Ajker Patrika

বিবিসির নিবন্ধ /ইরান নিয়ে উভয়সংকট: ট্রাম্পের সিদ্ধান্তহীনতার পররাষ্ট্রনীতির নগ্ন উন্মোচন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৩: ৫১
ইরান নিয়ে উভয়সংকট: ট্রাম্পের সিদ্ধান্তহীনতার পররাষ্ট্রনীতির নগ্ন উন্মোচন
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার ইরানকে তাঁর সর্বশেষ আলটিমেটাম দিয়েছেন। গাজা পুনর্গঠন ও বৈশ্বিক শান্তি নির্মাণের উদ্দেশ্যে গঠিত বোর্ড অব পিসের প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকে তিনি এই হুঁশিয়ারি দেন। মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফেরাতে ট্রাম্প নিজেই এই জোট গঠন করেছিলেন, অথচ এখন সেই অঞ্চলেই তিনি নতুন যুদ্ধ বাধিয়ে দিতে পারেন।

একই সঙ্গে শান্তির ডাক এবং সামরিক অভিযানের হুমকি—এই বৈপরীত্যই ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের পররাষ্ট্রনীতির মূল বৈশিষ্ট্য। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই অচলাবস্থা এখন চরমে পৌঁছেছে। এটি দ্রুতই বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিতে পারে, যা বিগত কয়েক বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিমান হামলায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি কূটনৈতিক সমাধান চান। তিনি এমন এক চুক্তি করতে চান, যা ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করবে। বুধবার হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেন, ইরানের জন্য একটি চুক্তিতে আসা হবে ‘বুদ্ধিমানের কাজ।’

কূটনীতির কথা বললেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে তাঁর সুর বেশ কড়া করেছেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর ট্রাম্পই এখন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক সমাবেশ ঘটিয়েছেন। এটি ট্রাম্পের একরোখা মনোভাবের একটি উদাহরণ। তাঁর সমর্থকেরা আশা করেছিলেন, তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে সামরিক শক্তির ব্যবহার কম করবেন, কিন্তু ট্রাম্প কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়াই বারবার শক্তি প্রয়োগ করছেন।

ইরানে হামলার এই হুমকিকে কেবল আলোচনার কৌশল হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ, গত জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও তিনি একই রকম হুমকি দিয়ে শেষ পর্যন্ত আক্রমণ চালিয়েছিলেন। ভেনেজুয়েলার সেই অভিযানের লক্ষ্য ছিল সুনির্দিষ্ট। প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী, সেই অভিযান সফল হয়েছিল এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে বন্দী করা সম্ভব হয়েছিল।

তবে ইরানের ক্ষেত্রে নতুন সামরিক অভিযানের যৌক্তিকতা খুব একটা পরিষ্কার নয়। ট্রাম্প চান না তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করুক, যা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেরও প্রধান লক্ষ্য। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভে ইরান এখন দুর্বল। দেশটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে আলোচনার জন্য প্রস্তুত থাকার ইঙ্গিতও দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা এখন স্থবির হয়ে আছে। কারণ, প্রশাসন চায় তেহরান তাদের ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করুক। আলোচনা থমকে গেলেও ট্রাম্প স্পষ্ট করেননি যে কেন এখনই আবার ইরানে হামলা করতে হবে। গত জুনেই যুক্তরাষ্ট্র সেখানে একবার হামলা চালিয়েছিল।

ট্রাম্প দাবি করেছেন, গত বছরের সেই হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ হয়ে গেছে। যদি তা-ই হয়, তবে কেন আবার হামলার প্রয়োজন বা নতুন লক্ষ্যবস্তু কী—সে ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট কোনো ব্যাখ্যা দেননি। ভেনেজুয়েলার মতো ইরানের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের মূল উদ্দেশ্য কী, তা এখনো রহস্যময়।

মার্কিন প্রশাসন কি ইরানে সরকার পরিবর্তন চায়? ইরান যদি পাল্টা আঘাত হিসেবে ওই অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালায়, তবে কি যুক্তরাষ্ট্র তার জন্য প্রস্তুত? দীর্ঘস্থায়ী কোনো যুদ্ধ কি গাজা পুনর্গঠনের মতো আমেরিকার অন্য লক্ষ্যগুলোকে বাধাগ্রস্ত করবে? হামলার পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে ট্রাম্প খুব কম তথ্যই দিয়েছেন।

এই সম্ভাব্য হামলায় ইসরায়েলের ভূমিকা কী হবে তা-ও অস্পষ্ট। গত বছর ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে ইরানে হামলা চালিয়েছিল। এবারও তারা যোগ দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত সপ্তাহে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে এ নিয়ে বৈঠক করেছেন।

সামনের সপ্তাহে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণ। সেখানে তাঁকে বোঝাতে হবে কেন ইরানের ওপর হামলা তাঁর অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য জরুরি। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে বিদেশের যুদ্ধ থেকে সরিয়ে আনবেন। তাঁর মাগা—মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন ক্যাম্পেইনের সমর্থক এবং অনেক রিপাবলিকান নেতা ইউক্রেনের মতো জায়গায় মার্কিন হস্তক্ষেপের বিরোধী।

অথচ ক্ষমতায় আসার পর থেকে ট্রাম্প সিরিয়া, ভেনেজুয়েলা, ইরান এবং ক্যারিবিয়ান সাগরে মাদকবাহী নৌকায় একের পর এক সামরিক হামলা চালিয়েছেন। ইরানে দীর্ঘস্থায়ী হামলা চালালে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প তাঁর অনেক সমর্থককে হারাতে পারেন। জনমত জরিপ বলছে, অভিবাসন ও অর্থনীতির মতো বিষয়ে ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডে ভোটাররা এমনিতেই বিরক্ত। বিদেশের বিষয়ে তাঁর অতিরিক্ত মনোযোগ নিয়ে সমালোচনাও হচ্ছে।

এ ছাড়া বড় ধরনের কোনো হামলা ট্রাম্পের নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার আশায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের শুরু থেকে আটটি যুদ্ধ বন্ধ করেছেন, তাই তিনি এই পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। যদিও তাঁর এই দাবি নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে।

বিদেশে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে একই সঙ্গে শান্তির নোবেল পাওয়ার জন্য প্রচার চালানোর কোনো নজির আগে নেই। এই অনিশ্চয়তা বিশ্ববাসীকে ভাবিয়ে তুলছে যে ট্রাম্প আসলে কী চান। অবশ্য প্রেসিডেন্ট হয়তো এটাই পছন্দ করেন। হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকে ট্রাম্প নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘ডিলমেকার’ হিসেবে তুলে ধরতে আনন্দ পাচ্ছেন। তিনি অনেক আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সম্মেলনে সভাপতিত্ব করছেন।

তাঁর শুল্কনীতি অন্য দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তিতে আসতে বাধ্য করেছে। এর ফলে ট্রাম্প বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রে চলে এসেছেন। গত মাসে ভেনেজুয়েলায় হামলা এবং গ্রিনল্যান্ড দখলের ডাক দিয়ে তিনি পুরো বিশ্বের নজর কেড়েছেন।

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে বিরোধের সময়ও অন্য দেশগুলো ট্রাম্পের আসল উদ্দেশ্য বুঝতে হিমশিম খেয়েছিল। ইরানের বিষয়েও ট্রাম্প গত বৃহস্পতিবার বলেছেন, তিনি কী করবেন তা দেখার জন্য বিশ্বকে অপেক্ষা করতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের একটি অর্থবহ চুক্তি করতে হবে, নয়তো খারাপ কিছু ঘটবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত