দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বান্ধবী, ডিএনএ টেস্টের পর বদলে গেল সম্পর্ক

কখনো কখনো জীবনের কিছু গল্প শুনলে মনে হয়ে যেন সিনেমার কাহিনী। অবশ্য সিনেমাগুলো বাস্তবের ওপর নির্ভর করেই তৈরি হয় বেশির ভাগ সময়ই। কিন্তু বাস্তবতা কখনো কল্পনাকেও হার মানিয়ে দেয়। আর এমনই এক সিনেমাটিক জীবন মিনা ও মিনাল নামে দুই বোনের।
আশির দশকে ভারতে জন্ম মিনা গেলটিঙ্ক ও মিনাল টিজেনের। জন্মের কয়েক মাসের মধ্যেই মুম্বাইয়ে দুটি অনাথ আশ্রমে ঠাঁই হয় তাঁদের। সেখান থেকে তাঁদের দত্তক নেন নেদারল্যান্ডসের দুটি পরিবার। কাছাকাছি এলাকায় বড় হলেও দুজনের জানার সুযোগ হয়নি নিজেদের পরিচয়।
যখন দুই বোনের কিশোর বয়স, তখন তাদের দত্তক দেওয়া প্রতিষ্ঠানটি একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেখানে নিজেদের দেখে নিজেরাই অবাক হয়ে গিয়েছিলেন।
সেদিন স্মৃতিচারণ করে মিনা বলেন, ‘দত্তক নেওয়া শিশুদের নিয়ে একটা আয়োজন হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল একসঙ্গে সময় কাটানো, পরস্পরের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং রাতের খাবার খাওয়া।’
মিনা বলতে থাকেন, সেখানে মিনা ও মিনাল দুজনের সঙ্গেই তাঁদের বন্ধুরা ছিল। তাঁরাই প্রথম খেয়াল করেন যে তাঁদের দুজনের মধ্যে বেশ মিল।
‘তারা বলছিল, “আয়নায় নিজেদের দেখো।”
তখন আমি বললাম, “হায় ঈশ্বর! ওর নাকটা তো আমার মতো! আমাদের হাসিও একই রকম। ”’
মিনা বলেন, ‘রাতের খাবারের সময় আমি পুরোটা সময় ওর দিকেই তাকিয়ে ছিলাম।’
পরদিন নিজেদের ফোন নম্বর ও ঠিকানা বিনিময় করেন মিনা ও মিনাল।
মিনা জানান, সে সময় নিজেদের মধ্যে রক্তের সম্পর্ক থাকার বিষয়টি ভাবনাতেও আসেনি। তবু প্রথম দেখাতেই তাঁদের মধ্যে একধরনের গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। এরপর বছরের পর বছর তাঁরা একে অপরকে চিঠি লিখেছেন। এমনকি চিঠিতে ‘বোন’ বলেও সম্বোধন করতেন তাঁরা।

মিনা জানান, চিঠিতে স্কুলের গল্প, বন্ধুদের কথা, বেড়াতে যাওয়া, নাচ শেখার গল্প লিখতেন তাঁরা। কে কোন খেলা পছন্দ করতেন, তা নিয়েও কথা বলতেন। গান নিয়ে কথা হতো। কথায় কথায় জানতে পেরেছিলেন, দুজনেরই প্রিয় ব্যান্ড ব্যাকস্ট্রিট বয়েজ।
বছরের পর বছর এভাবে চিঠি বিনিময় চলতে থাকলেও একটা সময় তাঁদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মিনাল ফ্রান্সে চলে যান। আর মিনাও সদ্য মা হওয়ায় সন্তান নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
দিন পেরোলেও জীবন যেন সুতোয় বাঁধা। ২০১৭ সালে আবারও ভারত থেকে দত্তক নেওয়াদের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেন মিনা। সেখানে ডিএনএ পরীক্ষার বিষয়ে জানতে পারেন। সিদ্ধান্ত নেন ডিএনএ পরীক্ষার, যাতে শেকড়ের খোঁজ মেলে। কিন্তু পরীক্ষার ফল তাঁকে নিরাশ করে।
গত ২০ মে মিনার ফেসবুকে একটি বার্তা আসে মিনালের কাছ থেকে। তাতে লেখা, ‘আমাকে মনে আছে?’
মাঝে পেরিয়ে গেছে ১৫টি বছর। সম্পর্কের টান এভাবেই ফিরিয়ে আনল তাঁদের।
এপ্রিল মাসে নেদারল্যান্ডসে নিজের বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে মিনালও ডিএনএ পরীক্ষা করেছিলেন। ফেসবুকে পাঠানো বার্তার সঙ্গে সেই পরীক্ষার ফলাফল মিনাকে জানান তিনি।
মিনা যে অ্যাপের মাধ্যমে ডিএনএ পরীক্ষার ফল পেয়েছিলেন সেই অ্যাপে আবার চেক করলেন। ৪৩ বছর বয়সী মিনা বলতে থাকেন, ‘আমি অ্যাপটি আবার ইনস্টল করলাম। এতটাই নার্ভাস ছিলাম যে, লগইন করতে গিয়ে ১০ বার ভুল পাসওয়ার্ড দিয়েছিলাম। এরপর দেখলাম, পরীক্ষার ফল বলছে, দুজনের ডিএনএ ১০০ শতাংশ মিলে গেছে।’
মিনা বলতে থাকেন, ‘আমি কেঁদে ফেলেছিলাম। মিনাল ছিল আমার জীবনের সেই হারানো অংশ, যার জন্য আমি এত দিন অপেক্ষা করছিলাম। আমরা একে অপরকে বোন বলে ডাকতাম। এই ডিএনএ পরীক্ষার ফলই নিশ্চিত করল, আমাদের এত দিনের টান আসলে ঠিক ছিল।’

‘মনে হলো ঘরে ফিরে এসেছি’
আগস্টের এক সুন্দর রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে দুই পুরোনো বন্ধু দেখা করেন, প্রথমবারের মতো বোন হিসেবে।
তিন সন্তানের মা মিনা বলেন, ‘অসাধারণ অনুভূতি ছিল। মনে হলো, ঘরে ফিরে এসেছি। বছরের পর বছর মিনা আর আমি বড় শূন্যতা অনুভব করেছি। এখন মনে হচ্ছে, সেই শূন্যতা আর নেই। সবকিছু ঠিক আছে এখন।
প্রথম দেখায় তাঁরা একসঙ্গে প্রথমবারের মতো সেলফি তোলেন।
৪৪ বছর বয়সী মিনাল এখন ফ্রান্সে তাঁর সঙ্গী ও দুই ছেলেকে নিয়ে থাকেন। এপ্রিল মাসে ডিএনএ পরীক্ষার ফল হাতে পাওয়ার পর প্রথমে তিনি বুঝতেই পারেননি, ৩০ বছর আগে প্রথম দেখা হওয়া সেই কিশোরীই তাঁর বোন, যে দেখতে ঠিক তাঁর মতোই ছিল আর যাকে তিনি বন্ধু বানিয়েছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিনার অ্যাকাউন্ট খুঁজে বের করেন তিনি। সেখানে মিনার ছবি দেখার পর বিষয়টি তাঁর কাছে পরিষ্কার হয়। মিনা তাঁর বোন এটি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। মিনাল বলেন, ‘আমরা বন্ধু ছিলাম। কিন্তু পুরো সময়টায় আমরা বোনের মতোই ছিলাম, শুধু আমরা জানতাম না যে আমরা বোন।’
মিনা জানান, নেদারল্যান্ডসের একটি ছোট গ্রামে তাঁর বেড়ে ওঠা। তাঁর দত্তক বাবা-মা একটি বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। কয়েক বছর আগে তাঁর বাবা মারা গেছেন। তবে মা এখনো সেই একই গ্রামে থাকেন।
২০০৩ সালে ১৯ বছর বয়সে মুম্বাইয়ের সেই অনাথ আশ্রমে গিয়েছিলেন মিনা। সঙ্গে ছিলেন তাঁর নেদারল্যান্ডসের বাবা-মা এবং গোয়া থেকে দত্তক নেওয়া তাঁর ভাই।
দুই সপ্তাহ ধরে তাঁরা বিভিন্ন নথি খুঁজেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল মিনার জৈবিক বাবা-মা সম্পর্কে কিছু জানা। মিনা বলেন, ‘এটা জানা গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে আমি কোথা থেকে এসেছি। কিন্তু অনাথ আশ্রম কর্তৃপক্ষ কোনো তথ্য দেয়নি।’
এখন মিনা ও মিনাল বোনের মতো করে একে অপরের খোঁজ রাখছেন। মিনা বলেন, ‘কখনো কখনো আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলি, সময়ের হিসাবই থাকে না। হঠাৎ মনে পড়ে, আমাদের বাচ্চাদের স্কুল থেকে আনতে হবে কিংবা বাজারে যেতে হবে।’
দুই বোনই জানান, তাঁরা এখনো শেকড়ের সন্ধানে আছেন। তিনি বলেন ‘আমরা একসঙ্গে ভারতে যেতে চাই। মুম্বাইয়ের রাস্তায় একসঙ্গে হাঁটতে চাই।’
মিনা আরও বলেন, ‘এমনও সময় গেছে, যখন আমরা দুজনই খুব একা অনুভব করেছি। যখন বাবাকে হারিয়েছি বা যখন কোনো সম্পর্ক ভেঙে গিয়েছিল তখন মনে হয়েছিল কেউ থাকত যাকে বলা হয় মনের কথা। আমরা একে অপরের পাশে থাকতে পারিনি, এটাই আমার আফসোস। যদি আগেই জানতাম আমরা বোন, তাহলে একে অপরের আনন্দ ভাগ করে নিতে পারতাম, কঠিন সময়ে একে অপরকে সাহায্য করতে পারতাম।’









