
হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী মার্কিন অবরোধের অর্থনৈতিক অভিঘাতের মুখে দাঁড়িয়ে ইরান যখন ভবিষ্যৎ হিসাব কষছে, তখন তাদের নজর ধীরে ধীরে উত্তর দিকে সরে যাচ্ছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের নৌপথে বিঘ্ন আর তেল রপ্তানিতে বাধা তৈরি হওয়ায় তেহরান হয়তো উপসাগরের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রেলপথ, কাস্পিয়ান সাগরের বন্দর এবং নিষেধাজ্ঞার সময় গড়ে ওঠা বাণিজ্য নেটওয়ার্কের দিকে ঝুঁকতে পারে। এসব উপায়ের সবগুলোই ইরানকে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করেছে।
এই সম্পর্কের গুরুত্ব নতুন করে স্পষ্ট হয় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যখন সেন্ট পিটার্সবার্গ সফরের সময় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে তিনি মস্কোর ‘দৃঢ় ও অটল’ সমর্থনের প্রশংসা করেন। দুই পক্ষ যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করে।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—রাশিয়া কি সত্যিই যুদ্ধবিধ্বস্ত, চাপে থাকা ইরানের অর্থনীতির জন্য লাইফলাইন বা জীবনরেখা হয়ে উঠতে পারবে? মস্কোর আদৌ সে আগ্রহ আছে কি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছে আল জাজিরা।
বাড়ছে, তবুও সীমিত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য
যুক্তরাষ্ট্র ২০১৮ সালে ২০১৫ সালে করা পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে গিয়ে ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করে। এর পর থেকে ইরান-রাশিয়া অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর হতে শুরু করে। এরপর ২০২২ সালে রাশিয়া যখন ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন চালায়, তখন এই প্রবণতা আরও ত্বরান্বিত হয়। পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে ঠেলে দেওয়া দুই দেশই তখন নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর নেটওয়ার্ক, বিকল্প অর্থ প্রদানের ব্যবস্থা এবং অ-পশ্চিমা বাণিজ্যপথ ব্যবহার করে পণ্য, জ্বালানি ও অর্থের প্রবাহ সচল রাখার চেষ্টা করে।
বর্তমানে এই বাণিজ্যের বড় অংশ জুড়ে আছে কৃষিপণ্য—বিশেষ করে গম, বার্লি ও ভুট্টা। পাশাপাশি যন্ত্রপাতি, ধাতু, কাঠ, সার এবং শিল্প উপকরণও রয়েছে। তেহরান আবার রাশিয়াকে কম খরচের শাহেদ ড্রোন সরবরাহ করেছে, যেগুলো রাশিয়া উন্নত করে ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহার করছে।
রাশিয়ার জ্বালানিমন্ত্রী সের্গেই সিভিলিয়ভ ২০২৫ সালে মস্কো-তেহরান আন্তসরকারি বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিশনে বলেন, ‘গত বছর (২০২৪) আমাদের বাণিজ্যের পরিমাণ ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি এর সম্ভাবনা আরও অনেক বেশি।’
এই সময়কালে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানা গেছে, যার পেছনে প্রধান ভূমিকা ছিল রাশিয়ার শস্য, ধাতু, যন্ত্রপাতি ও শিল্পপণ্য রপ্তানি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও ইরানের চীন বা উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যের তুলনায় এটি এখনো বেশ সীমিত। ভিয়েনা ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক স্টাডিজের অর্থনীতিবিদ মাহদি ঘোদসি বলেন, ‘এই বাণিজ্যের আকার খুব বড় নয়। কারণ দুই দেশই প্রায় একই ধরনের পণ্য উৎপাদন করে এবং তাদের শিল্প কাঠামোও প্রায় একই।’
হরমুজের বিকল্প পথ
রাশিয়া-ইরান বাণিজ্যের মূল ভিত্তি হলো ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডর (আইএনএসটিসি)। এটি একাধিক নৌ, রেল ও সড়কপথের সমন্বয়ে গঠিত একটি নেটওয়ার্ক, যা রাশিয়াকে ইরানের সঙ্গে এবং সেখান থেকে এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করে। এবং অবশ্যই পশ্চিম নিয়ন্ত্রিত সমুদ্রপথ এড়িয়ে।
এই পথে পণ্য দক্ষিণ রাশিয়ার বন্দর থেকে কাস্পিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে ইরানের উত্তরাঞ্চলের বন্দর—যেমন বন্দর আনজালিতে পৌঁছায়। এরপর সেখান থেকে রেল বা ট্রাকযোগে এগোয় মূল ভূখণ্ডের দিকে। এই রুট ইতিমধ্যেই রাশিয়ার শস্য, যন্ত্রপাতি ও শিল্পপণ্য ইরানে পাঠানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
লন্ডনভিত্তিক থিংক মার্কেটসের প্রধান বাজার বিশ্লেষক নাঈম আসলাম বলেন, এই রুট ‘কার্যকর কিন্তু আংশিক জীবনরেখা’ হতে পারে। তিনি আরও বলেন, ভোলগা নদীর মোহনায় কাস্পিয়ান সাগরের কাছে অবস্থিত আস্ত্রাখান এবং মাখাচকালা বন্দর ইতিমধ্যেই শস্য, ধাতু, কাঠ ও পরিশোধিত পণ্যের প্রবাহ বৃদ্ধির জন্য প্রস্তুত।
এই করিডরের একটি পশ্চিম শাখা আজারবাইজান হয়ে যায়। তবে ইরানের উত্তরাঞ্চলে রাশত ও আস্তারা শহরের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ রেল সংযোগ এখনো অসম্পূর্ণ। ২০২৩ সালে মস্কো এই রেললাইন নির্মাণে অর্থায়নে সম্মত হয়। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট একে ‘বড় ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এটি ‘বিশ্ব বাণিজ্য প্রবাহকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৈচিত্র্যময় করবে।’
তত্ত্বে সহজ, বাস্তবে কঠিন
বিশ্লেষকদের মতে, এসব বিকল্প পথ সাময়িক সমাধান দিতে পারলেও হরমুজ প্রণালির মতো পরিসর ও দক্ষতা সহজে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়। হরমুজ প্রণালি ঐতিহাসিকভাবে দ্রুততম ও সবচেয়ে কম ব্যয়সাপেক্ষ পরিবহনপথ হিসেবে বিবেচিত। হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ অ্যাডাম গ্রিমশ বলেন, ‘ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি এখনো সবচেয়ে দ্রুত এবং সাশ্রয়ী উপায়।’
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক নাদের হাসেমি বলেন, ‘ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সমুদ্রপথে, যা উপসাগরের মধ্য দিয়ে যায়। এই প্রবাহ দ্রুত বা তাৎক্ষণিকভাবে স্থলপথ বা আকাশপথ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।’
মাহদি ঘোদসির মতে, রাশিয়া স্বল্পমেয়াদে কিছুটা সহায়তা দিতে পারে—যেমন খরার সময় শস্য সরবরাহ করেছিল। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি কখনোই সমুদ্রপথের বিশাল বাণিজ্যকে প্রতিস্থাপন করতে পারবে না। স্থলপথে বাণিজ্য ঘুরিয়ে নেওয়া সময়সাপেক্ষ। এতে পণ্যের দাম বাড়ে, আর দ্রুত নষ্ট হয় এমন পণ্য পথে নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে।
রাশিয়ার আগ্রহ কতটা
বেশির ভাগ বিশ্লেষকের মতে, ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বাঁচিয়ে রাখা রাশিয়ার স্বার্থের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। নিউ ইউরেশিয়ান স্ট্র্যাটেজিস সেন্টারের বৈদেশিক নীতি প্রধান জন লফ বলেন, ‘রাশিয়ার নিজেরই অর্থনৈতিক সমস্যা রয়েছে।’ তিনি রাশিয়ার অভ্যন্তরে স্থবিরতার লক্ষণ, রিজার্ভের ওপর চাপ এবং ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় বাড়তে থাকা অসন্তোষের কথা উল্লেখ করেন।
তাঁর মতে, মস্কো প্রতীকী সমর্থন বা সীমিত মানবিক সহায়তা দিতে পারে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এখন ইরানে বড় বিনিয়োগের সময় নয়। তিনি আরও বলেন, বছরের পর বছর বিকল্প করিডর নিয়ে আলোচনা হলেও সমুদ্রপথের পরিবর্তে স্থলপথ ব্যবহার করা অত্যন্ত কঠিন হবে। এতে ইরানের অর্থনীতির খুব একটা লাভও নাও হতে পারে, কারণ দেশটির অর্থনীতি মূলত তেল বিক্রির ওপর নির্ভরশীল।
নাদের হাসেমি বলেন, ‘ইরানের অর্থনীতির বড় অংশ তেল বিক্রির ওপর নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধে তা বাধাগ্রস্ত হলে, রাশিয়া সেই ঘাটতি পূরণ করতে পারবে না।’
তবে সবাই এতটা হতাশ নন। নাঈম আসলাম বলেন, ‘ইরানকে টিকিয়ে রাখলে বৈশ্বিক তেলের দাম বেশি থাকে, যা রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। একই সঙ্গে আইএনএসটিসি-কে এশীয় বাণিজ্যের প্রধান পথ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ অ-পশ্চিমা মিত্রকে বাঁচিয়ে রাখে। ভঙ্গুর উপসাগরীয় বাস্তবতায় এতে মস্কোর কোনো ক্ষতি নেই।’

১৬৩৩ সালে গ্যালিলিও গ্যালিলি যখন পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে—এই বৈজ্ঞানিক সত্য প্রচারের জন্য রোমের ক্যাথলিক চার্চের হাতে নির্যাতিত হয়েছিলেন, তখন বিজ্ঞান ও ধর্মের সংঘাত চূড়ান্ত রূপ নিয়েছিল। প্রায় চার শতাব্দী পর প্রেক্ষাপট নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। আজ খোদ সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তিবিদেরা তাঁদের তৈরি
১৭ মিনিট আগে
জ্বালানি উৎপাদক দেশগুলোর জোট ওপেক ও ওপেক প্লাস বৈশ্বিক তেলের বাজারে তাদের প্রভাব কিছুটা হারাতে পারে। কারণ, জোটের সদস্য দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত ১ মে থেকে এই দুই জোট ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। জোটের প্রতিনিধি ও বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, বাকি উৎপাদক দেশগুলো একসঙ্গেই থাকবে এবং তেল সরবরাহ নীতিতে সমন্বয় চালিয়ে যাবে।
১ ঘণ্টা আগে
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালিতে গত শনিবারের সমন্বিত হামলা ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ কেবল একটি সামরিক সংঘাত নয়, বরং দেশটির ভূরাজনৈতিক সমীকরণে এক বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আসিনি গোইতার সামরিক সরকার বর্তমানে এমন এক সংকটের মুখোমুখি, যা গত ১৫ বছরে দেশটিতে দেখা যায়নি।
১ ঘণ্টা আগে
সংযুক্ত আরব আমিরাত হঠাৎ করেই জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট ‘ওপেক’ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এটি বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের আগেই আমিরাত এই সংগঠনের সদস্য ছিল।
১৭ ঘণ্টা আগে