Ajker Patrika

এনপিআরের নিবন্ধ

ককরোচ ইন দ্য মেশিন: দক্ষিণ এশিয়ায় জেন–জি যেভাবে এলিটদের গদি নাড়িয়ে দিচ্ছে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ককরোচ ইন দ্য মেশিন: দক্ষিণ এশিয়ায় জেন–জি যেভাবে এলিটদের গদি নাড়িয়ে দিচ্ছে
ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট ভারতে আশ্রয় নেওয়ার মাধ্যমে শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। ফাইল ছবি

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেপাল সরকার ২৬টি জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করে। সরকারের দাবি ছিল, এসব প্ল্যাটফর্ম অপতথ্য ও অনলাইনে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য রোধে তৈরি নতুন নিয়ম মেনে চলতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, রাজনীতিবিদ ও তাদের সন্তানদের (স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে সুবিধা পাওয়া সন্তান) বিলাসী জীবনযাপনের ভাইরাল ভিডিও চেপে রাখার জন্যই সরকার এই পদক্ষেপ নিয়েছিল। এর পরপরই ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয় এবং কয়েক দিনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি পদত্যাগ করেন।

এর ঠিক এক বছর আগে, ২০২৪ সালের আগস্টে, একই ধরনের আরও বৃহৎ পরিসরে একটি ছাত্র–জনতার গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের শাসক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বংশধরদের জন্য সরকারি চাকরির ৩০ শতাংশ কোটা বহাল রাখার হাইকোর্টের এক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। নেপালের মতোই বাংলাদেশের এই আন্দোলনটির নেতৃত্বও দিয়েছিল জেন-জি।

এই অভ্যুত্থানগুলো একটি সাধারণ চরম বৈষম্যের ছবি ফুটিয়ে তোলে—যুবসমাজের সুযোগ-সুবিধা যখন থমকে গেছে, তখনো অভিজাত শ্রেণীর বিশেষ সুযোগ-সুবিধা টিকে রয়েছে। প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রেই একটি একক ঘটনা পুরো অসন্তোষের মূল কারণ ছিল না; বরং তা স্ফুলিঙ্গ হিসেবে কাজ করে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে।

এখন একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে ভারতে—যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় তরুণ জনসংখ্যার দেশ। ভারত যদিও নেপাল ও বাংলাদেশের চেয়ে অনেকটাই আলাদা, তবুও তরুণদের মধ্যে বাড়তে থাকা ক্ষোভের বেশ কিছু একই রকম কারণ সেখানে দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। উদাহরণস্বরূপ, অর্থনৈতিক উন্নতি হওয়া সত্ত্বেও আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী গ্র্যাজুয়েটদের প্রায় ৪০ শতাংশ এবং ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের ২০ শতাংশই বেকার।

দেশজুড়ে মারাত্মক ছাত্র আন্দোলনের মুখে প্রবল চাপের মুখে শনিবার ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। বেশ কিছুদিন ধরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। এর কয়েক সপ্তাহ আগে, ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত একটি মন্তব্য করে তুমুল ক্ষোভের জন্ম দেন, যাকে অনেকে বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করা বলে মনে করেছিলেন। যদিও পরে তিনি দাবি করেন যে তার বক্তব্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তরুণ ভারতীয়রা এই মন্তব্যটিকেই আন্দোলনের মূল স্লোগানে পরিণত করে।

এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি কেন হচ্ছে

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনবহুল এই অঞ্চলে কেন বারবার একই চিত্র দেখা যাচ্ছে? কাঠামোগত তিনটি মূল কারণ ব্যাখ্যা করতে পারে যে কেন দক্ষিণ এশিয়ার জেন-জি তাদের ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে।

প্রথমত, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার একটি বড় অংশ প্রশংসনীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও, এই সম্পদ বৃদ্ধি কিন্তু বৈষম্য দূর করতে বা নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। প্যারিসভিত্তিক ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি ল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট সম্পদের ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশ রয়েছে দেশের মাত্র ১০ শতাংশ ধনী মানুষের হাতে, আর নিচের সারির অর্ধেক মানুষের হাতে আছে মাত্র ৪ দশমিক ৭ শতাংশ সম্পদ।

অন্যদিকে নেপালে, যেখানে মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশই ৩০ বছরের কম বয়সী, সেখানে গত বছর ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রতি ৫ জনের মধ্যে ১ জনই বেকার ছিলেন। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এদের অনেকেই উচ্চশিক্ষিত এবং ক্যারিয়ার নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখতেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের এক হতাশাজনক ভবিষ্যতের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের এই ক্ষোভ দানা বেঁধেছে সর্বব্যাপী সরকারি দুর্নীতির কারণে। বাংলাদেশে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা প্রদান থেকে শুরু করে ভারতে প্রশ্নপত্র ফাঁস—তরুণরা ক্রমেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়নের ব্যবস্থা আর অবশিষ্ট নেই। গত সপ্তাহে ২৩ বছর বয়সী এক ভারতীয় আন্দোলনকারী এনপিআরকে বলেন, ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাচ্ছে, ধনীরা টাকা দিয়ে তাদের সন্তানদের পাস করাচ্ছে, আর আমাদের মতো গরিব মানুষরা পিছিয়ে পড়ছে...আমরা কোথায় যাব?’

তৃতীয়ত, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা শুধু যে মানুষকে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন করেছে তাই নয়, এটি তাদের আকাঙ্ক্ষা বাড়িয়েছে এবং আন্দোলনকারী তরুণদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথে নামার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার দিয়েছে। অনলাইনে বাকস্বাধীনতা বা আলোচনা বন্ধের চেষ্টা উল্টো ফল দিতে পারে। গত বছর নেপালে সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধের সরকারি চেষ্টা জনরোষকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং মানুষকে দ্রুত রাজপথে নামতে বাধ্য করেছিল।

এলিটদের জন্য ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যাগত সুবিধার অন্ধকার দিক

দিল্লিতে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর ছাত্র নেতারা ‘সদাচার ও সদিচ্ছার’ অংশ হিসেবে আপাতত বিক্ষোভ স্থগিত করেছেন। কিন্তু তাদের মনের গভীরে জমা হওয়া ক্ষোভ এত সহজে মুছে যাবে না। প্রকৃত স্থিতিশীলতা তখনই আসবে, যখন শাসকগোষ্ঠী তরুণদের সুযোগ-সুবিধার এই দীর্ঘদিনের ঘাটতি মেটাতে সত্যি সত্যি আন্তরিক পদক্ষেপ নেবে।

পুরো দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে শাসকরা এতদিন তাদের ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর সুবিধা নিয়ে গর্ব করে এসেছেন। তবে তারা এখন এর অন্ধকার দিকটিও দেখতে পাচ্ছেন—তরুণদের এই বিপুল সম্ভাবনা যদি কাজে লাগানো না যায়, তবে তা খুব সহজেই সরকারের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত