
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক হামলা এবং বাব আল-মানদেব ও হরমুজ প্রণালিতে চরম নিরাপত্তাহীনতার মুখে লোহিত সাগর দিয়ে সৌদি আরবের জ্বালানি তেল পরিবহনে নজিরবিহীন সংকট তৈরি হয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় বিকল্প হিসেবে ইসরায়েলের ভূখণ্ড দিয়ে যাওয়া বহু পুরোনো ও অত্যন্ত গোপনীয় একটি তেল পাইপলাইন ব্যবহারের প্রস্তাব নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের নীতিনির্ধারণী মহলে আলোচনা জোরালো হচ্ছে।
সম্প্রতি সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলীয় জাজান এবং ইয়ানবু এলাকার তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে হুতিরা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৭ জুলাই জাজানের দৈনিক ৪ লাখ ব্যারেল উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি শোধনাগার লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলে কোম্পানিটির ‘ইন্টিগ্রেটেড গ্যাসিফিকেশন কম্বাইন্ড সাইকেল (আইজিসিসি) কমপ্লেক্স এবং ফুয়েল ট্যাংক ফার্ম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে শোধনাগারটির উৎপাদন কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে, যা সংস্কার করতে আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি ও রয়টার্সের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, লোহিত সাগরে সৌদি তেলের সুরক্ষায় ইসরায়েলের বিতর্কিত ‘ইলাইত-আশকেলন’ পাইপলাইন ব্যবহারের প্রস্তাব ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক উভয় দিক থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইলাইত-আশকেলন পাইপলাইনের গোপন ইতিহাস
২৫৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ৪২ ইঞ্চি ব্যাসের এই পাইপলাইনটির ইতিহাস মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি ও গোপন কূটনীতির এক জটিল অধ্যায়। ১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে ইরানের শেষ সম্রাট (শাহ) মোহাম্মদ রেজা পাহলভীর শাসনামলে ইরান ও ইসরায়েলের যৌথ গোপন অংশীদারত্বে এটি নির্মিত হয়। উদ্দেশ্য ছিল মিশর নিয়ন্ত্রিত সুয়েজ খালকে পাশ কাটিয়ে লোহিত সাগরের ইলাইত বন্দর থেকে ভূমধ্যসাগরের আশকেলন বন্দরে ইরানি অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করা।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র উন্মুক্ত করা নথিতে দেখা যায়, তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন এই প্রকল্পকে অত্যন্ত কৌশলগত গুরুত্ব দিয়েছিল। সিআইএ-র মূল্যায়নে বলা হয়, সুয়েজ খাল বা আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ হয়ে তেল পরিবহনের চেয়ে এই ইসরায়েলি রুটটি অনেক বেশি সাশ্রয়ী। প্রথম দিকে বার্ষিক ২ কোটি টন তেল পরিবহনের লক্ষ্য থাকলেও ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে তা বাড়িয়ে সাড়ে ৫ থেকে ৬ কোটি টনে উন্নীত করা হয়।
তবে ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর দুদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হলে ইসরায়েল এককভাবে এই পাইপলাইনের নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরবর্তীতে পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সালিশি আদালত ইরানকে ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য ইসরায়েলকে নির্দেশ দিলেও ইসরায়েল তা প্রত্যাখ্যান করে। তাদের দাবি, শত্রুপক্ষকে অর্থ প্রদান তাদের রাষ্ট্রীয় আইনবিরোধী। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাজনিত কঠোর গোপনীয়তা মেনে ১৯৬৮ সালের বিশেষ নিরাপত্তা আইনে ইউরোপ এশিয়া পাইপলাইন কোম্পানি (ইএপিসি) এটি পরিচালনা করছে।
ইসরায়েলের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব ও কারিগরি হিসাব
ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স সংস্থা ‘OSINT613’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক জয় লেটনি এনডিটিভিকে জানান, ইসরায়েলি সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে বেশ জোরেশোরে আলোচনা চলছে।
তিনি জানান, গত জুলাইয়ের শুরুর দিকে ইসরায়েলের জ্বালানিমন্ত্রী ইলি কোহেন ওয়াশিংটনের কাছে সৌদি আরব থেকে ইসরায়েলের ইলাইত পর্যন্ত ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সংযোগ পাইপলাইনের আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা পেশ করেন। তিনি স্পষ্ট বার্তায় যুক্তরাষ্ট্রকে জানান, ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যের মূল জ্বালানি হাবে রূপান্তর করাই তাদের লক্ষ্য।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় খনিগুলো থেকে ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’ দিয়ে তেল প্রথমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে নেওয়া হবে। সেখান থেকে ট্যাংকারের মাধ্যমে তেল উত্তরে আকাবা উপসাগর পার হয়ে ইসরায়েলের ইলাইত বন্দরে পৌঁছাবে। পরবর্তীতে ইলাইত-আশকেলন পাইপলাইন দিয়ে তা ভূমধ্যসাগরীয় রুটে ইউরোপের বাজারে পাঠানো সম্ভব।
কারিগরি দিক থেকে এই পাইপলাইনের উল্টো প্রবাহে দৈনিক ১২ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত তেল পরিবহন সম্ভব। সৌদি আরবের মোট তেল রপ্তানি দৈনিক ৬০ থেকে ৭৫ লাখ ব্যারেল। ফলে এই রুট দিয়ে সৌদি আরবের মোট রপ্তানির প্রায় ৫ থেকে ১৫ শতাংশ সরবরাহ করা সম্ভব, যা মূল সংকট নিরসন না করলেও ইউরোপের বাজারের জন্য বড় সুবিধা হতে পারে।
পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও নিরাপত্তাহীনতা
তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে বড় কারিগরি ও নিরাপত্তাজনিত বাধা রয়েছে। বিশ্লেষক জয় লেটনি জানান, হুতিদের অব্যাহত হামলায় ইলাইত বন্দরের বাণিজ্যিক কার্যক্রম ইতিমধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ ধসে পড়েছে এবং ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে বন্দরটি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছিল। সৌদি আরবের মতো বিশাল পরিমাণ তেল ওঠানামা করানোর সক্ষমতা বর্তমানে ইলাইতের নেই। এখানে অতি বৃহৎ তেলবাহী জাহাজ (ভিএলসিসি) নোঙরের জন্য গভীর ড্রেজিং, তেলের ডিপো সম্প্রসারণ এবং কোটি কোটি ডলারের অবকাঠামোগত বিনিয়োগ প্রয়োজন।
এ ছাড়া, মরুভূমির মধ্য দিয়ে যাওয়া ২৫৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। গত পাঁচ বছরে যান্ত্রিক ত্রুটিজনিত অন্তত ১১টি লিক এবং ৯টি অন্তর্ঘাতমূলক বা মানবসৃষ্ট দুর্ঘটনা ঘটেছে। ২০২১ সালে এটি রকেট হামলার শিকার হয়। এমনকি ২০২৫ সালের জুনেও ইরানি হামলায় বাজান তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিশ্বজুড়ে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সফলতার হার প্রায় ৯২ শতাংশ হওয়ায় এই ঝুঁকি কিছুটা কম হতে পারে।
অন্যদিকে মিশর, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের যৌথ মালিকানাধীন সুয়েজ-মেডিটেরেনিয়ান পাইপলাইনের দৈনিক সক্ষমতা ২৫ লাখ ব্যারেল (যার ১৫% মালিকানা সৌদি আরামকোর)। সুয়েজ পাইপলাইন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি রুটটি মূলত দ্বিতীয় বিকল্প হিসেবেই বিবেচিত হবে।
ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা ও আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর অবস্থান
প্রযুক্তিগত সম্ভাবনার চেয়ে এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় বাধা রাজনৈতিক। সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি।
সৌদি আরব বারবার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কোনো সুযোগ নেই। অন্যদিকে ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ সম্প্রতি সৌদি সম্প্রচার মাধ্যম আল আরাবিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ইসরায়েল ও সৌদি আরবের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা আমার স্বপ্ন।’
তবে ইসরায়েলি মন্ত্রী ইলি কোহেন সাম্প্রতিক মন্তব্যে বলেন, ‘ইসরায়েলের যতটা সৌদি আরবকে প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশি সৌদি আরবের প্রয়োজন ইসরায়েলকে।’
তবে বিশ্লেষক জয় লেটনির মতে, বর্তমান স্যাটেলাইট ইমেজিং এবং আন্তর্জাতিক নজরদারির যুগে গোপনে এই পাইপলাইন দিয়ে তেল রপ্তানি করা অসম্ভব। রিয়াদ যদি সরাসরি এই চুক্তি স্বীকার করে, তবে ফিলিস্তিন ইস্যুতে আরব ও মুসলিম বিশ্বে প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে এবং ইরান ও হুতিরা রাজনৈতিকভাবে একে সৌদি-ইসরায়েল অক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করে হামলা জোরদার করবে।
অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ এই প্রকল্পের অনুকূলে। ওয়াশিংটন চায় হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে, লোহিত সাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি ও ব্যয় হ্রাস করতে এবং ইউরোপের জন্য রাশিয়া বা মিশর-বহির্ভূত বিকল্প জ্বালানি পথ তৈরি করতে। তবে রিয়াদ ও তেল আবিবের রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া এই দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন হওয়া কঠিন।

ইরানের একটি মালবাহী জাহাজে ইউক্রেনের হামলার ঘটনায় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও ঘনিষ্ঠভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ২৫ জুলাই কাস্পিয়ান সাগরে চালানো ওই হামলা দুই দেশের মধ্যে চলমান পরোক্ষ সংঘাতকে সরাসরি মুখোমুখি অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন
১৮ ঘণ্টা আগে
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেপাল সরকার ২৬টি জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করে। সরকারের দাবি ছিল, এসব প্ল্যাটফর্ম অপতথ্য ও অনলাইনে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য রোধে তৈরি নতুন নিয়ম মেনে চলতে ব্যর্থ হয়েছে।
১ দিন আগে
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে রাজনৈতিকভাবে প্রায় অপরাজেয় বলেই মনে করা হচ্ছিল। বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই গণতন্ত্রের দেশে তিনি এমন এক সরকার পরিচালনা করছেন—যা বিরোধীদের কোণঠাসা করেছে, জনপরিসরের আলোচনাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে এবং ভিন্নমত প্রকাশের পথ সঙ্কুচিত করেছে।
১ দিন আগে
বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন রাজনৈতিক মহলে একটা প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে—তিনি কি ১৯৭৭ সালের ইন্দিরা গান্ধীর মতো প্রত্যাবর্তন করতে পারবেন? তাঁর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও অনমনীয় মনোভাব দেখে...
১ দিন আগে