Ajker Patrika

ব্রিকসের ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা ও ইসরায়েলকে কড়া বার্তা, ভারতের নীতি কি বদলেছে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০: ৫৭
ব্রিকসের ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা ও ইসরায়েলকে কড়া বার্তা, ভারতের নীতি কি বদলেছে
ছবি: এএফপি

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে গৃহীত যৌথ ঘোষণাপত্রে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করা হয়েছে, অন্যদিকে গাজা ও লেবানন ইস্যুতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছে জোটটি। তবে পুরো ঘোষণায় কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নাম অনেক ক্ষেত্রেই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

১১ সদস্যের সম্প্রসারিত ব্রিকস জোটের এই ঘোষণা ভারতীয় কূটনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের টানাপোড়েনের মাঝে যৌথ ঘোষণাপত্রে ভারত এমন সব ভাষা ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে, যা সব সদস্যই গ্রহণ করেছে।

সম্মেলনের আগে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল আদৌ কোনো যৌথ ঘোষণা হবে কি না। গত মে মাসে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকেও সদস্যরা যৌথ বিবৃতিতে একমত হতে পারেননি। সেই প্রেক্ষাপটে দিল্লি ঘোষণাকে ভারতের জন্য বড় কূটনৈতিক অর্জন বলেই মনে করা হচ্ছে।

ব্রিকস এখন এমন এক জোট যেখানে চীন ও রাশিয়ার পাশাপাশি ভারত, ব্রাজিল, ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রও রয়েছে। ফলে প্রতিটি শব্দই দীর্ঘ আলোচনার ফল।

দিল্লি ঘোষণার সবচেয়ে আলোচিত অংশগুলোর একটি হলো একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা নিয়ে অবস্থান। ঘোষণায় বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের পরিপন্থী একতরফা নিষেধাজ্ঞা এবং সেকেন্ডারি স্যাংশন উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে অসমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

যদিও এই যৌথ ঘোষণার কোথাও যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করা হয়নি, তবু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি একতরফা নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী দেশ হিসেবে ওয়াশিংটনকেই এর লক্ষ্যবস্তু বলে মনে করা হচ্ছে। প্রসঙ্গত, বর্তমানে ব্রিকসের দুই সদস্য রাশিয়া ও ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে।

ঘোষণায় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়মের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ একতরফা শুল্ক ও অশুল্ক বাধা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এটিও অনেকের মতে সাম্প্রতিক মার্কিন বাণিজ্যনীতির প্রতি পরোক্ষ ইঙ্গিত।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে ঘোষণায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার নিন্দা। এতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তত্ত্বাবধানে থাকা বেসামরিক পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা উদ্বেগের বিষয়।

এখানেও ইরান, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এটি ইরানের সেই দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে তেহরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে আসছে।

একই সঙ্গে ঘোষণায় পশ্চিম এশিয়ায় সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন, রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান এবং বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানানো হয়েছে।

তবে দিল্লি ঘোষণায় সবচেয়ে স্পষ্ট ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে ইসরায়েল প্রসঙ্গে। গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশ নিশ্চিত করার আইনি বাধ্যবাধকতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ব্রিকস নেতারা জোরপূর্বক ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতির বিরোধিতা করেছেন। পাশাপাশি ১৯৬৭ সালের সীমান্তের ভিত্তিতে পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।

লেবানন প্রসঙ্গে ভাষা আরও কঠোর। ঘোষণায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের নিন্দা জানিয়ে ইসরায়েলকে লেবাননের দখলকৃত সব এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। পুরো ঘোষণাপত্রে এটিই একমাত্র অংশ যেখানে ইসরায়েলের নাম সরাসরি উল্লেখ করে নির্দিষ্ট দাবি তোলা হয়েছে।

ভারতের অবস্থান কি বদলেছে

এই ঘোষণার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে—ভারত কি মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে তার অবস্থান পরিবর্তন করেছে?

বিশ্লেষকদের মতে, এর উত্তর ‘না’। কারণ এটি কোনো একক ভারতীয় বিবৃতি নয়। এটি ১১ সদস্যের ঐকমত্যের ভিত্তিতে যৌথ ঘোষণা।

ভারত দীর্ঘদিন ধরেই একদিকে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে, অন্যদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখেছে। একই সঙ্গে রাশিয়া, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—তিন পক্ষের সঙ্গেই সম্পর্ক ধরে রাখার নীতি অনুসরণ করছে।

দিল্লি ঘোষণার ভাষাও সেই বহুমাত্রিক কূটনীতির প্রতিফলন বলেই মনে করা হচ্ছে।

সম্প্রসারিত ব্রিকসের নতুন বাস্তবতা

ব্রিকস এখন আর শুধু ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার জোট নয়। সম্প্রসারণের পর এতে যুক্ত হয়েছে মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইন্দোনেশিয়া। ফলে জোটের ভেতরেই রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলো।

এই বাস্তবতায় যেকোনো যৌথ অবস্থান গ্রহণ আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল এমন একটি ঘোষণাপত্র তৈরি করা, যা রাশিয়া ও ইরানের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে, আবার একই সঙ্গে সৌদি আরব, আমিরাত ও ভারতের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থও ক্ষতিগ্রস্ত করবে না।

দিল্লি ঘোষণা সেই ভারসাম্য রক্ষার একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘোষণার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় সম্ভবত লেখা নয়, বরং অলিখিত অংশ। কারণ, ব্রিকসের ভেতরে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ১১ সদস্যকে একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে রাজি করানো ভারতের কূটনৈতিক সক্ষমতার প্রমাণ। একই সঙ্গে এটি দেখিয়েছে যে, সম্প্রসারিত ব্রিকস নিজেকে পশ্চিম বিরোধী জোট হিসেবে নয়, বরং বহুমেরুকেন্দ্রিক বৈশ্বিক ব্যবস্থার একটি বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। ভারতের জন্যও বার্তাটি স্পষ্ট—নয়াদিল্লি তার ‘মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট’ বা বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির পথ থেকে সরে আসছে না; বরং ভিন্নমতের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমঝোতা তৈরির মধ্যস্থতাকারী হিসেবেই নিজের ভূমিকা জোরদার করতে চাইছে।

তবে এই যৌথ ঘোষণাপত্রে ভারতের কূটনৈতিক সাফল্য প্রশংসিত হলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ নয়াদিল্লিকে সতর্ক করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, চীনের প্রভাব সংবলিত এই জোটে মাত্রাতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা ভবিষ্যতে ভারতের জাতীয় ও কৌশলগত স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) ইন্টারন্যাশনাল পলিটিকসের অধ্যাপক রাজেশ রাজাগোপালন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দ্য প্রিন্ট-এ প্রকাশিত তাঁর নিবন্ধের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, ‘ব্রিকস জোটে ভারতের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত এটিকে নিষ্ক্রিয় রাখা, যাতে এটি চীনের রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের হাতিয়ারে পরিণত হতে না পারে।’

অধ্যাপক রাজাগোপালনের মতে, রাশিয়া ও চীন ব্রিকসকে মূলত পশ্চিমা-বিরোধী অক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। ফলে ভারতে এই জোটকে নিয়ন্ত্রণ ও নিজস্ব ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর জোর দিতে হবে।

অন্যদিকে, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ সুরজিৎ ভাল্লা ভারতের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের স্বার্থে ব্রিকসের চেয়ে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ‘Forget BRICS, look West’ শীর্ষক কলামে তিনি লিখেছেন, ‘ভারতের ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির জন্য আমাদের কী করা উচিত? ব্রিকস ভুলে যান। আমাদের ভবিষ্যৎ নিহিত রয়েছে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো পশ্চিমা বিশ্বের বৈশ্বিক অংশীদার হওয়ার মধ্যে। আর মনে রাখবেন, ভারত যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি না করে, তবে দিন শেষে কে লাভবান হবে?’

ইন্ডিয়া টুডেতে প্রকাশিত সাংবাদিক সুশীম মুকুলের লেখাটি সংক্ষেপে অনুবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত