Ajker Patrika

নিউইয়র্ক টাইমসের নিবন্ধ /সংঘাত বাড়িয়েই যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে ইরান

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬: ০৫
সংঘাত বাড়িয়েই যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে ইরান
হরমুজ প্রণালিতে অবস্থানরত জাহাজ। ছবি: এএফপি

মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানির পথগুলো ক্রমেই কমে আসছে। জ্বালানির দাম আকাশছোঁয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলো হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের কিছু ধরনের কর্তৃত্ব মেনে নেওয়ার বিষয়ে সম্মতি দিতে পারে বলে মনে হচ্ছে।

গত এক সপ্তাহে ইরান ও তার মিত্ররা সামরিক উত্তেজনা বাড়িয়ে পুরো অঞ্চলের সামান্য স্থিতিশীলতার পরিবেশও ভেঙে দিয়েছে। ইয়েমেনে এই পরিস্থিতি সবচেয়ে নাটকীয়ভাবে দেখা গেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধে পরিস্থিতির গতি কিছুটা ইরানের পক্ষে ঘুরে যাচ্ছে।

তবে এই পরিবর্তন চূড়ান্ত বা নির্ধারক নাও হতে পারে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এখনো ব্যাপক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান নৌ অবরোধ এবং একের পর এক বাড়তে থাকা নিষেধাজ্ঞা ইরানকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। তারপরও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরান ও তার মিত্রদের ধারাবাহিক হামলা সংঘাতের পরিধি আরও বাড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে অন্তত এই মুহূর্তে তেহরানের দর-কষাকষির ক্ষমতা বেড়েছে।

ইরানের মিত্র ইয়েমেনের হুতিরা গত শুক্রবার লোহিত সাগরের একটি দ্বীপ দখল করেছে। এর ফলে তারা এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথে অবস্থান নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে, যেখান থেকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল পরিবহনকারী জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা সম্ভব।

থিংক ট্যাংক ইউরেশিয়া গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রু বলেন, ‘ইয়েমেনে হুতিদের সাফল্য ইরানের পক্ষে পাল্লা আবার ভারী করেছে।’ তাঁর মতে, ইরান ‘পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ আবার শুরু না করেই পরিস্থিতির স্থিতাবস্থা বদলাতে’ সক্ষম হয়েছে। আর এই মুহূর্তে ইরানের শাসকগোষ্ঠী সম্ভবত পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ চায় না। ইরান হুতিদের অস্ত্র, অর্থ ও রসদ দিয়ে সহায়তা করে। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, শিয়া এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি ইয়েমেনে ইরানের স্বার্থের সরাসরি বাহক নয়, আবার তেহরানের প্রভাব থেকেও পুরোপুরি স্বাধীন নয়।

গত শুক্রবার তেলের দাম সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১০ ডলারে উঠে যায়। যুদ্ধ শুরুর আগের দামের তুলনায় এটি প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। এর ফলে ইরানের ওপর আরও একটি সুবিধা তৈরি হয়েছে। কারণ জ্বালানির উচ্চমূল্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে, বিশেষ করে শরৎকালে তার দল যখন নির্বাচনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব ইরান যুদ্ধের শুরুর দিকে কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকে লোহিত সাগরের ওপর ক্রমেই বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কিন্তু জুলাইয়ে হুতিরা সৌদি জাহাজের ওপর অবরোধ ঘোষণা করে। তারা লোহিত সাগর দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে গুলি চালায় এবং সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলোতেও হামলা চালায়। গত মাসে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি কমে অন্তত ১৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়। এর সঙ্গে নতুন করে সমস্যা তৈরি হয় শুক্রবার। ড্রোন হামলার পর সৌদি আরবের লোহিত সাগরীয় বন্দরগুলোতে তেল বহনকারী একটি পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে।

হামলাটি কারা চালিয়েছে, তা স্পষ্ট হয়নি। তবে সৌদি আরব অতীতে ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে দেশটির জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার অভিযোগ করেছে। গতকাল শনিবার ট্রাম্পও বলেন, এই হামলার জন্য ইরান ‘সম্ভবত’ দায়ী। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে উপসাগরীয় মিত্রদের জন্য দীর্ঘদিনের মার্কিন নিরাপত্তা নিশ্চয়তা কতটা নির্ভরযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কারণ এসব দেশ ইরানি বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে।

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পকে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে আলোচনার বিষয়ে অবগত কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ট্রাম্প তা করতে রাজি হননি। শনিবার ট্রাম্প বলেন, হুতিরা তার প্রশাসনকে জানিয়েছে যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াই চায় না। যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে যে পরিমাণ জাহাজ চলাচল করত, এখন তা অনেক নিচে নেমে গেছে। তবে সীমিতসংখ্যক জাহাজ মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারায় ওই প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারছে।

ওয়াশিংটনের কট্টরপন্থী ইরানবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজের ইরান বিশেষজ্ঞ বেহনাম বেন তালেব্লু বলেন, এর ফলে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব কিছুটা কমে যাচ্ছিল। তিনি বলেন, ‘শাসকগোষ্ঠী এখন অন্য জায়গায় সেই প্রভাব আবার ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে।’ তাঁর মতে, এর অংশ হিসেবে ইরানের মিত্ররা সৌদি আরব ও ইয়েমেনে হামলা চালাচ্ছে। তালেব্লু বলেন, ‘ইরানের সামরিক কৌশল একই সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ায় এবং অনুমানযোগ্য। ” তার ভাষায়, “ক্রমেই ঝুঁকি নেওয়ার ব্যাপারে বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠা তেহরানের কৌশলের মূল বিষয় হলো বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংঘাত বাড়ানো।’

ইরান পারস্য উপসাগরে টহলরত মার্কিন যুদ্ধজাহাজের ওপরও হামলা বাড়িয়েছে। ইরানের শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ি বলেন, ইরান একটি মার্কিন জাহাজের বিরুদ্ধে তাদের প্রথম জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের যুদ্ধজাহাজবিরোধী হামলার জবাবে কয়েকটি ইরানি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ ধ্বংস করেছে।

তালেব্লু বলেন, ইরানের এসব হামলা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘উচ্চগতিতে ও অনেক ওপরে উড়তে সক্ষম এসব ব্যবস্থা ইরানের আরও ভেতরের অঞ্চল থেকে নিক্ষেপ করা যায়। এগুলো কোনো মার্কিন জাহাজে আঘাত করলে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটতে পারে।’

অঞ্চলটিতে ইরানের কর্মকাণ্ড এ সপ্তাহান্তে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জোট ব্রিকসের সম্মেলনকেও জটিল করে তুলেছে। সেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে ‘নৌ চলাচল ও বাণিজ্যের স্বাধীনতা’ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। চলমান সংঘাতের কারণে ভারতের নিজেদের জ্বালানি আমদানিও হুমকির মুখে পড়েছে।

ব্রিকস সম্মেলনের একটি অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে পেজেশকিয়ান মার্কিন শক্তির সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘কে বলেছে যে পুরো বিশ্বের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তার (যুক্তরাষ্ট্রের) রয়েছে, অন্যদের কোনো অধিকার নেই এবং তারা যা চাইবে, অন্য সবাইকে তা মেনে চলতে হবে? আমরা এটি মেনে নেব না।’

তেহরানের অসমিত সামরিক কৌশল কীভাবে বাস্তব সাফল্যে পরিণত হয়েছে, তার একটি সম্ভাব্য শক্তিশালী প্রতীকী ছবি হতে পারে এমন একটি বৈঠক আগামীকাল সোমবার হওয়ার কথা। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শুক্রবার জানান, হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনার জন্য ইরান ও ওমান সোমবার অন্যান্য পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বসবে।

ওমানের কর্মকর্তারা শুক্রবার এই বৈঠক নিয়ে মন্তব্য চেয়ে করা অনুরোধের জবাব দেননি। কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরান ও ওমানের কর্মকর্তারা প্রণালিটি যৌথভাবে পরিচালনার বিষয়ে একটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছেন। তবে ইরান জোর দিয়ে বলেছে, এমন কোনো চুক্তি হলেও এর অর্থ এই নয় যে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে।

বৈঠকটি আদৌ অনুষ্ঠিত হবে কি না, কিংবা হলে সেখান থেকে কী সিদ্ধান্ত আসবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। উপসাগরীয় দেশ বাহরাইন শনিবার জানিয়েছে, তারা এতে অংশ নেবে না। দেশটি ইরানের হামলার শিকার হয়েছে এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। অন্যান্য উপসাগরীয় দেশ এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেছে বলে মনে হয়নি।

বৈঠকটি যদি অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে তা ‘ওয়াশিংটন এবং এই অঞ্চলে মার্কিন নীতির প্রতি উপসাগরীয় দেশগুলোর গভীর হতাশার প্রতিফলন’ হবে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেছেন অবসরপ্রাপ্ত ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তা ড্যানি সিত্রিনোভিচ। তিনি ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ। সিত্রিনোভিচ বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোকে এখন দুটি বিকল্পের মধ্যে বেছে নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। একদিকে রয়েছে ‘কোনো স্পষ্ট রাজনৈতিক সমাপ্তি ছাড়াই চলতে থাকা একটি সংঘাত, যা অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করছে এবং বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি করছে।’ অন্যদিকে রয়েছে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার আশায় হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের কর্তৃত্বের কোনো না কোনো মাত্রাকে স্বীকৃতি দেওয়া।

তালেব্লু বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের কূটনীতি হলো ‘সামনে করমর্দন আর পেছন থেকে ছুরি মারার আদর্শ উদাহরণ।’ তাঁর ভাষায়, ‘তেহরান কয়েক মাস ধরে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে এসব দেশের ওপর হামলা চালিয়েছে এবং এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যার ফলে বড় ধরনের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে এবং তেল রপ্তানির সক্ষমতা নষ্ট হয়েছে।’ তিনি বলেন, এখন ইরান চেষ্টা করছে ‘এই অঞ্চলে মার্কিন ব্যবস্থার কিছু অংশকে তেহরানের প্রতি আরও অনুগত অবস্থানে নিয়ে আসতে এবং সেই অবস্থানকে স্থায়ী করতে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত