Ajker Patrika

১২০ বছরে ৩৬ দেশের সরকার উৎখাতে যুক্তরাষ্ট্র, পরিণতি ভয়াবহ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯: ১৭
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

এক শতাব্দী ধরে বিশ্বের প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে কৌশলটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছে, তা হলো ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা বিদেশি সরকার পরিবর্তন। জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ডাউন্স তাঁর ‘ক্যাটাস্ট্রফিক সাকসেস: হোয়াই ফরেন-ইমপোজড রেজিম চেঞ্জ গোজ রং’ বইয়ে লিখেছেন, ১৮১৬ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় ১২০ বার বিদেশি হস্তক্ষেপে সরকার পতন হয়েছে। এর মধ্যে ১৯০৫ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ১২০ বছরে এর এক-তৃতীয়াংশই করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

সবশেষ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটকের ঘটনা এ তালিকার ৩৬তম সংযোজন। তবে সামরিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাসের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণে ওয়াশিংটন বারবার বিভিন্ন দেশে হানা দিলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফলাফল হয়েছে ভয়াবহ।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বিদেশি শক্তির মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনকে সংক্ষেপে বলেন ‘ফার্ক’ বা ফরেন-ইমপোজড রেজিম চেঞ্জ (FIRC)। অধ্যাপক ডাউন্সের মতে, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের প্রায় ২০টি দেশে যুক্তরাষ্ট্র বারবার হস্তক্ষেপ করেছে। ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালার তিনটি সরকারকে একে একে ক্ষমতাচ্যুত করার রেকর্ড রয়েছে ওয়াশিংটনের।

যুক্তরাষ্ট্রের রেজিম চেঞ্জ নীতির সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয় ইরাক ও আফগানিস্তানকে। সাদ্দাম হোসেনকে সরানোর পর জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সাদ্দামের পতনের তিন বছর পরও (২০০৬) ইরাকে চলছিল মৃত্যুর মিছিল। আর বাগদাদের রাস্তায় সেই মিছিলে পড়ে থাকা শত শত বেওয়ারিশ লাশ সংগ্রহ করেছিল মার্কিন সেনারা।

এই মৃতদের বেশির ভাগই ছিলেন তরুণ পুরুষ। কারও হাত পেছনে বাঁধা, কারও চোখে বিস্ময়ের ছাপ। তাঁরা ছিলেন একটি সাম্প্রদায়িক গৃহযুদ্ধের শিকার—যা বুশ প্রশাসন আগে থেকে আঁচ করতে পারেনি। সুন্নি নিয়ন্ত্রিত সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীকে সরিয়ে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজ ছিল। কিন্তু এরপর যে নিরাপত্তাশূন্যতা তৈরি হয়, সেখানে ইরানপন্থী শিয়া মিলিশিয়া ও সুন্নি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ সামাল দেওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন।

এর পরিণতিতে শিয়া-সুন্নি গৃহযুদ্ধ এবং শেষপর্যন্ত আইএসের উত্থান। সেই ক্ষত সারতে যুক্তরাষ্ট্র আজও ওই অঞ্চলে সেনা মোতায়েন রাখতে বাধ্য হয়েছে।

অন্যদিকে, ২০ বছরের যুদ্ধ আর ট্রিলিয়ন ডলার খরচের পর শেষপর্যন্ত সেই তালেবানের হাতেই ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে বিদায় নিতে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রকে।

ভেনেজুয়েলাও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক হস্তক্ষেপের ধারাবাহিকতার অংশ। অধ্যাপক ডাউন্স বলেন, অনেকে মনে করে, আগের চেয়ে খারাপ তো কিছু হতে পারে না। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় তা সত্য হয় না। অধ্যাপক ডাউন্স তাঁর বইয়ে প্রমাণ দিয়েছেন, বিশ্বজুড়ে সংঘটিত সব সরকার পরিবর্তনের এক-তৃতীয়াংশের ক্ষেত্রেই ১০ বছরের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে। এর জ্বলন্ত উদাহরণ ইরাক।

ভেনেজুয়েলায় সরকার পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও বিশেষজ্ঞরা এমন কিছু দেখছেন। মাদুরো ও তাঁর পূর্বসূরি হুগো শাভেজের দুর্নীতি ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় দেশটির অর্থনীতি আগে থেকেই বিপর্যস্ত, তৈরি হয়েছে লাখো শরণার্থী। তাহলে এখন কী হতে পারে, সহজেই আঁচ করা যায়।

কিন্তু কেন ব্যর্থ হয় এই নীতি? অধ্যাপক ডাউন্সের গবেষণায় দুটি প্রধান কারণ উঠে এসেছে। প্রথমত, সরকার পতনের পর সংশ্লিষ্ট দেশের সামরিক বাহিনী ভেঙে যায়। হাজার হাজার সশস্ত্র সেনাসদস্য তখন বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন এবং দীর্ঘমেয়াদি গৃহযুদ্ধ শুরু করেন। দ্বিতীয়ত, বিদেশি শক্তির বসানো নতুন নেতা নিজের দেশের জনগণ ও বিদেশি প্রভুর চাহিদার মাঝে পড়ে পুতুলে পরিণত হন। ফলে অভ্যন্তরীণ বৈধতা হারান তিনি।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রেজিম চেঞ্জ কেবল তখনই সফল হয়, যখন সংশ্লিষ্ট দেশটিতে আগে থেকেই গণতন্ত্রের অভিজ্ঞতা থাকে এবং সমাজ হয় একজাতীয় (Homogeneous)—যেমনটি ঘটেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী জাপান বা জার্মানিতে। তবে এসব যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র জড়াতে বাধ্য হয়েছিল, নিজের ইচ্ছায় নয়। কিন্তু ইরাক, লিবিয়া বা ভেনেজুয়েলার মতো দেশে যেখানে গভীর জাতিগত বা অর্থনৈতিক বিভেদ রয়েছে, সেখানে মার্কিন হস্তক্ষেপ কখনোই ভালো কিছু নিয়ে আনবে না।

তথ্যসূত্র: ফরেন পলিসি ও এনডিটিভি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত