
ইরানের ড্রোন হামলার হুমকিতে একসময় দুবাইয়ের ফাইন্যান্সিয়াল ডিস্ট্রিক্ট ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। তার পাঁচ মাস পর, হাজার হাজার আন্তর্জাতিক ব্যাংকার ও অ্যাসেট ম্যানেজারদের অফিসগুলোতে ফের ব্যস্ততা ফিরে এসেছে। দুবাইয়ের বন্দর থেকে ইরানে পণ্য পরিবহনের জন্য পারস্য উপসাগরের নীল পানিতে আবারও ঐতিহ্যবাহী কাঠের নৌকা (ধৌ) ভাসতে দেখা যাচ্ছে।
তেহরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম দুবাই বিমানবন্দরে ইরানের ফ্লাইটগুলো নীরবে চালু হয়েছে। একই সঙ্গে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় দেশের বাইরে আটকে পড়া প্রায় ২০ হাজার সংযুক্ত আরব আমিরাতের রেসিডেন্ট পারমিটধারী ইরানিকে ফেরত আসার অনুমতি দিতে শুরু করেছে আমিরাত কর্তৃপক্ষ।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বড় সংকট কাটিয়ে ওঠে কীভাবে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফেরার চেষ্টা করছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও কীভাবে তারা ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর কৌশল নিয়েছে—এসব তারই লক্ষণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি যখন ভেস্তে যাওয়ার মুখে, ঠিক তখন সংযুক্ত আরব আমিরাত এক সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে। একদিকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক জোরদার করেছে, অন্যদিকে ইরানের সাথে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পথগুলো ফের চালু করার চেষ্টা করছে।
যুদ্ধের শুরুর মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের আরব মিত্রদের ওপর তেহরানের প্রায় ৩ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় সবচেয়ে বড় ধাক্কাটির মুখোমুখি হয়েছিল আমিরাত। তারা নিজেরাও পাল্টা ডজন ডজন হামলা চালিয়েছিল এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছিল।
তবে এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি নড়বড়ে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের সাথে শত্রুতা কমিয়ে সমঝোতার দিকে হাঁটার চেষ্টা শুরু করে। একদিকে ক্ষুদ্র কিন্তু চরম উচ্চাকাঙ্ক্ষী এই দেশটি বহু দিন ধরে নিজেদের বিপুল পেট্রোডলার শক্তি দিয়ে অঞ্চলে প্রভাব বাড়াতে চেয়েছে। অন্যদিকে তাদের এই সাম্প্রতিক পদক্ষেপের পেছনে কাজ করছে বাস্তবতা ও কঠোর ভূ-রাজনীতি।
অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের মতো আমিরাতও নতুন করে বুঝতে পেরেছে যে ভৌগোলিক অবস্থানের কাছে তারা বন্দি। তাই অঞ্চলের শীর্ষ পর্যটন, বাণিজ্য ও অর্থায়নের কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে এখন তারা মরিয়া। সংযুক্ত আরব আমিরাতের এক নির্বাহী কর্মকর্তা বলেছেন, ‘এই যুদ্ধ সবার জন্যই এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া ধাক্কা ছিল। যুদ্ধের প্রথম ধাপে কঠোর অবস্থান দেখানো হয়েছিল, কিন্তু এরপর আমরা বাস্তববাদী হয়েছি। আমরা কোনো সিদ্ধান্তে স্থায়ীভাবে আটকে থাকি না, পরিস্থিতি বুঝে তা সংশোধন করি।’
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো ও হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে তেহরানের সঙ্গে যে সমঝোতা স্মারক সই করেন, তা অর্থনৈতিক উদ্যোগগুলোকে আরও গতিশীল করে। এর ফলে আমিরাত ইরানের সঙ্গে কিছু বাণিজ্য শুরু এবং ইরানি বিমান চলাচলের অনুমতি দেয়। একই সঙ্গে আমিরাতের তেল রফতানিও আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
তবে যুদ্ধ থেকে একটি শীতল শান্তিতে পৌঁছানোর এই চেষ্টা যে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ, তা কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন। গত দুই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নতুন করে সংঘাত সে ঝুঁকির চিত্রই ফুটিয়ে তোলে। তেহরান নৌপথটি আবার বন্ধ ঘোষণা করার পর চলতি মাসে প্রণালীতে আমিরাতের দুটি ট্যাংকারকে লক্ষ্যবস্তু করে। তবে সাম্প্রতিক এই পাল্টাপাল্টি হামলায় বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডান, কাতার, ওমান ও সৌদি আরবে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়লেও, তেহরান আমিরাতের ওপর সরাসরি কোনো হামলা চালায়নি।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের শিক্ষাবিদ আব্দুল খালেক আব্দুল্লাহ মনে করেন, তেহরান সরাসরি আঘাত না করা পর্যন্ত এই যুদ্ধবিরতি টিকবে। তিনি বলেন, ‘আপনি কখনো নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারবেন না। কারণ ইরানের দিকটি বেশ বিভ্রান্তিকর এবং বিশ্বাসের ঘাটতি রয়েছে। পরিস্থিতি বেশ ভঙ্গুর। তবে স্বস্তির বিষয় হলো এটি দুই মাস ধরে টিকে আছে।’
আমিরাতের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, এই সমঝোতা তাদের বহুমাত্রিক কৌশলেরই অংশ। এর মাধ্যমে তারা বিশাল ও শক্তিশালী প্রতিবেশীকে সামলাচ্ছে, আবার খারাপ পরিস্থিতির জন্যও প্রস্তুতি রাখছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা নিজেদের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াব, কূটনৈতিকভাবে কাজ করব এবং অর্থনৈতিক শক্তিকেও কাজে লাগাব। সংকট এসেছে সত্যি, তবে তা অতিক্রম করার বিশ্বাসও আমাদের আছে। কিন্তু এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে হবে না, আমাদের নিজেদেরই প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।’
পরিস্থিতির সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল-নাহিয়ান (এমবিজেড) ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর দায়িত্বটি তাঁর তিন ভাইয়ের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি এই স্পর্শকাতর দায়িত্বটি দিয়েছেন আমিরাতের অন্যতম ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ মনসুর, পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শেখ তাহনুনকে। শেখ তাহনুনকে আবুধাবির অন্যতম বাস্তববাদী নেতা মনে করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির এক সপ্তাহ পর শেখ মনসুরের সঙ্গে ইরানের অন্যতম শীর্ষ বেসামরিক যুদ্ধকালীন নেতা ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে প্রধান আলোচনাকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের ফোনালাপের মাধ্যমে সম্পর্কের বরফ প্রথম গলতে শুরু করে। আর গত মাসে যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে কথা বলেন আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ।
আমিরাতি শিক্ষাবিদ আব্দুল্লাহ জানান, আলোচনা ইরানই প্রথম শুরু করেছিল। তিনি বলেন, ‘ইরান নিজ থেকেই বলেছিল—চলুন আলোচনা করি। প্রতিপক্ষ নিজে থেকে আলোচনার প্রস্তাব দিলে তা ফিরিয়ে দেওয়া বোকামি হতো। আর দ্বিতীয় কারণ হলো, এই অনুধাবন যে—যুদ্ধের মাধ্যমে এই সংকটের সমাধান হবে না। যুদ্ধ দিয়ে ইরানের সরকার ফেলে দেওয়া বা তাদের রেভোল্যুশনারি গার্ডসকে পরাজিত করা সম্ভব নয়।’
১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর থেকেই আমিরাত ইরানকে এক হুমকি হিসেবে দেখে এসেছে। এর পর থেকে তেহরানের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে চলতে গিয়ে আবুধাবির সামরিক কড়া মনোভাব এবং বাণিজ্যিক কেন্দ্র দুবাইয়ের ব্যবসাবান্ধব নীতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়েছে। কারণ, দুবাই দীর্ঘদিন ধরে ইরানি বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র।
প্রায় দুই দশক ধরে শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ (এমবিজেড) ইরানের বিশাল ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি নিয়ে সতর্ক করে এসেছেন এবং প্রস্তুতি নিয়েছেন। তবে তা সত্ত্বেও এই আক্রমণের তীব্রতা সংযুক্ত আরব আমিরাতকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।
কূটনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, এমবিজেড মনে মনে চেয়েছিলেন—এই যুদ্ধ যেন ইরানের বর্তমানের সরকার এবং তাদের সামরিক শক্তিকে বেশ ভালোভাবেই দুর্বল করে দেয়। তবে তিনি ও তাঁর উপসাগরীয় সঙ্গীরা এটাও বুঝতে পারছিলেন যে, ট্রাম্প যদি ইরান সরকারকে একেবারে ধসিয়ে না দিয়ে শুধু কিছুটা দুর্বল করে যুদ্ধ থামান, তবে তার জের পোহাতে হবে তাঁদেরকেই। তাঁদের আসল ভয় ছিল, একেবারে ঘরের পাশেই একটা আহত অথচ আরও বেশি মারমুখী শত্রুকে নিয়ে চলতে হবে।
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের এমিল হোকায়েমের মতে, ‘সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন বেশ কঠিন একটা পরিস্থিতির মুখোমুখি। নিজেদের নিরাপত্তা আর অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলে, এমন বিষয়ে তাদের হাতে নিয়ন্ত্রণ খুব কম। তারা বোঝে এর দীর্ঘমেয়াদি ধাক্কাটা বিশাল হতে যাচ্ছে, তাই নতুন বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী আর বাজারের মানুষদের দ্রুত আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে।’
দুবাইয়ের অর্থনীতির জন্য ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক খুবই জরুরি, সেখানে কয়েক লাখ ইরানি বাসও করেন। আমিরাতের নেতারা এটাও আশা করেন যে, বেচাকেনা ও যাতায়াতের জন্য ইরান তাদের ওপর নির্ভরশীল বলেই দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্কটা হয়তো কোনোমতে টিকে থাকবে। ইরানে কোনো টাকা পাঠানোর কথা আবুধাবি অস্বীকার করেছে। কিন্তু স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, যুদ্ধটা যদি একেবারে থমে যায় এবং মার্কিন ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাগুলো উঠে যায়, তবে ইরানের জ্বালানি, বন্দর আর পরিবহন খাতে টাকা ঢালার যথেষ্ট আগ্রহ তাঁদের আছে।
দুবাইয়ের এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ‘ইরান অনেক বড় একটা দেশ, সেখানে বড় বাজার রয়েছে। দুবাই তাদের মূল বাণিজ্য ও পুনর্রপ্তানির কেন্দ্র হওয়ায় লাভটা আমাদেরই। সম্পর্কের সেই পুরোনো জায়গায় ফিরে যাওয়াটা আমাদের জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।’
আমিরাতের এক ব্যবসায়ী দেশে জিনিসপত্রের দাম বাড়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। তিনি বলেন, ‘ইরানকে কোনোভাবেই বাদ দেওয়া সম্ভব নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘চলমান পরিস্থিতির কারণে ইরান থেকে ব্যবসা গুটিয়ে অন্য কোথাও যেতে বললে তা একেবারে অসম্ভব না হলেও মোটেই সহজ নয়। অনেক জিনিস হয়তো অন্য দেশ থেকে আনা যাবে, কিন্তু মাত্র পাঁচ দিরহামের টমেটোর বাক্সটা ইরান ছাড়া আর কোথাও থেকে আসবে না।’
সম্পর্কের এই বরফ কিছুটা গললেও, আমিরাত কিন্তু ইরানকে একবিন্দুও বিশ্বাস করে না। তাই তারা ইসরায়েল আর আমেরিকার সঙ্গে সামরিক সহায়তা আরও জোরদার করার কথা ভাবছে। পাঁচ বছর আগে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পর আমিরাত এখন সেই অঞ্চলে তাদের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। যুদ্ধ শুরুর প্রথম সপ্তাহেই সেই বন্ধুত্বের ফল হাতেনাতে পাওয়া গেছে। ইসরায়েল তড়িঘড়ি করে তাদের ‘আইরন ডোম’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নতুন প্রযুক্তির ‘আইরন বিম’ লেজার ব্যবস্থা আমিরাতের সাহায্যে পাঠিয়ে দেয়।
তারপরের মাসগুলোতে আবুধাবিতে ইসরায়েলি দূতাবাসের আকার দ্বিগুণ বড় করা হয়েছে। এই দূতাবাস এখন সারা বিশ্বে ইসরায়েলের অন্যতম বড় কূটনৈতিক কার্যালয়ে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তি, এআই, শুকনো খাবার, গুদাম আর সামরিক খাতসহ নানা দিকে এখন এই দুই দেশ তাদের লেনদেন বাড়াতে চাইছে। এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানান, ‘আমিরাতে এখন বেশ কিছু ইসরায়েলি সামরিক প্রতিষ্ঠান নিয়মিত কাজ করছে। যুদ্ধের আগেও অনেকে ছিল, কিন্তু এখন তা সব দিকেই ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।’
তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কট্টরপন্থি সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের কিছুটা টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাস হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের সময়। কোনো কোনো আমিরাতি গোপনে নেতানিয়াহুকেই দুষছেন যে, তিনি পুরো অঞ্চলকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। ইসরায়েলের এমন সব কাণ্ডকারখানায় আমিরাতকেও বেশ বিব্রত হতে হয়। তবে আবুধাবির স্পষ্ট কথা—ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের’ মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করাটা তাদের নিজেদেরই কৌশলী স্বার্থের অংশ।
ইরানের বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোন কিন্তু আমিরাতের নিজস্ব আকাশ সুরক্ষাব্যবস্থাই হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়েছে। আর এ কাজে তাদের সাহায্য করেছে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউক্রেনের প্রযুক্তি, সঙ্গে ছিল ব্রিটেন আর ফ্রান্সের যুদ্ধবিমান। আমিরাতের এক কর্মকর্তা বলেন, এই যুদ্ধ বুঝিয়ে দিয়েছে যে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার ভূমিকা কতটা জরুরি।
চলতি মাসেই ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধের সময় ‘মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখার’ জন্য আমিরাতকে পুরস্কৃত করেছে। এর ফলে আমিরাতের জন্য মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম এবং এআই প্রযুক্তির জন্য জরুরি চিপ পাওয়া আরও সহজ হয়ে গেল, যা বিশ্বজুড়ে এআই জগতে আমিরাতের শীর্ষে ওঠার স্বপ্ন পূরণ করবে।
এক পশ্চিমা কর্মকর্তার ভাষায়, বিপদের সময় যে বন্ধুরা সবচেয়ে আগে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, আবুধাবির তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েল একেবারে ওপরের দিকেই থাকবে। তিনি আরও বলেন, যদিও কিছু আমিরাতি মনে করেন এই যুদ্ধ একজন ‘মাথাগরম মার্কিন প্রেসিডেন্ট আর ইসরায়েলের চাল’, যারা অঞ্চলটাকে ভেঙে টুকরো করতে চাইছে। তবুও কঠিন বিপদের দিনে আবুধাবি কিন্তু চোখ মেলে দেখেছে শেষ পর্যন্ত কারা তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল।
যুদ্ধ যখন একেবারে পুরোদমে লড়াই বা পুরোপুরি শান্তির কোনোটাতেই না গিয়ে এক অস্পষ্ট পরিস্থিতিতে এসে পৌঁছেছে, তখন আমিরাতে এখন একটাই শব্দ বারবার উঠছে—‘স্থিতিস্থাপকতা’ বা কঠিন পরিস্থিতি সামলে ওঠার ক্ষমতা। আবুধাবি শুধু তাদের অস্ত্রশস্ত্রই বাড়াতে চাইছে না, গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত ভঙ্গুরতা দূর করতেও কাজ করছে। কর্মকর্তারা এখন দেশের মূল সম্পদের উৎস তেল সরবরাহের পাইপলাইন এবং ভবিষ্যৎ এআই পরিকল্পনার মূল ভিত্তি তথ্য কেন্দ্রগুলো (ডাটা সেন্টার) মাটির নিচে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছেন।
আমিরাতের সেই কর্মকর্তা জোর দিয়ে বলেন, ‘আমাদের যত মূল স্থাপনা আছে, সব সুরক্ষিত করা হবে। আকাশ সুরক্ষাব্যবস্থা দিয়ে সেগুলোকে রক্ষা করা হবে। আমরা একটা মাত্র উৎসের ওপর ভরসা করে থাকব না, সবসময়ই আমাদের বিকল্প তৈরি থাকবে।’ একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে দেশটি নতুন নতুন পথ খুঁজছে, আর খাবারদাবারের সরবরাহ ঠিক রাখতে নতুন গুদাম তৈরি করে খাদ্য নিরাপত্তাও জোরদার করছে।
রসদ সরবরাহকারী সংস্থা ডিপি ওয়ার্ল্ড সংযুক্ত আরব আমিরাতের পূর্ব উপকূলে ফুজেইরাতে দুটি নতুন টার্মিনাল তৈরির পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। মূলত তাদের মূল কেন্দ্র জেবেল আলির ওপর নির্ভরতা কমাতেই এই উদ্যোগ, যা বর্তমানে হরমুজ প্রণালী ইরানের বন্ধ করে দেওয়ার কারণেস ক্ষমতার মাত্র ১০ শতাংশ নিয়ে চালু রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি ‘অ্যাডনক’ আগামী বছরের মধ্যে ফুজেইরায় তাদের তেল রপ্তানি ক্ষমতা দ্বিগুণ করতে একটি নতুন পাইপলাইনের নির্মাণকাজ ত্বরান্বিত করছে। ফুজেইরা হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত গঠনকারী সাতটি আমিরাতের একটি।
দুবাইয়ের এক পরামর্শক বলেন, ‘সংযুক্ত আরব আমিরাত এই বিষয়টিকে বেশ গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে। এখন পুরো মডেলটি বদলে ফেলার সময় এসে গেছে। সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও শক্তিশালী, নতুন ও প্রতিরক্ষামুখী করতে হবে। এসব বিষয় নিয়ে এখন অনেক বেশি আলোচনা চলছে।’ আরেক পরামর্শক জানান, এক জ্যেষ্ঠ আমিরাতি কর্মকর্তার বার্তা ছিল স্পষ্ট, ‘প্রয়োজনে আমরা ভারত মহাসাগর পর্যন্ত একটি খাল খনন করব।’
ব্যাংকার এবং অর্থনীতিবিদদের মতে, দুবাইয়ের অতীতেও সংশয়বাদীদের ভুল প্রমাণ করার ইতিহাস রয়েছে। কোভিড মহামারি যখন তাদের অর্থনৈতিক মডেলকে পরীক্ষায় ফেলেছিল, শহরের বর্তমান অবস্থা সেই সময়ের চেয়েও বেশ শক্তিশালী। অন্যদিকে, তেলসমৃদ্ধ আবুধাবির রয়েছে বিরল আর্থিক সুরক্ষা বলয়, যাদের সার্বভৌম বিনিয়োগ তহবিলে রয়েছে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন বা দুই লক্ষ কোটি ডলারের সম্পদ। এক জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার বলেন, ‘এখানে কোনো দুশ্চিন্তা নেই এবং দিকনির্দেশনা একদম পরিষ্কার। যুদ্ধের সময়ও ব্যবসার চুক্তিপত্র সই হওয়া থামেনি, বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই তা নিরবচ্ছিন্ন রাখা হয়েছিল।’
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিলে সৌদি নেতৃত্বাধীন তেল জোট ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর উৎপাদন বাড়ানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে গত মাসে অ্যাডনকের অপরিশোধিত তেল উৎপাদন দিনে সর্বোচ্চ ৪১ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছিল। তবে প্রথম পরামর্শক আমিরাত নেতাদের সামনের চ্যালেঞ্জের কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘দুবাই এবং আবুধাবি যা চায় তা-ই করতে পারে, কিন্তু সমস্যা হলো এসব সমস্যার সবগুলোর সমাধান সম্ভব নয়। তাদের জ্বালানি অবকাঠামোগুলো উন্মুক্ত সাগরে হওয়ায় বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। ফুজেইরা থেকে রপ্তানি করলেও সেটা আক্রমণের সীমানার মধ্যেই থেকে যায়।’
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সফলভাবে প্রতিহত করতে পারলেও, গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বেসামরিক অবকাঠামোতে এই অবিরাম হামলা আমিরাতের ভিতকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমিরাতের মূল বাণিজ্য পথ জেবেল আলি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। তাই সুপারমার্কেটগুলোর তাক যেন খালি না হয়ে যায়, তা নিশ্চিত করতে বিমানে উড়িয়ে কিংবা সড়কপথে ট্রাক নামিয়ে পণ্য আনা হয়েছিল।
তবে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই ট্রানজিট সেন্টারে অধিকাংশ পশ্চিমা এয়ারলাইন্স এখনও বিমান চলাচল শুরু করেনি। মোটা অঙ্কের ছাড় দেওয়ার পরও হোটেলগুলোতে অতিথির উপস্থিতি ধসে পড়েছে। দুবাইয়ের বিখ্যাত বুর্জ আল আরব এবং আরমানি হোটেলসহ শীর্ষস্তরের অর্ধেকেরও বেশি বিলাসবহুল হোটেল সংস্কারের অজুহাতে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে বহু রেস্তোরাঁ তাদের দরজা বন্ধ করেছে।
দুবাই ধীরে ধীরে কিছুটা ব্যস্ত হতে শুরু করলেও, তীব্র গরমের সঙ্গে সঙ্গে তারা পর্যটনের মন্দা মৌসুমের জোড়া ধাক্কার মুখোমুখি হচ্ছে। আরেক আন্তর্জাতিক ব্যাংকার বলেন, ‘কোনো হামলা ছাড়া প্রতিটি সপ্তাহ পার হলে কিছুটা স্বস্তি লাগে ঠিকই, তবে পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না—কারণ পর্যটক নেই। পরিস্থিতি সুন্দরভাবে সামাল দেওয়া গেছে দেখে অনেকের মনে হতে পারে কোনো সংকট নেই, কিন্তু বাস্তবে আয় ভীষণ কমে গেছে এবং প্রচুর মূলধন বাইরে চলে গেছে।’
সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৬টি রেস্তোরাঁর মালিক তাশাশ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও নাতাশা সিদেরিস জানান, কর্মচারীদের বেতন ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর প্রস্তাব দিতে গিয়ে তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন। দুবাই ফিন্যান্সিয়াল সেন্টারে অবস্থিত তাদের মূল রেস্তোরাঁর ব্যবসা প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গিয়েছিল, তবে জুন থেকে পরিস্থিতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে।
তিনি জানান, স্কটিশ স্যামন ও ভেড়ার মাংসের মতো কিছু উপাদানের ঘাটতি দেখা দেওয়ায় এবং খরচ বেড়ে যাওয়ায় মেনুর আকার ছোট করতে হয়েছিল। সিদেরিস বলেন, ‘পরিস্থিতি কোভিডের চেয়েও খারাপ ছিল, কারণ তখন অন্তত একটা নির্দিষ্ট পরিকল্পনা জানা ছিল। কোভিডের সময়ে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ব্যবসা বন্ধ রাখতে হতো, যার ফলে বাড়িওয়ালাদের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ ছিল। কিন্তু এভাবে টেনেটুনে কোনোমতে টিকে থাকাটা আরও অনেক বেশি কষ্টের।’
তবে ব্যবসা আবারও ফিরছে জানিয়ে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ব্যবসা অন্তত পূর্বের স্থিতাবস্থায় ফিরবে এবং আগামী বছর থেকে বড় উত্থান ঘটবে। আসল পরীক্ষাটা হতে যাচ্ছে সেপ্টেম্বর মাসে। স্কুলগুলো খুললে বোঝা যাবে কতজন প্রবাসী দেশে ফিরেছেন, আর তাপমাত্রা কমলে বোঝা যাবে পর্যটকদের ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সংযুক্ত আরব আমিরাত কতটা সফল হচ্ছে।
এক ব্রিটিশ প্রবাসী জানান, তাঁর পরিচিত অনেকেই ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে সন্তানদের স্কুলের আসন বরাদ্দ করে রেখেছেন। গ্রীষ্মের ছুটি কাটানোর পরই তারা দুবাইয়ে ফেরার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে ব্যাংকারদের দাবি, দুবাইয়ে স্থানান্তরিত হওয়ার চাহিদা এখনও বিদ্যমান। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক নতুন উত্তেজনা দুবাইয়ে ফিরতে শুরু করা ইতিবাচক মেজাজটিকে আবারও খানিকটা ধাক্কা দিয়েছে।
সেই আমিরাতি কর্মকর্তা বলেন, ‘সপ্তাহখানেক আগেও সবার মাঝে বেশ আশাবাদ দেখা যাচ্ছিল, কিন্তু এখন কিছু ডেভলপার আবারও দুশ্চিন্তায় পড়ছেন।’
যুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে নিজের পথ খুঁজে নিতে দুবাই কোনো চেষ্টাই বাকি রাখবে না উল্লেখ করে তিনি আরও যোগ করেন, ‘অনেক পরিকল্পনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কিন্তু যুদ্ধ পুরোপুরি থামলেই কেবল সেগুলোর কোনো অর্থ থাকবে।’
অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র উন্মুক্ত করা নথিতে দেখা যায়, তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন এই প্রকল্পকে অত্যন্ত কৌশলগত গুরুত্ব দিয়েছিল। সিআইএ-র মূল্যায়নে বলা হয়, সুয়েজ খাল বা আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ হয়ে তেল পরিবহনের চেয়ে এই ইসরায়েলি রুটটি অনেক বেশি সাশ্রয়ী।
৭ ঘণ্টা আগে
ইরানের একটি মালবাহী জাহাজে ইউক্রেনের হামলার ঘটনায় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও ঘনিষ্ঠভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ২৫ জুলাই কাস্পিয়ান সাগরে চালানো ওই হামলা দুই দেশের মধ্যে চলমান পরোক্ষ সংঘাতকে সরাসরি মুখোমুখি অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন
১ দিন আগে
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেপাল সরকার ২৬টি জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করে। সরকারের দাবি ছিল, এসব প্ল্যাটফর্ম অপতথ্য ও অনলাইনে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য রোধে তৈরি নতুন নিয়ম মেনে চলতে ব্যর্থ হয়েছে।
১ দিন আগে
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে রাজনৈতিকভাবে প্রায় অপরাজেয় বলেই মনে করা হচ্ছিল। বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই গণতন্ত্রের দেশে তিনি এমন এক সরকার পরিচালনা করছেন—যা বিরোধীদের কোণঠাসা করেছে, জনপরিসরের আলোচনাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে এবং ভিন্নমত প্রকাশের পথ সঙ্কুচিত করেছে।
১ দিন আগে