটিভনেস অ্যাক্ট এবং ২০২০ সালে আর্টেমিস অ্যাকর্ডস চালু করে। সেখানে বলা হয়, মহাকাশ থেকে সম্পদ সংগ্রহ করাকে মালিকানা প্রতিষ্ঠা হিসেবে ধরা হবে না। এই পরিবর্তন স্পেসএক্সের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যেমন আগে চার্টার ব্যবসার অনুমতি ও বাস্তবে মালিকানার দাবি তৈরি করত, এখানেও একই রকম ঘটনা ঘটছে। যারা আগে এগিয়েছে, তারাই নিয়ম তৈরিতে সুবিধা পাচ্ছে।

আরেকটি বড় বিষয় হলো রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি ক্ষমতার সীমা অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া। ২০২২ সালে ইউক্রেন রাশিয়ার নৌবহরে আঘাত করতে ক্রিমিয়ায় স্টারলিংক ব্যবহার করতে চেয়েছিল। কিন্তু ইলন মাস্ক সেটি চালু করতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে একজন বেসরকারি ব্যক্তি কার্যত একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত আটকে দেন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র সরকারও সহজে সেই সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেনি।

ভবিষ্যতে চাঁদে মানুষের কার্যক্রম বাড়লে স্পেসএক্স আরও শক্তিশালী অবস্থানে যাবে। তারা মানদণ্ড ঠিক করতে পারবে। সম্পদ দাবি পরিচালনায় প্রভাব ফেলতে পারবে। আর আর্টেমিস অ্যাকর্ডস অনুযায়ী নিরাপত্তা অঞ্চলগুলোর ব্যবস্থাপনাতেও ভূমিকা নিতে পারবে। অর্থাৎ যেসব প্রশ্ন আগে রাষ্ট্র ঠিক করত, সেগুলোর উত্তর হয়তো একসময় বেসরকারি কোম্পানি দেবে। যেভাবে ব্রিটেন ডাচদের ঠেকাতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পিকে শক্তিশালী করেছিল, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র চীনের আগে মহাকাশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় স্পেসএক্সকে এগিয়ে দিচ্ছে।

কিন্তু কোম্পানি যত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ তত কমবে। গত বছর এর একটি উদাহরণ দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইলন মাস্ক প্রকাশ্যে বিরোধে জড়ান। ট্রাম্প স্পেসএক্সের সরকারি চুক্তি বাতিলের কথা বলেন। মাস্ক পাল্টা যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে প্রবেশের সুযোগ বন্ধ করার হুমকি দেন। ফলে দেখা যায়, রাষ্ট্র এমন এক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করছে, যাকে অনুরোধ করা যায়, কিন্তু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।

ইতিহাস বলছে, এমন ক্ষমতা একবার প্রতিষ্ঠিত হলে পরে তা ফিরিয়ে আনা খুব কঠিন। ব্রিটেন ১৮৫৮ সালের আগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। তার আগে দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক সংকট ও সহিংস বিদ্রোহ ঘটে। ব্রিটিশরা এটিকে বলেছিল ‘গ্রেট মিউটিনি।’ ভারতীয়রা বলেন ‘প্রথম স্বাধীনতার যুদ্ধ।’ ততদিনে ক্ষতি অনেক বড় হয়ে গিয়েছিল।

ইতিহাসের পরামর্শ হলো, এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে। লক্ষ্য কোম্পানিকে ধ্বংস করা নয়। বরং রাষ্ট্র যেন তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে পড়ে, সেটা নিশ্চিত করা। পর্তুগাল ও ফ্রান্স অতীতে তাদের চার্টারপ্রাপ্ত কোম্পানিগুলোর মালিকানায় অংশ রেখেছিল। ফলে ভেতর থেকেই কিছুটা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পেরেছিল। একইভাবে, আজ যেসব প্রযুক্তি কোম্পানির হাতে রাষ্ট্রের মতো ক্ষমতা জমা হচ্ছে, সেখানে সরকার বোর্ডে প্রতিনিধি রাখতে পারে।

অথবা সংখ্যালঘু শেয়ার কিনে কিছু নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র যেমন একটি ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু অংশীদারিত্ব নিয়েছে। এর মাধ্যমে নিরাপত্তা অঞ্চল, সম্পদ দাবি এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর নজর রাখা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের উদ্ভাবনের শক্তিও বজায় থাকবে।

সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। আজকের প্রযুক্তিনির্ভর নতুন শক্তিগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ কমে আসছে। নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন প্রশ্ন একটাই—ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইতিহাস জানা কি যথেষ্ট হবে, যাতে তার একবিংশ শতাব্দীর সম্ভাব্য উত্তরসূরিকে একই পথে যেতে না দেওয়া যায়? স্পেসএক্সের আইপিও সেই প্রশ্ন নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত