ইরান যুদ্ধের উত্তাপ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বিশ্বজুড়ে ছড়াতে শুরু করেছে। তেহরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় থমকে গেছে তেলবাহী ট্যাংকার, আর বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী। এ পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি মুক্ত করতে ইউরোপীয় মিত্রদের সামরিক সহায়তা চাইলেও তারা এখন পর্যন্ত সাড়া দেয়নি। তবে অর্থনৈতিক মন্দার চাপ যত বাড়বে, ইউরোপের এই কঠোর অবস্থান ততটাই কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়বে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে এক পডকাস্টে আলোচনা করেছেন ফরেন অ্যাফেয়ার্সের ডেপুটি এডিটর ক্লো ফক্সের সঞ্চালনায় নাতালি তচ্চি এবং ম্যাথিয়াস ম্যাথিস। তাঁদের আলোচনায় উঠে এসেছে ইউরোপ ও আমেরিকার বিচ্ছেদের সমূহ আশঙ্কার কথা।
আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে ৩ মার্চ ২০২৬-এ জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জের হোয়াইট হাউস সফর। মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার ঠিক তিন দিন পরই ট্রাম্পের পাশে নিশ্চুপ বসে ছিলেন জার্মানির চ্যান্সেলর মার্জ। এই দুই বিশ্লেষক এটিকে ইউরোপীয় ঐক্যের জন্য এক বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে যখন ট্রাম্প স্পেনের মতো একটি ইউরোপীয় মিত্র দেশের সমালোচনা করছিলেন (কারণ স্পেন তাদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারে বাধা দিয়েছিল), তখন মার্জের নীরবতা ছিল স্পেনের পিঠে ‘ছুরিকাঘাতের’ শামিল।
ম্যাথিস মনে করেন, ২০২৫ সালে ইউরোপ ভুল পথ বেছে নিয়েছিল। আমেরিকার সঙ্গে সমমর্যাদার অংশীদার হিসেবে দর-কষাকষি করার বদলে ইউরোপ তখন অনেকটা অবলীলায় বশ্যতা স্বীকারের ভঙ্গি গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ইউরোপ যেভাবে রুখে দাঁড়িয়েছিল, তা ছিল তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর একটি ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ বা আদর্শ উদাহরণ। তবে ইরান সংকট সেই অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিয়েছে। ইউরোপ এখন বুঝতে পারছে, ট্রাম্পের সামনে নতজানু হলে কেবল অপমানই জোটে; কিন্তু যখন তারা শক্ত হয়ে দাঁড়ায় (যেমন স্পেন বা গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে), তখন ট্রাম্প পিছিয়ে যেতে বাধ্য হন।
জার্মানির চ্যান্সেলর মার্জের অবস্থান নিয়ে নাতালি তচ্চি বলেন, ‘সেই মুহূর্তের বিড়ম্বনা কেবল ইউরোপের বশ্যতা স্বীকার ছিল না; বরং এটি ছিল ইউরোপের নিজের সঙ্গেই নিজের বিশ্বাসঘাতকতা। ট্রাম্প যখন পাশে বসে অন্য একটি ইউরোপীয় দেশের (স্পেন) সমালোচনা করছিলেন, তখন মার্জের নীরব থাকাটা ছিল আসলে নিজের মিত্রের পিঠে ছুরিকাঘাত করার মতো।’
ইউরোপের কৌশল নিয়ে ম্যাথিয়াস ম্যাথিস মন্তব্য করেন, ইউরোপ আসলে সুপার পাওয়ার হতে চায় না; তারা কেবল তাদের নিজেদের গণ্ডিতে স্থিতিশীলতা চায়। কিন্তু ইরান সংকট তাদের সামনে এক বড় অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। তাঁরা এখন বুঝতে পারছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের তোষামোদ করা বা তাঁর সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে থাকা আসলে কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।
আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি ইউরোপের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নাতালি তচ্চি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার নিজের দেশের (ইতালি) প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি পার্লামেন্টে গিয়ে বলছেন, “হ্যাঁ, এটি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন; কিন্তু আমরা এর নিন্দাও করি না, সমর্থনও করি না।” এ ধরনের অবস্থান আসলে একধরনের নৈতিক আত্মসমর্পণ, যা জঙ্গলের আইন বা ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতিকেই উৎসাহিত করে।’
ইউরোপের সামনে এখন দুটি পথ খোলা। হয় তারা ট্রাম্পের প্রতিটি অন্যায় আবদারে ‘হ্যাঁ’ বলবে এবং নিজেদের নীতি বিসর্জন দেবে অথবা তারা স্পেনের মতো সাহসী অবস্থান নিয়ে নিজেদের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ প্রমাণ করবে। তচ্চি এবং ম্যাথিসের মতে, ইউরোপ যদি নিজেদের মূল্যবোধ এবং আন্তর্জাতিক আইন রক্ষা করতে না পারে, তবে তারা বিশ্বরাজনীতিতে কেবল একটি ‘প্রান্তিক শক্তি’ হিসেবেই টিকে থাকবে।
ইউরোপের বর্তমান পছন্দ ও চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে তাঁরা আরও বলেন, ইউরোপ এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে আমেরিকার নিরাপত্তাবলয়ের প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে ট্রাম্পের জবরদস্তিমূলক নীতি—এই দুয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ইউরোপকে এখন বেছে নিতে হবে তারা কি ওয়াশিংটনের আজ্ঞাবহ হয়ে থাকবে, নাকি একটি স্বাধীন বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করবে।
আলোচকদের মতে, ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের চেয়েও বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। তখন ইউরোপ বিভক্ত ছিল; কিন্তু এখন তারা মানসিকভাবে অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ থাকা সত্ত্বেও কোনো সম্মিলিত পদক্ষেপ নিতে পারছে না। এর অন্যতম কারণ হলো, ইউরোপের ডানপন্থী রাজনীতির উত্থান, যা ওয়াশিংটনের জাতীয়তাবাদী ভাবধারার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।
ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সুদীর্ঘ মিত্রতায় ফাটল এখন স্পষ্ট। ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষত যখন আরও গভীর হবে, তখন ইউরোপের দেশগুলোর ঐক্য টিকে থাকবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। তোষণনীতি, নাকি কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন— ইউরোপের এ সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে আগামী কয়েক দশকের বিশ্বব্যবস্থা। আমেরিকার সঙ্গে তাদের এই ‘ডিভোর্স’ বা বিচ্ছেদ শেষ পর্যন্ত বাস্তব রূপ নেয় কি না, তা সময়ই বলে দেবে।

এই যুদ্ধ ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের দিকে আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে তুলবে। সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পারমাণবিক বোমা নিষিদ্ধ-সংক্রান্ত ফতোয়া তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হয়ে গেছে। ৪৪ কেজি উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হাতে থাকা আইআরজিসি এখন উত্তর কোরিয়ার উদাহরণ অনুসরণ করতে চাইবে...
৪ ঘণ্টা আগে
মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার সুবাদে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম ধমনি হরমুজ প্রণালিকে একটি ‘টোল বুথে’ পরিণত করেছে ইরান। একদিকে যেমন তাঁরা বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করছে, অন্যদিকে নির্দিষ্ট কিছু শর্তে বা মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।
৮ ঘণ্টা আগে
এই ধাক্কা এশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও শুষে নিতে পারে। এডিবির মতে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্ট এবং দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ পয়েন্ট কমতে পারে। এর ফলে এশিয়ার দেশগুলো এখন সৌরশক্তি এবং ইলেকট্রিক গাড়ির দিকে ঝুঁকছে।
৯ ঘণ্টা আগে
ইরান যুদ্ধ ঘিরে একের পর এক আলোচনার জন্ম দিয়ে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার দেশটির ইতিহাসে নতুন করে লেখা হবে ট্রাম্পের নাম। মার্কিন ইতিহাসে তাঁর পরিবারই হচ্ছে প্রথম কোনো প্রেসিডেন্টের পরিবার, যারা যুদ্ধের ডামাডোল কাজে লাগিয়ে প্রকাশ্যেই অর্থ উপার্জন করবে।
১৭ ঘণ্টা আগে